Dhaka Mail Logo

মতামত

সাইনবোর্ড বদলেছে, স্বভাব বদলাবে তো?

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৭ পিএম

বৃহস্পতিবার মানেই সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস—দপ্তরের ঘড়ি একটু দ্রুত চলে, মানুষের মনও খানিকটা ছুটির দিকে হাঁটে। রাষ্ট্র অবশ্য এসব আবেগ বোঝে না; তার ফাইলের কোনো শুক্রবার নেই। আজকের খবরের দিকে তাকালে তাই মনে হয়, বাংলাদেশও যেন নিজের পুরোনো জামাকাপড় মাপছে—কোথাও নাম বদলাচ্ছে, কোথাও কাঠামো, কোথাও আবার প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে দাঁড় করানোর চেষ্টা। প্রশ্নটি শুধু সংস্কার হচ্ছে কি না নয়; বরং নতুন কাঠামোর ভেতরে পুরোনো রাষ্ট্রটি কতটা বদলাচ্ছে।

র‌্যাব আর নেই—১৬ সেপ্টেম্বরের গেজেটে তার জায়গায় স্পেশাল রেসপন্স ব‍্যাটালিয়ন বা SRB কার্যকর হয়েছে। নতুন আইনে পুরোনো র‌্যাবের সদস্য, সম্পদ, নথি, দায়-দায়িত্ব ও চলমান কার্যক্রম নতুন বাহিনীতে স্থানান্তরের বিধান রাখা হয়েছে; একই সঙ্গে স্বচ্ছতা, তদারকি ও জবাবদিহির কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ নামের পাতায় RAB থেকে SRB—একটি অক্ষর বদলেছে, সঙ্গে আইনের কাঠামোও বদলানোর দাবি এসেছে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্ররা জানেন, প্রতিষ্ঠানের চরিত্র শুধু সাইনবোর্ডে লেখা থাকে না; থাকে তার ক্ষমতার ব্যবহার, তদারকির কঠোরতা এবং নাগরিকের প্রতি আচরণে। বিরোধী পক্ষ ও অধিকারকর্মীদের কেউ কেউ অবশ্য প্রশ্ন তুলেছেন—পুরোনো কাঠামো ও জনবল বহুলাংশে থাকলে পরিবর্তনটি কতটা মৌলিক হবে। 

আইনশৃঙ্খলার এই পুনর্গঠনের পাশে নাগরিক জীবনের খবরটি একটু বেশি কাঁটার মতো। সংসদ ভবনের কাছে ছিনতাইয়ের ঘটনায় শিক্ষক রঞ্জিলা পারভীনের মৃত্যুর মামলায় ডিবি নতুন দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং জানিয়েছে, আগে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার তিনজন ওই ঘটনায় জড়িত ছিলেন না; অথচ তাঁরা এখনও কারাগারে আছেন। একটি মামলায় তদন্তের এই মোড় আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শুধু দ্রুত গ্রেপ্তার করাই সাফল্য নয়, সঠিক মানুষকে সঠিক সময়ে সঠিক প্রমাণে আইনের সামনে দাঁড় করানোই আসল দক্ষতা। নইলে রাষ্ট্রের হাত দ্রুত হলেও তার চোখ যদি একটু ঝাপসা থাকে, নাগরিকের ভয় কমে না।

পুলিশের আধুনিকায়ন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বাড়ানোর আলোচনা তাই কাগুজে সংস্কারের বাইরে বাস্তব পরীক্ষার জায়গা তৈরি করছে। কারণ নির্বাচনের দিনে পুলিশ শুধু আইনশৃঙ্খলার বাহিনী নয়—ভোটারের নিরাপত্তা, কেন্দ্রের পরিবেশ এবং রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার দৃশ্যমান মুখও বটে। আর এই পরীক্ষার আরেকটি আন্তর্জাতিক অধ্যায় খুলছে নিউইয়র্কে। প্রধানমন্ত্রী তার প্রথম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎ ভাবনা তুলে ধরবেন; জলবায়ু পরিবর্তনও সেখানে বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে সরকার জানিয়েছে। বাংলাদেশ এবার শুধু বক্তৃতা দিতে যাবে না—বিশ্বমঞ্চে রাষ্ট্রটি নিজের নতুন পরিচয় কতটা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে, সেটিও দেখার বিষয়।

