২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০১ পিএম
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে উদ্বেগের একটি বড় কারণ হলো, ডিগ্রি অর্জনের পরও বহু তরুণের কাজ খুঁজে পেতে দীর্ঘ সময় লাগছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ২০২৫ সালে প্রকাশিত -শ্রমশক্তি জরিপ-২০২৪, অনুযায়ী দেশে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। স্নাতক ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে এটি ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। আর বেকার স্নাতকের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। একই জরিপে ১৫-২৯ বছর বয়সীদের বেকারত্বের হার ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং এই বয়সীদের ২০ দশমিক ৩ শতাংশ কর্মসংস্থান, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ (Not in Employment, Education or Training-NEET)-কোনোটিতেই নেই।
বর্তমান বিএনপি সরকারের ঘোষিত নীতি অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এসব সংকট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। তবে প্রাথমিকভাবে বলা যায়, বিএনপি সরকারের ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও কর্মসংস্থান নিয়ে ঘোষিত পদক্ষেপগুলো একটি ইতিবাচক নীতিগত ভিত্তি দিয়েছে। ইশতেহারে গবেষণাকে গুরুত্ব দেওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়–শিল্পখাতের যৌথ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নয়ন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো, শিক্ষকদের আবাসন ও লাইব্রেরি সুবিধার ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশের অঙ্গীকার রয়েছে। এখন এসব অঙ্গীকারকে সময়সীমা, বাজেট ও পরিমাপযোগ্য ফলসহ বাস্তবায়ন করাই প্রধান কাজ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় করণীয় কী? এসব বিষয়ভিত্তিক গবেষণালব্ধ বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজনে নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে পরবর্তীতে করা যাবে। এখানে এসব বিষয়ে করণীয় নিয়ে সংক্ষেপে কিছু আলোকপাত করলাম।
প্রথম চ্যালেঞ্জ
একাডেমিক ডিগ্রির সঙ্গে কর্মজীবনের দূরত্ব। এই দূরত্ব কমাতে প্রয়োজনীয় যুগপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। স্নাতকদের বেকারত্বের জন্য শুধু বিশ্ববিদ্যালয়কে দায়ী ঠিক না। নতুন কাজ সৃষ্টি অর্থনৈতিক নীতিরও একটি বিষয়। তবে শিক্ষার্থী কী শিখছেন এবং সেই জ্ঞান কীভাবে কাজে লাগাবেন, তা দেখার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের। নির্বাচনী ইশতেহারে বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্পখাত যৌথ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার এই দূরত্ব কমানোর সুযোগ তৈরি করেছে। এটি বাস্তবভিত্তিক কীভাবে করা যায়- এটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়। এ নিয়ে আমার নিজস্ব গবেষণাও আছে। পরবর্তীতে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, গবেষণাগারগুলো যেন শুধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সীমিত না থাকে। প্রশাসন, আইন, সমাজবিজ্ঞান, ব্যবসা ও মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরাও নীতি বিশ্লেষণ, বাজার গবেষণা, স্থানীয় সমস্যা সমাধান এবং সামাজিক উদ্যোগে কাজ করতে পারেন।
এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্নাতক হওয়ার পর তাদের শিক্ষার্থীদের অবস্থান নিয়মিত জানতে হবে। ছয় মাস, এক বছর ও দুই বছর পর তারা কোথায় আছেন, কোন দক্ষতা কাজে লাগছে, কোথায় ঘাটতি রয়েছে—এসব তথ্য পাঠক্রম পর্যালোচনায় ব্যবহার করতে হবে। নিয়োগদাতা ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা মতামত দেবেন। পাঠক্রমের একাডেমিক সিদ্ধান্ত নেবেন শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট পরিষদ বা কমিটি। এ ক্ষেত্রে ইউজিসি একটি অভিন্ন তথ্যকাঠামো নির্ধারণ করতে পারে। তাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ফলাফল তুলনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নির্ধারণ সহজ হবে।
