Dhaka Mail Logo

মতামত

মৃত্যুর রাত!

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৩ এএম

রাত প্রায় দশটা। ধানমন্ডি পাঁচ নম্বর রোড। সুধা সদনের সামনে তখন রাস্তা আর রাস্তা নেই-একটি উত্তপ্ত জনসমুদ্র। চল্লিশ-পঞ্চাশজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মী, সঙ্গে নানা বয়সের উত্তেজিত লোকজন। তাদের মধ্যে ছাত্রলীগের নেতা লিয়াকত সিকদার ও পপি-কে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে দেখা যাচ্ছিল। স্লোগান, চিৎকার আর ক্রোধে জায়গাটা যেন ধীরে ধীরে একটি অদৃশ্য বিস্ফোরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর সেই ভিড়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা তিনজন।

আমার হাতে একটি চিঠি। চিঠিটির ওপর প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর। আমি তখনও জানি না-চিঠিটি পৌঁছাবে না। বরং চিঠি পৌঁছে দিতে গিয়ে আমাদেরই হয়তো লাশ হয়ে ফিরতে হবে।

দুদিন আগে, ২১ আগস্ট, ঢাকার গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছেন। নিহত হয়েছেন আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী; আহত হয়েছেন শত শত মানুষ। পুরো দেশ তখন শোক, ক্ষোভ, আতঙ্ক আর রাজনৈতিক সন্দেহে উত্তাল।

প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেদিন লক্ষ্মীপুরে জনসভায় ছিলেন। খবর পেয়েই ঢাকায় ফিরে আসেন। পরে সিএমএইচে গিয়ে আহত শেখ হাসিনা ও আইভি রহমানকে দেখতে যান।

পরদিন আমি নিজের উদ্যোগে বিএনপি সরকারের জন্য একটি সাত দফা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছিলাম। নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতার দায় নির্ধারণ, উচ্চপর্যায়ের তদন্ত, আহতদের রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা, নিহতদের জন্য ক্ষতিপূরণ, সরকারের পক্ষ থেকে গভীর শোক ও সমবেদনা-এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, প্রধানমন্ত্রী নিজে বিরোধীদলীয় নেত্রীর বাসভবনে গিয়ে সমবেদনা জানাবেন। আমার বিশ্বাস ছিল, রাজনীতির সংঘাত যতই থাকুক, রাষ্ট্রের ভাষা অন্তত মানবিক থাকা উচিত।

প্রধানমন্ত্রীও যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সুধা সদনের চারপাশের রাস্তা তখন কার্যত অবরুদ্ধ। ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মীরা দিনভর রাস্তা দখল করে রেখেছে। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা দলের অগ্রবর্তী সদস্যদেরও সেখানে গিয়ে মারধরের শিকার হতে হয়েছে। রাষ্ট্র চাইলে শক্তি প্রয়োগ করে প্রধানমন্ত্রীকে সুধা সদনে নিয়ে যেতে পারত। কিন্তু তাতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে-এই আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো না।

২৩ আগস্ট সন্ধ্যার পর মন্ত্রিসভায় বিষয়টি আবার উঠল। সিদ্ধান্ত হলো-প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে একটি চিঠি পাঠানো হবে। চিঠির খসড়া তৈরির দায়িত্ব পেলেন প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব মারুফ কামাল সোহেল (পরবর্তীতে বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব ও প্রতিদিন বাংলাদেশের সম্পাদক)। তিনি খসড়াটি তৈরি করে আমার কাছে এলেন। আমরা বসে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করলাম এবং পরামর্শের ভিত্তিতে চিঠিটি চূড়ান্ত হলো। পরে সেটি প্রিন্ট হয়ে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হয়।

এবার প্রশ্ন-চিঠি নিয়ে সুধা সদনে যাবে কে?