এদিকে গণমাধ্যম নিয়ে সরকারের বক্তব্যও বেশ স্পষ্ট: তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী বলেছেন, সরকার গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না এবং মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পরিবেশ বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই আলোচনায় ভুল তথ্য, অপতথ্য ও মানহানিকর বক্তব্য ঠেকানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও এসেছে। এখানেই গণতন্ত্রের চিরন্তন দড়ির খেলা—এক পাশে স্বাধীনতা, অন্য পাশে দায়িত্ব; একটিকে বেশি টানলে অন্যটি হাঁপিয়ে ওঠে। সম্পাদকীয় আলোচনায় তাই জোর দেওয়া হচ্ছে ভীতিহীন সাংবাদিকতার ওপর; আর রাজস্ব মামলার দীর্ঘ জট নিয়েও প্রশ্ন উঠছে—১০-১৫ বছরের মামলা যদি আদালতের তাকেই ধুলো খাওয়ায়, তবে রাষ্ট্রের রাজস্ব কোথায়, বিচারই বা কোথায়? যে রাষ্ট্র নাগরিকের কাছ থেকে কর নেয়, তার পাওনা আদায়েও যদি এক যুগ লাগে, সেখানে ফাইলের বয়স কখনও কখনও মানুষের বয়সকে হার মানায়। 

সামাজিক মাধ্যম আজও তার স্বভাবসিদ্ধ দুই মুখ দেখাচ্ছে। রাজধানীর ছিনতাই ও নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে মানুষের ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে; একই সঙ্গে ভুল পরিচয়ে ছড়ানো একটি ছিনতাইয়ের ভিডিওও ভাইরাল হয়েছে—যেটিকে ভারতের ঘটনা বলা হলেও যাচাইয়ে দেখা গেছে সেটি ঢাকার। অর্থাৎ নাগরিকের ভয় সত্যি, কিন্তু ভয়কে ঘিরে ছড়ানো প্রতিটি ভিডিও সত্যি নয়। ডিজিটাল যুগের এই নতুন বিপদটি বেশ মজার: আগে মানুষ গুজব শুনত, এখন গুজবের সঙ্গে উচ্চমানের ভিডিও-প্রমাণও পায়। ফলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে সংবাদ যাচাইয়ের দায়িত্বটিও সমান জরুরি হয়ে উঠছে। 

পৃথিবীর অন্য প্রান্তে অবশ্য রাষ্ট্রের সংস্কারের ভাষা আরও ভারী। ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের জন্য প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তির পরিকল্পনা করছে, যাতে ২,০০০ পাউন্ড ওজনের ৪০ হাজার বোমা থাকার কথা; প্রস্তাবটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি এবং কংগ্রেসকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। আর মক্কার কাছে হুতিদের একটি ড্রোন ধ্বংসের দাবি করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট; হুতিরা মক্কাকে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ পবিত্র নগরীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে। পৃথিবীর খবর শুনতে শুনতে মাঝে মাঝে মনে হয়—মানুষ চাঁদে যাওয়ার প্রযুক্তি শিখেছে, কিন্তু পৃথিবীতে একে অন্যের দিকে বোমা না ছোড়ার বিদ্যাটি এখনও পাঠ্যসূচিতে ঢোকেনি। 

সপ্তাহের শেষ সকালে তাই হিসাবটি খুব জটিল নয়। RAB-এর নাম বদলে SRB হয়েছে, পুলিশকে আধুনিক করার কথা হচ্ছে, নিউইয়র্কে নতুন বাংলাদেশের কথা বলা হবে, গণমাধ্যমকে স্বাধীন রাখার প্রতিশ্রুতি এসেছে। সবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু রাষ্ট্রের সংস্কারের শেষ পরীক্ষাটি কোনো গেজেট, সংবাদ সম্মেলন কিংবা আন্তর্জাতিক বক্তৃতায় নয়—সেটি হবে সেই সাধারণ নাগরিকের জীবনে, যে রাতে বাসায় ফেরে, থানায় যায়, আদালতে মামলা করে, কর দেয় এবং সকালে খবরের কাগজ খুলে দেখে তার রাষ্ট্রটি আজ সত্যিই একটু বদলেছে কি না। নাম বদলানো সহজ; রাষ্ট্রের স্বভাব বদলানোই আসল কাজ।