২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪২ এএম
জুমার সকাল মানুষের মনে অন্য রকম একটি নীরবতা এনে দেয়—যেন কোলাহলের ভেতরেও নিজেকে একটু ফিরে দেখার অবকাশ। এই সকালেই নিউইয়র্ক থেকে বাংলাদেশের কণ্ঠটি ফিরে এসেছে ঢাকায়। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম ভাষণ দিয়েছেন বাংলায়। জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক বৈষম্য, শান্তি, বহুপাক্ষিকতা এবং রোহিঙ্গা সংকটকে তিনি বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের জায়গা থেকে বিশ্বসমাজের সামনে তুলেছেন। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু বাংলাদেশের মানবিক দায় নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরা এবং একটি কার্যকর সমাধানের আহ্বান ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
ভাষণটির তাৎপর্য শুধু কী বলা হয়েছে, তার মধ্যে নয়—বাংলাদেশ কীভাবে নিজেকে বিশ্বপরিসরে দেখতে চায়, তার মধ্যেও। বক্তব্যে আবেগের চেয়ে বাংলাদেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বৈশ্বিক ন্যায়বোধের প্রশ্নটি বেশি স্পষ্ট হয়েছে। তবে কূটনীতির আসল পরীক্ষা বক্তৃতার পরের পথচলায়; নিউইয়র্কে উচ্চারিত অঙ্গীকারকে দেশে-বিদেশে ধারাবাহিক কর্মনীতিতে রূপ দিতে পারলেই ভাষণের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মূল্য আরও দৃঢ় হবে। এরই পাশে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠকে পারস্পরিক সম্মান, বোঝাপড়া, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং নিয়মিত সংলাপের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে—অতীতের জটিলতার ভেতর থেকেও ভবিষ্যতের বাস্তব সম্পর্কের দরজা খোলা রাখার একটি কূটনৈতিক প্রয়াস।
নিউইয়র্কের কূটনীতির সঙ্গে দেশের অর্থনীতিও যেন একই দিনে নিজের হিসাবখাতা খুলেছে। বাংলাদেশ আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব—RCEP-এ যোগদানের পথে আরও এক ধাপ এগিয়েছে; জোটটি বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে একটি Ad Hoc Accession Working Group গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রাষ্ট্রের আরেকটি আয়না খুলেছে আইনের শাসনের প্রশ্নে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ছয়জন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সরকারি চাকরি যে কোনো ব্যক্তির জন্য ক্ষমতার ঢাল নয়—অপরাধ প্রমাণিত হলে পদমর্যাদার ঊর্ধ্বে উঠে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করাই রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তি। একই সূত্রে দেশের সম্পাদকীয় আলোচনাতেও উঠে এসেছে দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভেঙে বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার প্রয়োজন। বিশ্বমঞ্চে আমরা যে ন্যায়বোধের কথা বলি, তার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য অনুবাদ হওয়া উচিত নিজের দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোতে।
রোহিঙ্গা প্রশ্নে সেই ন্যায়বোধেরই আরেক পরীক্ষা। জাতিসংঘে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি দেশের সম্পাদকীয়গুলোও মনে করিয়ে দিয়েছে—নয় বছর ধরে চলা এই মানবিক সংকটের বোঝা বাংলাদেশ একা বহন করতে পারে না। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত পাঁচ দফা উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়ার আহ্বান এসেছে; নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপই এখন মূল প্রশ্ন। সামাজিক মাধ্যমে জাতিসংঘের বিশ্বনেতাদের নানা মুহূর্ত ও বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের ছবি-ভিডিও ঘুরছে; পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধন নিয়ে বাক্স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নেও আলোচনা তীব্র। সরকারের বক্তব্য—আইনটির উদ্দেশ্য মতপ্রকাশ দমন নয়; অন্যদিকে নাগরিক অধিকারকর্মীদের একটি অংশ খসড়াটির কিছু বিধান নিয়ে ঝুঁকির কথা বলছে।
দূরের পৃথিবীও আজ আমাদের ঘরের আয়নার মতো। যুক্তরাষ্ট্রে হোয়াইট হাউস থেকে CNN, MS NOW ও Politico-র সাংবাদিকদের প্রবেশে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা একজন ফেডারেল বিচারক সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন; আদালতের পর্যবেক্ষণে সাংবিধানিক অধিকার ও যথাযথ প্রক্রিয়ার প্রশ্ন সামনে এসেছে। একই দিনে ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকে দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতার মধ্যেও বাণিজ্যিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা দেখা গেছে; দুই দেশ বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়ানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে। ক্ষমতা যত বড়ই হোক, শেষ পর্যন্ত তাকে আইন, সংলাপ ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বসতেই হয়—বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর ঘটনাতেও সেই পুরোনো সত্যটি নতুন করে দেখা যায়।
জুমার দিনে তাই প্রভাতবার্তার শেষ কথাটি খবরের চেয়ে একটু বেশি মানুষের জন্য। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন তখনই, যখন একজন সাধারণ মানুষ তার নিরাপত্তা, অধিকার ও ন্যায়ের ওপর আস্থা রাখতে পারে। আল্লাহ আমাদের এমন প্রজ্ঞা দিন, যাতে শক্তি অহংকারে না যায়, উন্নয়ন মানুষের কাছ থেকে দূরে না সরে, কূটনীতি মানবতার পথ না হারায় এবং আইন সবার জন্য সমান থাকে।