প্রথমে মহাসচিব মান্নান ভূঁইয়াকে বলা হলো। তিনি রাজি হলেন না। ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকা-তিনিও না। মির্জা আব্বাস-তিনিও যেতে অস্বীকার করলেন। রাজনৈতিক সচিব হারিস চৌধুরীও রাজি হলেন না।

একজন একজন করে সবাই যখন পিছিয়ে গেলেন, তখন মান্নান ভূঁইয়াই শেষ পর্যন্ত বললেন- ‘আলমকে পাঠান। ও সাহসী ছেলে।’

সাহসী ছেলে! এই বিশেষণটির ভয়াবহ মূল্য আমি তখনও জানতাম না।

কেবিনেট সভা শেষ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী আমাকে তার কক্ষে ডাকলেন। সেখানে ছিলেন রাজনৈতিক সচিব হারিস চৌধুরী এবং সম্ভবত এলজিআরডি মিনিস্টার বিএনপি মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়াও।

ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন-

‘তুমি কোথায় যাবে এখন?’ বললাম, ‘বাসায় যাব, ম্যাডাম।’

তিনি বললেন, ‘তুমি কি সুধাসদনে যেতে পারবে?’

আমি এক মুহূর্তও ভাবলাম না। ‘জি, ম্যাডাম। পারব।’

তিনি চিঠিটি আমার হাতে তুলে দিলেন।

আমি বেরিয়ে এলাম।

গাড়িতে উঠতে যাচ্ছি, এমন সময় প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব মহিউদ্দিন খান মোহনের সঙ্গে দেখা।

‘আলম ভাই, কই যান?’

বললাম, ‘এক জায়গায় যাচ্ছি। আপনি যাবেন?’

তিনি কোনো প্রশ্ন করলেন না। গাড়িতে উঠে বসলেন।

samsul-alom-2

দরজা বন্ধ করছি, এমন সময় বিটিভির ক্যামেরাম্যান জাহিদ হোসেন ভূঁইয়াও বাড়ির পথে যাচ্ছিলেন।

‘আপনারা কই যান?’ বললাম, ‘এক জায়গায় যাচ্ছি। আপনি যাবেন?’

তিনিও উঠে বসলেন। এই হলো আমাদের দল।

আমি-একটি চিঠি হাতে।

মোহন ভাই-কোথায় যাচ্ছি, ভালো করে না জেনেই।

জাহিদ ভাই-ক্যামেরা হাতে, একইভাবে না জেনেই।

তিনজন মানুষ। একটি পুরোনো গাড়ি। আর সামনে সুধা সদন।

কিন্তু সেদিন রওনা হওয়ার পর আমার মাথা যতটুকু কাজ করেছিল, তার মধ্যে একটি কাজ করেছিলাম-মাকে ফোন করেছিলাম।

গাড়ি থেকে শুধু বলেছিলাম- ‘আমি একটা বিপজ্জনক কাজে যাচ্ছি, মা। দোয়া করো।’

আর কিছু বলিনি।’

আমার স্ত্রীকেও আগে জানাইনি। পরে বলেছিলাম। মা হয়তো বুঝতেও পারেননি, তার ছেলে তখন এমন একটি জায়গার দিকে যাচ্ছে, যেখানে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার জীবনের শেষ রাত হয়ে যেতে পারত।

প্রথমে তেজগাঁও থানায় গেলাম। কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে সঙ্গে নেওয়া হলো। সারাদিনের উত্তেজনার মধ্যে যেকোনো জায়গায় বিপদ হতে পারে-সেই বিবেচনায় এটুকু নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছিল।

পুলিশ আমাদের ধানমন্ডি পাঁচ নম্বর রোডের কাছাকাছি পৌঁছে দিল। তারপর আমরা গাড়ি থেকে নেমে গেলাম।

ড্রাইভারকে বললাম- ‘তুমি এখানে থাকো। গাড়ি স্টার্ট রেখো।’

গাড়িটি ছিল আমার পুরোনো গাড়ি। সম্ভবত ১৯৮১ বা ১৯৮২ মডেলের টয়োটা করোলা।

সেদিন সেই পুরোনো গাড়িটিই শেষ পর্যন্ত আমাদের পালানোর বাহন হবে-তা কে জানত!

