২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম
সেপ্টেম্বরের সকাল আজ বেশ স্বাভাবিক— আকাশে বৃষ্টির কোনো নাটক নেই, সূর্যও নিজের উপস্থিতি জানান দিতে বিশেষ ব্যস্ত নয়। এর মধ্যেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে। ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবেন; রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু, গণতান্ত্রিক উত্তরণ, উন্নয়ন ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার তার বক্তব্যে স্থান পাওয়ার কথা। সফরে তিনি থাকছেন হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রালে, আর নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে সফরটি ঘিরে ব্যাপক রাজনৈতিক উচ্ছ্বাস। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর এবার কতটা দূর যায়, সেটিই দেখার অপেক্ষা।
দেশের নিজের মঞ্চেও অবশ্য দু’একটি খবর বেশ আশাব্যঞ্জক। সাড়ে পাঁচ বছর অবিরাম অবমূল্যায়নের পর ডলারের বিপরীতে টাকার সামান্য ঘুরে দাঁড়ানো— আগস্টের শেষ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ০.৭৭ শতাংশ—অর্থনীতির আয়নায় একটি ছোট্ট কিন্তু লক্ষণীয় হাসি। রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য বৃদ্ধিও এর পেছনে ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ককে আরও বহুমাত্রিক করার প্রত্যাশা জানিয়েছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খান; অবকাঠামো, বন্দর, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো খাতে সহযোগিতার কথাও আলোচনায় আছে। অর্থনীতির ভাষা বড় মজার— কখনো ডলার কমে, কখনো দূতাবাসের দরজা খোলে; শেষ পর্যন্ত দুটিই এসে দাঁড়ায় মানুষের কাজ, আয় ও জীবিকার কাছে।
সামাজিক আয়নাটি অবশ্য এত মসৃণ নয়। মাত্র পাঁচ হাজার টাকার ঋণ ও একটি আইফোন চুরিকে ঘিরে কিশোর ‘অপ্রতিম’ হত্যার ঘটনা এবং টিকটক-নির্ভর কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে— বিচারকের হাতুড়ি পড়ার আগেই ফেসবুকের কাঠগড়ায় রায় হয়ে গেলে ন্যায়বিচারের জায়গাটা থাকে কোথায়? আদালতে এমন অভিযোগ ইতোমধ্যে উঠেছে; ফলে সামাজিক মাধ্যমের ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা আর প্রাতিষ্ঠানিক বিচারের ধীর, কিন্তু প্রয়োজনীয় পথ— দুটির পার্থক্য মনে রাখা জরুরি।
এই প্রশ্নটিই আজকের সম্পাদকীয়গুলোর সুরেও ফিরে আসে। একদিকে আল-কায়েদা ও আইএস সংশ্লিষ্ট উগ্রবাদী মতাদর্শের বই প্রকাশ্যে বিক্রির অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ উঠেছে— বইয়ের দোকান যে জ্ঞানচর্চার জায়গা, তা ঠিক; কিন্তু সব বই যে জ্ঞানের বন্ধু, সে কথা বই নিজে বললেই বিশ্বাস করতে হয় না। অন্যদিকে মিডিয়া ট্রায়াল নিয়ে আলোচনাও মনে করিয়ে দেয়— রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা দুর্বল হলে জনতার আবেগ খুব সহজেই বিচারকের পোশাক পরে বসে। একটি সমাজকে সভ্য রাখে শুধু আইন নয়; আইন প্রয়োগের সংযম, তথ্যের দায়িত্ববোধ এবং ভিন্নমত সহ্য করার ক্ষমতাও।
দূরের পৃথিবীও আজ শান্তির সংজ্ঞা খুঁজছে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা আরও তীব্রতর হচ্ছে; ইরান মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে, আর মাঝেমধ্যেই ট্যাংকারেও অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল আঘাত করার খবর পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে সম্প্রতি আফগান সীমান্তে পাকিস্তানের বিমান হামলায় ইসলামাবাদ ২৮ জঙ্গি নিহতের দাবি করেছে, বিপরীতে কাবুল ও জাতিসংঘ বেসামরিক হতাহতের কথা জানিয়েছে। পৃথিবীর মানচিত্রে সীমান্তগুলো কাগজে আঁকা— কিন্তু গোলা যখন পড়ে, মানুষই তার হিসাব দেয়। নিউইয়র্কে আজ বিশ্বনেতারা বহু কথা বলবেন; বাংলাদেশের জন্য আশার কথা হবে, সেই কথার ভিড়ে যেন শান্তি, মানুষ এবং ন্যায়বিচারের কথাগুলো হারিয়ে না যায়।
লেখক: সিনিয়র ব্যুরোক্রেট ও বিশ্লেষক