ডিগ্রির সঙ্গে কর্মজীবনের দূরত্ব ঘুচানোর ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্প্রতি নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক তরুণ উদ্যোক্তা তৈরিতে ২০ লাখ টাকা বিনা জামানতে ব্যাংক ঋণের সুবিধা প্রদানের ঘোষণা করেছে। এখন এই ঋণ কতটা কার্যকারভাবে বিতরণ, মনিটরিং এবং এর ফলাফল ইতিবাচকভাবে অর্জন করা যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। প্রকৃত উদ্যোক্তা চিহ্নিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এটি প্রকৃত কৃষকদের জন্য ‘কৃষি ঋণ’ বিতরণের নামে ‘বড় কোম্পানির কৃষিখাত’কে ঋণ দিয়ে কাগুজে-কলমে ব্যাংকের ‘কৃষি ঋণ’ বিতরণ করার কোটা পূরণের মতো যেন না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ
তরুণদের শিক্ষা থেকে কাজে যাওয়ার পথ বিচ্ছিন্ন। নিট তরুণের ২০ দশমিক ৩ শতাংশ এ হারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হার নয়। এই বয়সের অনেকে কখনো উচ্চশিক্ষায় যাননি। তা সত্ত্বেও সংখ্যাটি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখায়। ইশতেহারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিকে বিনিয়োগনির্ভর করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এই লক্ষ্যকে কার্যকর করতে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় ক্যারিয়ার সেবা, কাজের অভিজ্ঞতার সুযোগ এবং উদ্যোগ গড়ার সহায়তা প্রয়োজন।
শিক্ষা, শ্রম, যুব উন্নয়ন ও স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই অঞ্চলের তরুণদের প্রয়োজন নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কোন খাতে কাজের চাহিদা আছে, কোথায় প্রশিক্ষণের সুযোগ আছে এবং কারা পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণ থেকে বিচ্ছিন্ন—এসব তথ্যের ভিত্তিতে সেবা বা প্রশিক্ষণের মডিউল সাজাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারিয়ার কেন্দ্র শুধু চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রচার করবে না। বরং নিয়োগদাতা, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ঘটাবে। প্রতিবছর কতজন শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ, চাকরি বা উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন, সেসব তথ্য প্রকাশ করলে উদ্যোগের কার্যকারিতা যাচাই করা যাবে।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ
ভর্তির সুযোগের সঙ্গে পড়াশোনা শেষ করার সক্ষমতার ব্যবধান। ইউনেসকোর উপাত্তভিত্তিক বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় মোট ভর্তির অনুপাত ছিল প্রায় ২৪ শতাংশ; নারীদের ক্ষেত্রে প্রায় ২১ শতাংশ। এই সূচকের বয়সসীমা ও সংজ্ঞা বিবিএসের নিট সূচক থেকে আলাদা। তবে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ আরও বাড়ানো এবং ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহায়তা করার প্রয়োজন এতে স্পষ্ট।
ইশতেহারে শিক্ষকদের আবাসন ও লাইব্রেরি সুবিধার পাশাপাশি নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা, বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশের কথা বলা হয়েছে। এসব উদ্যোগকে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনায় রূপ দিতে হবে। নিম্ন আয়ের শিক্ষার্থীর বৃত্তি, আবাসন, ইন্টারনেট ও পাঠসামগ্রীর প্রয়োজনও হিসাব করতে হবে। শুধু কতজন ভর্তি হলেন, তা প্রকাশ যথেষ্ট নয়। কতজন সময়মতো ডিগ্রি শেষ করলেন এবং কারা মাঝপথে সরে গেলেন, সেটিও জানতে হবে। ব্যক্তিগত পরিচয় গোপন রেখে এই তথ্য প্রকাশ করলে সহায়তা যেখানে সবচেয়ে প্রয়োজন, সেখানে পৌঁছানো সম্ভব।
চতুর্থ চ্যালেঞ্জ