আমরা তিনজন হাঁটতে শুরু করলাম।

কিছুদূর যেতেই মানুষের জটলা। প্রথমে মনে হলো বিশ-পঁচিশজন। আরও এগোতেই দেখলাম—চল্লিশ-পঞ্চাশজন। মাত্র দু/তিন জন পুলিশ রাস্তায়।

সামনে লিয়াকত সিকদার, পপি এবং তাদের সঙ্গে উত্তেজিত ছাত্রলীগ কর্মীদের একটি দল। স্লোগান দিচ্ছে- ‘রক্তের বদলায় রক্ত!’

আমি সামনে এগিয়ে গেলাম।

ভিড়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললাম- ‘আমি ভেতরে যাব। আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। প্রধানমন্ত্রীর চিঠি দিতে এসেছি।’

ওরা বলল- ‘যেতে পারবেন না।’

বললাম, ‘আমার সময় দেওয়া আছে।’

উত্তর আরও কঠিন- ‘তবুও যেতে পারবেন না।’

আমার হাতে তখন শুধু একটি চিঠি। কোনো অস্ত্র নেই। কোনো নিরাপত্তা নেই। শুধু প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর। কিন্তু সেই স্বাক্ষরেরও সেখানে কোনো ক্ষমতা ছিল না।

আমি সরে এলাম। একটা বিল্ডিংয়ের নিচে এসে দাঁড়ালাম।

এদিকে টেলিভিশনের ক্যামেরা চলছে। চ্যানেল আইয়ের (বর্তমানে মরহুম) মাহবুব মতিনও ফুটেজ নিচ্ছেন। মোহন ভাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘আলম ভাই, কিছু বলবেন?’ বললাম, ‘না, আপনি চালিয়ে নেন।’

আমি রাজনৈতিক সচিবের কাছে পরিস্থিতি বর্ণনা করলাম। তিনি চেষ্টা করতে বললেন। হঠাৎ কয়েকজন লোক বিটিভির ক্যামেরার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। টানাটানি। ধস্তাধস্তি। জাহিদ ভাইয়ের ক্যামেরা প্রায় ছিনিয়ে নিল।

এক পর্যায়ে একজন সেটি মাথার ওপরে তুলে ধরল। মনে হলো এখনই মাটিতে আছড়ে ফেলবে। আর তখনই আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো।

আমি গর্জে উঠলাম- ‘এই! বিটিভি! আপনারা এখানে কেন এসেছেন? কে ডাকছে? যান! ভাগেন! ক্যামেরাটা দিয়ে দেন!’

লোকগুলো যেন আচমকা বিভ্রান্ত হয়ে গেল। ক্যামেরাটি ফেরত দিল। ক্যামেরা বাঁচল।

জাহিদ ভাইও বাঁচলেন। তার চাকরিটাও বোধ হয় সেদিন বেঁচে গেল।

কিন্তু মাহবুব মতিন তখনও কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি দ্রুত ক্যাসেট খুলে তার সহকারীর হাতে দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন বাইকে করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকেও ধরে ফেলল বিক্ষুব্ধ লোকজন।

‘কী রেকর্ড করছেন?’ ‘ক্যাসেট দেন।’

মাহবুব ক্যাসেট খুলে দিলেন। কিন্তু তারা জানত না- ক্যাসেটটি ফাঁকা।

ততক্ষণে ফুটেজ প্রচার হয়ে গেছে টিভিতে। আমাদের উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে গেছে।

দেশ জেনে গেছে- আমরা সুধা সদনের সামনে। রাত তখন প্রায় দশটা পার হয়ে গেছে।

চারপাশে অন্ধকার। রাস্তার মিটমিটে আলো। আর ওদিকে মানুষের ভিড় ক্রমেই বাড়ছে।

কয়েকটি গাড়ি এসে থামল। আরও লোক নামল।

স্লোগান শুরু হলো-

‘রক্তের বদলায় রক্ত!’ আমরা তিনজন একে অন্যের দিকে তাকালাম। কী হতে যাচ্ছে?

