২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম
রাত থেকে ঢাকায় বৃষ্টি, আকাশে মেঘের গুরু গুরু—সূর্যের আজ কোনো সাক্ষাৎকার নেই। অনেক দিনের গরমের পর এই মেঘলা সকালটুকু যেন প্রকৃতির পক্ষ থেকে শহরবাসীকে বলা, “ভাই, এবার একটু ঠান্ডা হও।”
সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে রাষ্ট্রেরও বুঝি আজ হাজিরা দিতে হয়েছে। অর্থ বিভাগ নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকারি কর্মচারীদের খাতায় কিছুটা আশার অঙ্ক বসিয়েছে—নতুন কাঠামো কার্যকর হবে ১ জুলাই থেকে। সরকারি চাকরিজীবীদের সংসারে এ খবর নিশ্চয়ই এক কাপ বাড়তি চায়ের মতো; কিন্তু রাষ্ট্রের বৃহত্তর সংসারের খবরটিও কম মধুর নয়—সাভার-আশুলিয়ায় গ্যাসের চাপ বাড়ায় প্রায় ১,৮০০ কারখানায় উৎপাদন আবার গতি পাচ্ছে। অর্থনীতির আসল কবিতা বোধ হয় এখানেই: বেতন বাড়লে একটি পরিবার স্বস্তি পায়, আর কারখানার চাকা ঘুরলে বহু পরিবারের চুলায় আগুন জ্বলে।
তবে রাষ্ট্রের অর্থনীতি যতই হিসাবি হোক, রাস্তাঘাট মাঝে মাঝে তাকে বেশ আবেগপ্রবণ করে ফেলে। মিরপুরে শনিবার রাতে কয়েকটি বাসে আগুনের ঘটনায় রাজধানীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে; একটি ঘটনায় অগ্নিসংযোগের কথা এলেও আরেকটির ক্ষেত্রে যান্ত্রিক ত্রুটির কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সামাজিক মাধ্যমে অবশ্য তদন্তের জন্য অপেক্ষা করার ধৈর্য খুব কম—ভিডিও আগে ছুটে যায়, সত্য পরে হাঁপাতে হাঁপাতে আসে। এর মধ্যেই ১১-দলীয় বিরোধী জোটের লংমার্চ ও আট দফা দাবি ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপও বাড়ছে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো মতের ভিন্নতা; তার দুর্ভাগ্য হলো, কখনো কখনো সেই ভিন্নতা মাইকের শব্দে এত বেড়ে যায় যে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাসটিই শোনা যায় না।
আজকের সম্পাদকীয়গুলোও যেন রাষ্ট্রের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন করেছে। একটি সম্পাদকীয় মনে করিয়ে দিয়েছে, জনসংখ্যা নীতি মানে শুধু পরিবার ছোট রাখার উপদেশ নয়; তরুণের কর্মসংস্থান, নারীর অংশগ্রহণ, নগরায়ণ এবং প্রবীণ মানুষের ভবিষ্যৎ—সবই তার অংশ। আর এক কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি নিয়ে যে প্রশ্নটি উঠেছে, সেটিও বড় মজার: চাকরি তো সংখ্যার খাতায় জন্মায় না, জন্মায় অর্থনীতির ভেতরে। কাঠামোগত সংস্কার, বিনিয়োগ ও উৎপাদনের ভিত শক্ত না হলে এক কোটি চাকরি শেষ পর্যন্ত এক কোটি আশাবাদী মানুষের এক কোটি দীর্ঘশ্বাসও হতে পারে।
পৃথিবীর খবরও আজকাল বড় ঘরের খবরের মতোই আমাদের উঠোনে এসে বসে। ইয়েমেনের হুতিদের হামলার পর রিয়াদে বিমান সতর্কতা জারি হয়েছে; বিস্ফোরণ ও ধোঁয়ার খবরের পর সৌদি কর্তৃপক্ষ পরে ‘অল ক্লিয়ার’ ঘোষণা করেছে। সৌদি আরব হুতিদের সাথে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিয়েছে। দূরের যুদ্ধের অভিঘাত যে শেষ পর্যন্ত জ্বালানি, বাণিজ্য, মূল্যস্ফীতি কিংবা আমাদের কারখানার উৎপাদন-সারণিতে এসে বসে—বিশ্বায়নের এ এক অদ্ভুত রসিকতা। তাই আজকের সকালের প্রার্থনা খুব জটিল নয়: সরকারি বেতন হোক ন্যায্য, কারখানার চাকা হোক সচল, কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি হোক বাস্তব, আর রাজনীতির উত্তাপ যেন মানুষের রুটির ওপর এসে না পড়ে। রাষ্ট্রের বড় বড় কথার শেষ পরীক্ষা তো ওই ছোট্ট রান্নাঘরেই।