২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম
আজকের সকালটা বেশ নিরীহ, কিন্তু খবরের কাগজ খুললেই বোঝা যায়—দেশের অর্থনীতি আজকাল বেশ রসিক হয়েছে। পকেটের সঙ্গে তার রসিকতা অবশ্য একটু নির্মম। বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়তেই বাসভাড়াও কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বেড়েছে। সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারের হিসাব; যাত্রীরা বলছেন, আমাদের পকেটেরও তো একটা আন্তর্জাতিক সীমা আছে!
বাণিজ্যমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন, নিত্যপণ্যের দামে বড় প্রভাব পড়বে না। আশা করি বাজারও মন্ত্রীর কথা শুনবে—বাজারের অবশ্য নিজের একটা স্বাধীন মেজাজ আছে। দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয়ও মনে করিয়ে দিয়েছে, জ্বালানির এই ধাক্কা পরিবহন, উৎপাদন ও পণ্যের খরচে ঢেউ তুলতে পারে।
তার ওপর সোনার বাজার যেন একেবারেই অন্য মেজাজে। ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনা এখন ২ লাখ ৩৪ হাজার ৬২১ টাকা—দেশের মানুষের হাতে টাকা থাকুক বা না থাকুক, সোনার মনে হয় আত্মবিশ্বাসের কোনো ঘাটতি নেই! অর্থনীতির এক প্রান্তে জ্বালানি বাঁচানোর চিন্তা, অন্য প্রান্তে সোনা কেনার সাধ; মাঝখানে সাধারণ মানুষ, যিনি দুটোই দূর থেকে দেখেন। আজকের লেখায় তাই আরেকটি জরুরি প্রশ্ন উঠেছে—আজকের জ্বালানি-ধাক্কা সামলানোর পাশাপাশি ফসিল ফুয়েলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে দ্রুত যাওয়া যায় কীভাবে। অর্থাৎ আজ আগুন নেভাব, না এমন চুলা বানাব যাতে কাল আর আগুন কিনে আনতে না হয়—বুদ্ধিমান রাষ্ট্রকে দুটো কাজই করতে হয়।
দিনের গল্পে অবশ্য একটু আশার বাতাসও আছে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সফলভাবে ছয়টি লিভার প্রতিস্থাপন হয়েছে; এখন বছরে অন্তত ২৪টি এমন প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য। খবরটি শুনে মনে হয়, রাষ্ট্রের সাফল্য সব সময় মেগাওয়াট, মেগাবাইট কিংবা মেগাপ্রকল্পে মাপতে হয় না—কখনো কখনো একজন মানুষের লিভারও রাষ্ট্রের উন্নয়নের খুব সুন্দর একটি মাপকাঠি হয়ে ওঠে। যে পরিবারকে একসময় চিকিৎসার জন্য বিদেশের পথে অর্থ, সময় ও আশার পুঁটলি বেঁধে বেরোতে হতো, তাদের জন্য দেশের মাটিতে এই চিকিৎসা-সুবিধা নিঃসন্দেহে বড় খবর। ছয়টি জীবন হয়তো ছয়টি সংখ্যা; ছয়টি পরিবারের কাছে কিন্তু ছয়টি পূর্ণ পৃথিবী।
সামাজিক মাধ্যমও যথারীতি বসে নেই। জ্বালানি ও বাসভাড়া নিয়ে ফেসবুক-ইউটিউবে ক্ষোভ, রসিকতা ও ট্রোল—সব মিলিয়ে জনমতের বেশ জমজমাট হাট বসেছে। বিমান কেনা নিয়েও বোয়িং না এয়ারবাস—এই পুরোনো দ্বন্দ্বে নতুন মশলা পড়েছে। ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেছেন, এয়ারবাস কেনার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক নয়; আলোচনা চলছে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমের আদালতে রায় বের হতে বেশি সময় লাগে না—সেখানে প্রমাণের আগে মতামত হাজির হয়, আর কখনো কখনো মতামতেরও আগে মিম! তাই বিমান কেনার মতো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে ফেসবুকের উত্তাপ আর সরকারি নথির ঠান্ডা তথ্য—দুটোকে আলাদা করে দেখা ভালো। এই যুগে খবরের সঙ্গে সম্পাদকীয়, সম্পাদকীয়র সঙ্গে মন্তব্য, আর মন্তব্যের সঙ্গে তিনখানা মিম বিনামূল্যে!
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হোটেলের কাছাকাছি একটি সন্দেহজনক সুটকেস বোমা পাওয়ার খবরের প্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
আর ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক—দূরত্ব যতই হোক, আজকের পৃথিবীতে সব খবরই শেষ পর্যন্ত একই উঠোনে এসে বসে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন; বিশ্বনেতাদের আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইয়েমেনে হুথি তৎপরতা ও ইরানের ভূমিকা নিয়ে G7-এর সতর্কবার্তা, আর দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান-আফগানিস্তান উত্তেজনাও জায়গা করে নিয়েছে। পৃথিবীটা এমনই—পারস্যের আকাশে বোমা পড়লে তার শব্দ হয়তো ঢাকায় শোনা যায় না, কিন্তু জ্বালানি বাজারে তার প্রতিধ্বনি পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগে না। তাই আজকের প্রভাতবার্তার হিসাবটি সোজা: পকেটের অঙ্ক সামলাতে হবে, রোগীর জীবন বাঁচাতে হবে, জ্বালানির ভবিষ্যৎ বদলাতে হবে, আর বিশ্বমঞ্চে নিজের কথাটিও বলতে হবে। উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত বড় বড় ভবনের গল্প নয়; মানুষের জীবনটা একটু সহজ করার নামই উন্নয়ন।
লেখক: সিনিয়র ব্যুরোক্রেট ও বিশ্লেষক