কেউ জানি না। আমি শেখ হাসিনার পিএসকে ফোন করলাম।

বললাম, ‘আমি এসেছি। প্রধানমন্ত্রীর চিঠি নিয়ে।’ তিনি বললেন, ‘আসতে পারেন।’

কিন্তু কিছুক্ষণ পর আর ফোন ধরলেন না।

এদিকে পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। লোক বাড়ছে। স্লোগান বাড়ছে। রাগ বাড়ছে। আর আমাদের চারপাশের বাতাস যেন ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে।

ঠিক তখনই- একজন মোটা মানুষ, সাদা শার্ট পরা দৌড়ে এলেন।

তিনি আমাকে জাপটে ধরে বললেন- ‘ভাই! ভাই! দৌড় দেন!’ আমি হতভম্ব।

‘কেন?’ তিনি প্রায় চিৎকার করে বললেন- ‘আপনাকে মেরে ফেলবে!’ এরপর আর কোনো প্রশ্ন করিনি। দৌড় দিলাম। গাড়ি আগে থেকেই স্টার্ট করা। আমরা উঠতেই ড্রাইভার এক টানে গাড়ি ছুটিয়ে দিল। ধানমন্ডির রাস্তা পেছনে পড়ে রইল। গাড়ি সোজা সংসদ ভবনের দিকে।

সেদিন মনে হয়েছিল-সংসদ ভবনের গেটের ভেতর ঢুকতে পারাটাই যেন জীবনের দ্বিতীয় জন্ম। সংসদ ভবনে গিয়ে অফিস খুললাম। বসলাম। তারপর শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নম্বরে ফোন করলাম।

‘নেত্রী, আমি শামসুল আলম। প্রধানমন্ত্রীর চিঠি নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু আমাকে মেরে ফেলার মতো পরিস্থিতি হয়েছিল। চিঠিটা দিতে পারিনি। আপনার নম্বরে ফ্যাক্স করে পাঠিয়ে দিয়েছি। পরে কুরিয়ার করে দেব।’

তারপর বাড়িতে ফোন করে জানালাম, আমি ফিরে এসেছি। কিন্তু তখনও জানতাম না- যে মানুষটি আমাকে সেদিন মৃত্যুর মুখ থেকে টেনে বের করেছিলেন, তিনি কে।

কয়েক মাস পর।

ঈদের আগের দিন রাত। এলিফ্যান্ট রোডে গিয়েছি পর্দার কাপড় কিনতে। এক দোকান থেকে আরেক দোকানে যাচ্ছি। হঠাৎ একজন লোক এসে আমার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল। আমার হাত স্বভাবতই পকেটে গেল। পিস্তল বের করে তার পেটে ঠেকিয়ে দিলাম।

লোকটি আঁতকে উঠলেন- ‘ভাই! ভাই! ওটা নামান!’ বললাম, ‘আগে পরিচয় দেন। তারপর নামাব।’

লোকটি বললেন- ‘ভাই, আমি সেই লোক।’ ‘কোন লোক?’

‘সেদিন সুধা সদনে আপনাকে যে সরিয়ে দিয়েছিলাম।’

আমি থমকে গেলাম। তিনি বললেন- ‘আপনি সেদিন কেন গিয়েছিলেন?’

বললাম, ‘কেন?’

তিনি বললেন- ‘ওখানে তো আপনাকে মেরে ফেলা হতো!’