গবেষণার অঙ্গীকারকে ফলপ্রসূ বিনিয়োগে পরিণত করা। ইউজিসির হিসাবে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ৫৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেট ছিল ১১ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা; বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খাতে অনুমোদিত বরাদ্দ ছিল প্রায় ১৮৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এগুলো ভিন্ন বাজেট শ্রেণির অঙ্ক--শুধু তাদের অনুপাত দিয়ে গবেষণার পূর্ণ অবস্থা বিচার করা যায় না। তবে গবেষণায় বিনিয়োগ ও তার ফল নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা প্রয়োজন।
গবেষণাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়–শিল্পখাত যৌথ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার আছে। বাস্তবায়নের প্রথম ধাপে জলবায়ু, কৃষি, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার ও উৎপাদন খাতের কয়েকটি নির্দিষ্ট সমস্যা বেছে নেওয়া যেতে পারে। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রকল্প পাবে। প্রস্তাবে উদ্দেশ্য, ব্যয়, সময়সীমা ও প্রত্যাশিত ফলাফল জানাবে। প্রকল্প শেষে শুধু প্রকাশনার সংখ্যা নয়, গবেষণার মান, নীতিতে ব্যবহার এবং শিক্ষার্থী গবেষকদের অংশগ্রহণও মূল্যায়ন করতে হবে। নতুন ও স্বল্পসম্পদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা বাড়াতে পৃথক সহায়তা রাখা জরুরি। ইউজিসি’র সরাসরি তত্ত্বাবধানে হিট প্রজেক্ট চলমান। হিট প্রজেক্টের অধীনে বাস্তবায়ধীন প্রজেক্টগুলোর ফলাফলও নীতিতে কতটা কাজে লাগছে বা লাগানো যায়, এসব বিষয় নিয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়।
পঞ্চম চ্যালেঞ্জ
পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। ইশতেহারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর কথা আছে। এই পদক্ষেপ কার্যকর হতে পারে, যদি দায়িত্বের সীমা স্পষ্ট করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক সিদ্ধান্ত ও সংশোধনের দায়িত্ব নেবে। ইউজিসি তথ্য ও তদারকির ব্যবস্থা শক্তিশালী করবে, আর অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল নির্ধারিত মান অনুযায়ী পর্যালোচনা করবে। ক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা ও আপিলের সুযোগও থাকতে হবে।
সম্প্রতি ইউজিসি কর্তৃক আয়োজিত ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন’ সংক্রান্ত দিনব্যাপী কর্মশালায় ইউজিসি’র চেয়ারম্যান প্রতিবছর অডিট আপত্তির সংখ্যার বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে তা শূন্যে নামিয়ে আনার ওপর জোর দেন। চেয়ারম্যানের মন্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে। যদিও নিরীক্ষা আপত্তি প্রমাণিত অনিয়ম নয়। তবে কত সময়ে তা নিষ্পত্তি হলো, সেটি প্রকাশ করা উচিত। নিয়োগ ও ক্রয়ের মানদণ্ড আগেই জানানো, সিদ্ধান্তের লিখিত কারণ রাখা এবং শিক্ষার্থীর অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যকর করাও জরুরি।
বিএনপি সরকারের ঘোষিত উচ্চশিক্ষা-সংক্রান্ত অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নের একটি সুযোগ তৈরি করেছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে অগ্রাধিকার ঠিক করা প্রয়োজন। যেমন, নিয়মিত গ্রাজুয়েট জরিপ ব্যবস্থা চালু, যৌথ গবেষণাগা শুরু, শিক্ষার্থী সহায়তার লক্ষ্য নির্ধারণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক মানোন্নয়ন পরিকল্পনা প্রকাশ। প্রতিটি উদ্যোগে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, বাজেট, সময়সীমা ও অর্জনের সূচক জানাতে হবে। তাহলে সরকার তার ইতিবাচক পদক্ষেপের ফলাফল দেখাতে পারবে, আর নাগরিকও বুঝতে পারবেন উচ্চশিক্ষার প্রতিশ্রুতি তরুণদের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনছে।
লেখক: গভর্ন্যান্স অ্যান্ড পলিসি অ্যানালাইসিস এক্সপার্ট এবং প্রফেসর, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।