Dhaka Mail Logo

মতামত

পুরোনো ঘোড়ায় আর কত দূর যাওয়া যায়?

১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৭ পিএম

বাংলাদেশে প্রতিবছর ২০–২২ লাখের বেশি তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। এত মানুষের কাজ আসবে কোথা থেকে? তৈরি পোশাক, প্রবাসী আয়, চামড়া—আমাদের পুরোনো ঘোড়াগুলোকে দৌড়াতেই হবে; কিন্তু একই ঘোড়ায় চড়ে আর কত দূর যাওয়া যায়? নতুন কাজ, নতুন ব্যবসা এবং ডলার আয়ের নতুন পথ খুঁজতেই হবে। সেই নতুন পথের একটি হতে পারে সিলভার ইকোনমি—বয়স্ক মানুষের স্বাস্থ্য, কেয়ারগিভিং, সহায়ক প্রযুক্তি, পর্যটন ও নানা সেবাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিশাল বৈশ্বিক বাজার, যার আকার প্রায় ৪ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। প্রশ্ন তাই শুধু আমরা কত মানুষ বিদেশে পাঠাব তা নয়; আগামী পৃথিবী কী ধরনের দক্ষতা ও সেবা কিনবে, আর বাংলাদেশ তার কতটা দিতে পারবে।

এ জন্য নতুন কোনো দপ্তর খোলার প্রয়োজন নেই—আমাদের দপ্তরের সংখ্যা এমনিতেই কম নয়, কখনো কখনো দপ্তর খুঁজতেই নাগরিকের আরেকটি দপ্তর হয়ে যেতে হয়! বরং প্রবাসীকল্যাণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাণিজ্য, শিল্প ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বিএমইটি, এনএসডিএ, বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স করা যেতে পারে। দেশভিত্তিক চাহিদা দেখে বিদ্যমান কয়েকটি টিটিসিকে বিশেষায়িত কেয়ারগিভিং একাডেমিতে রূপান্তর করা যায়; সেখানে কেয়ারগিভিংয়ের পাশাপাশি জাপানি, জার্মান, কোরীয়সহ প্রয়োজনীয় ভাষা ও সংশ্লিষ্ট দেশের কাজের নিয়ম শেখানো হবে। বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও নিয়োগদাতাদের সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও সনদের মান যুক্ত করা গেলে বাংলাদেশ শুধু ‘লোক পাঠাবে’ না—দক্ষতা রপ্তানি করবে, পণ্য ও সেবা রপ্তানি করবে, এবং ৪ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের এই নতুন অর্থনীতির দরজায় নিজের নামটিও লিখতে পারবে।

এই ভবিষ্যতের সঙ্গে আজকের আরেকটি আশাবাদের খবর জুড়ে দেওয়া যায় আকাশপথে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে নতুন ২১টি উড়োজাহাজ যুক্ত করার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে; বোয়িং এবং এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হতে পারে বলে জানা গেছে। জাতীয় পতাকাবাহী বিমানের সক্ষমতা বাড়ানো মানে শুধু নতুন কিছু উড়োজাহাজ কেনা নয়—নতুন রুট, যাত্রী, পর্যটন, বাণিজ্য এবং বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনা। অর্থাৎ আমরা যদি দক্ষ মানুষ তৈরি করতে পারি, তাদের পৃথিবীর বাজারে পৌঁছে দেওয়ার পাখাও যেন ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে।

মাটির খবর অবশ্য একেবারে নির্ভার নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সামনে পরপর দুটি এবং ক্যাম্পাসের আরেক স্থানে একটি ককটেল বিস্ফোরণের খবর এসেছে। সুপ্রিম কোর্টের মূল ফটকে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ দেখে দুই সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করার কথাও জানিয়েছে প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয় ও আদালত—দুটিই এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে বিস্ফোরণের চেয়ে যুক্তির শব্দই বেশি মানায়। তবে আশার জায়গাটি হলো, ঘটনাগুলোর তদন্ত এগোচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নিজ নিজ দায়িত্বেই ফিরতে হবে। গণতন্ত্রের শেষ কথা হলো—অস্থিরতার মধ্যেও প্রতিষ্ঠান যেন স্থির থাকে।

একটি সম্পাদকীয় পাতায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ এবং একটি টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আরেকটি বিশ্লেষণে ব্রিকসের নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র ও পরিবর্তিত বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা এসেছে। পৃথিবীর রাজনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে; বড় শক্তিগুলো নিজেদের জায়গা নতুন করে মাপছে। বাংলাদেশের জন্য তাই শুধু কে কার সঙ্গে আছে তা দেখলেই হবে না—পরিবর্তিত পৃথিবীতে নিজের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক জায়গাটি কোথায়, সেটিও হিসাব করতে হবে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মহাকাশও যেন আর কেবল কবিদের জায়গা থাকছে না। মহাকাশে মার্কিন প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে চীন ও রাশিয়ার উদ্বেগ নতুন সামরিক প্রতিযোগিতার আশঙ্কা তৈরি করেছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে অস্ট্রিয়ার নিষেধাজ্ঞা ও তেহরানের প্রতিবাদও আন্তর্জাতিক কূটনীতির উত্তাপ বাড়াচ্ছে। পৃথিবীর বড় শক্তিগুলো যখন আকাশের ওপরে নতুন প্রতিযোগিতার হিসাব করছে, আমাদের মতো দেশের জন্য তখন স্থির বুদ্ধির কূটনীতি, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতাই সবচেয়ে কার্যকর ঢাল।

আজকের সকালের সুর তাই একটু আশাবাদী থাকুক। কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ কেবল তার আজকের অস্থিরতা দিয়ে লেখা হয় না; লেখা হয় সে আগামী দিনের জন্য কতটা প্রস্তুতি নিচ্ছে, তার ওপর। ৪ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সিলভার ইকোনমি, ২১টি সম্ভাব্য নতুন উড়োজাহাজ ঘিরে নতুন সম্ভাবনা, কোটি তরুণের শ্রমশক্তি—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে দরজা কম নয়। দরকার শুধু কোন দরজাটি আগে খুলব, সেটি বুঝে নেওয়া। আকাশে উড়োজাহাজ উঠবে, মানুষ পৃথিবীর বাজারে যাবে, নতুন সেবা ও দক্ষতা রপ্তানি হবে—এই স্বপ্নটুকু দেখতে খুব বেশি কল্পনাশক্তি লাগে না। লাগে শুধু রাষ্ট্রের একটু দূরদৃষ্টি আর আমাদের পুরোনো অভ্যাসগুলোকে মাঝে মাঝে ছুটিতে পাঠানোর সাহস।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (২০০১-২০০৬)