আমি চুপ করে রইলাম।

তিনি বলতে লাগলেন- ‘আমরা শরীয়তপুর-মাদারীপুরের অনেক লোক ছিলাম সেখানে। আপনাকে দেখে মনে হলো, আপনি তো নিরীহ মানুষ। আপনাকে কেন মারবে?’

তারপর বললেন- ‘আমি তাই দৌড়ে গিয়ে আপনাকে সরিয়ে দিয়েছিলাম।’ আমি ধীরে ধীরে পিস্তল নামিয়ে নিলাম।

কয়েক মাস আগে রাতের অন্ধকারে যে মানুষটি শুধু একটি বাক্য বলেছিলেন- ‘ভাই, দৌড় দেন’- আজ হঠাৎ তার পরিচয় পেলাম। সেদিন তাকে ধন্যবাদ দেওয়ার সময় ছিল না। সেদিন শুধু বাঁচতে হয়েছিল। আজ তাকে ধন্যবাদ দিলাম।

আজ এত বছর পর সেই রাতের দিকে ফিরে তাকালে মনে হয়, ২৩ আগস্ট ২০০৪-এর রাতটি শুধু আমার জীবনের একটি ভয়ংকর রাত ছিল না; সেটি ছিল রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষের বিবেকেরও এক অদ্ভুত পরীক্ষার রাত।

একদিকে ২১ আগস্টের রক্তাক্ত স্মৃতি। অন্যদিকে রাজনৈতিক অবিশ্বাস, ক্ষোভ ও প্রতিহিংসা। তার মাঝখানে ছিল একটি চিঠি- একজন প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর করা, একজন বিরোধীদলীয় নেত্রীর প্রতি শোক ও সমবেদনার বার্তা।

চিঠিটি সুধা সদনের দরজা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। রাষ্ট্রের ভাষা সেদিন মানুষের ভিড়ে আটকে গিয়েছিল। আর সেই চিঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন সরকারি কর্মচারীকে ফিরে আসতে হয়েছিল মৃত্যুর মুখ থেকে।

সেদিন আরও দুটো লাশ পড়তে পারত- আমার এবং মহিউদ্দিন খান মোহনের। জাহিদ ভাইও ছিলেন আমাদের সঙ্গে। কিন্তু আল্লাহ আমাদের ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আজ ভাবি, মানুষের হিসাব বড় বিচিত্র।

যে চারজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ যেতে রাজি হননি, শেষ পর্যন্ত দায়িত্বটি এসে পড়ল আমার ঘাড়ে। আমি একবারও ভাবিনি, সেখানে যাওয়া মানে কী। মোহন ভাই ও জাহিদ ভাইও ভাবেননি। আমরা তিনজন যেন কোনো অদৃশ্য নির্দেশে একটি পুরোনো গাড়িতে উঠে বসেছিলাম।

তারপর একজন অচেনা মানুষ দৌড়ে এসে বললেন-

‘ভাই, দৌড় দেন!’ আমি দৌড়েছিলাম।

কখনো কখনো জীবন বাঁচানোর জন্য মানুষের হাতে কোনো যুক্তি থাকে না, কোনো পরিকল্পনা থাকে না—থাকে শুধু একটি মুহূর্ত, একটি সিদ্ধান্ত এবং আল্লাহর অদৃশ্য হেফাজত। সেদিন আমার হাতে ছিল প্রধানমন্ত্রীর একটি চিঠি।

চিঠিটি পৌঁছাতে পারিনি। কিন্তু আমি ফিরে এসেছিলাম।

আজও মনে হয়, সেদিন হয়তো আমি শুধু একজন মানুষের কথায় দৌড়াইনি। হয়তো সেই অচেনা মানুষের কণ্ঠে আল্লাহই আমাকে বলেছিলেন—

‘এখনও তোমার সময় হয়নি।’ আলহামদুলিল্লাহ। হায়াত-মওতের মালিক একমাত্র আল্লাহ।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (২০০১-২০০৬)