Dhaka Mail Logo

মতামত

রাজনীতির পুরোনো খেলা, বাংলাদেশের নতুন চ্যালেঞ্জ

০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪০ এএম

বাংলাদেশ এক পরিচিত ছন্দে নতুন সপ্তাহ শুরু করেছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জ্বালানি সংকটকে দেশের সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে স্বীকার করেছেন এবং আশ্বস্ত করেছেন, সরকার স্বল্পমেয়াদী সমাধান ও দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষাব্যবস্থা উভয় নিয়েই কাজ করছে। এদিকে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট ছয় দফা দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছে এবং তাদের দাবি পূরণ না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। অর্থাৎ রাজনীতির পুরোনো ব্যায়ামটি আবার শুরু হয়েছে—একজন বললেন, অন্যজন শুনলেন; তারপর অন্যজন বললেন, প্রথমজন শুনলেন। জনগণ অবশ্য দুজনকেই শুনছে, এবং বাংলাদেশের জনগণের স্মৃতিশক্তি নিয়ে রাজনীতিবিদদের যতই সন্দেহ থাকুক, তারা শেষ পর্যন্ত বাজারের হিসাবটি বেশ ভালোই মনে রাখে।

তবে এতে এখনই ভীত হওয়ার কারণ নেই। রাজনীতিতে চাপাচাপি থাকবে—এটাই খেলার নিয়ম। একজন চাল দেবেন, আরেকজন পাল্টা চাল দেবেন; মাঝে মাঝে এমনও হবে যে দুজনেই ভাববেন, তিনিই দাবার বোর্ডের গ্যারি কাসপারভ। কিন্তু এবার অন্তত একটা ভালো খবর আছে: উভয় পক্ষই সংসদে বসে। কাজেই রাজপথে যতই মাইক বাজুক, সমস্যার শেষ ঠিকানা হওয়া উচিত জাতীয় সংসদ। সেখানে তর্ক হোক, হাততালি হোক, টেবিল চাপড়ানোও প্রয়োজনে হোক—শুধু চেয়ার যেন না উড়ে। কারণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো, মতের লড়াই থাকবে; কিন্তু লড়াইয়ের জন্য একটি সভ্য ঘরও থাকবে। সংকট হলে আলোচনা হবে, দরকার হলে সমঝোতা হবে, আবার মানুষও তার নিজের কাজে ফিরে যাবে। পুরোনো রাজনীতির ছায়া দেখা দিয়েছে বলেই যে পুরোনো দিনের অন্ধকারও ফিরে আসবে—এমন দুর্ভাগ্যজনক ভবিষ্যদ্বাণী করার কোনো কারণ নেই।

কারণ রাজনীতির বক্তৃতার বাইরে দেশের আসল গল্পটি অন্যত্র লেখা হচ্ছে। জ্বালানি সংকটে রপ্তানিমুখী কলকারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার দাবি উঠেছে। কথাটি শুনতে অর্থনীতির, কিন্তু এর ভেতরে শ্রমিকের সংসার, উদ্যোক্তার ঋণ, রপ্তানিকারকের অর্ডার এবং রাজনীতির পুরোনো খেলা, বাংলাদেশের নতুন চ্যালেঞ্জ

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব—সবই আছে। গ্যাস না থাকলে কারখানা বন্ধ হয়; কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিকের চুলা ঠান্ডা হয়। অর্থনীতির অভিধানে এই সম্পর্কটি খুব জটিল নয়, যদিও নীতিনির্ধারণের টেবিলে মাঝে মাঝে ব্যাপারটি আশ্চর্যজনকভাবে জটিল হয়ে যায়। একই সময়ে স্বাস্থ্য খাতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পদ শূন্য থাকার খবরও এসেছে। ৩,২০০ চিকিৎসক নিয়োগের পরও যদি মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকে, তবে ভবন দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা হয় না—যেমন খালি চেয়ার দিয়ে সভা করা যায়, কিন্তু সভায় সিদ্ধান্ত হয় না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন e-Payment Credit উদ্যোগটিও তাই আলাদা করে দেখার মতো। সাধারণ মানুষ জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদি ঋণ পাবেন—অঙ্কটি রাষ্ট্রের কাছে সামান্য, কিন্তু মাসের শেষ সপ্তাহে একজন মানুষের কাছে দশ হাজার টাকা কখনো কখনো দশ লাখের সমান গুরুত্বপূর্ণ। ছেলেমেয়ের স্কুলের খরচ, ওষুধ, বাজার—জীবন বড় অদ্ভুত হিসাব জানে। তবে ঋণ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঋণ ফেরতের বুদ্ধিটিও শেখানো দরকার। নইলে ডিজিটাল ঋণ খুব দ্রুত ডিজিটাল দুশ্চিন্তায় পরিণত হতে পারে। অর্থনীতির সবচেয়ে পুরোনো সত্যটি প্রযুক্তি বদলালেও বদলায় না—ধার করলে শোধ করতে হয়।

সামাজিক মাধ্যমের একটি ছবি আবার বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যরকম চেহারা দেখিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গাড়িবহর একনজর দেখার জন্য সাধারণ মানুষের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার দৃশ্য ভাইরাল হয়েছে। মানুষের এই আবেগ রাজনীতির জন্য সম্পদ—নেতাকে দেখতে মানুষ রাস্তার পাশে দাঁড়ায়, হাত নাড়ায়, ছবি তোলে; গণতন্ত্রে এর মধ্যে এক ধরনের সরল মানবিকতা আছে। কিন্তু সেই ভিড়ের মধ্যেই নিরাপত্তাবলয় ভেদ করে একজন ছাত্রলীগ কর্মী ঢুকে পড়ার ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে—ভালোবাসারও বাউন্ডারি থাকে। ক্রিকেটে বাউন্ডারি পার হলে চার, নিরাপত্তার বাউন্ডারি পার হলে কিন্তু চার নয়; সেখানে তদন্ত বসে। প্রধানমন্ত্রী দলীয় নেতা হতে পারেন, কিন্তু রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান হিসেবে তাঁর নিরাপত্তায় সামান্য ফাঁকও বড় ঝুঁকি। অতএব আবেগ থাকুক, ছবি হোক, হাত নাড়া হোক—নিরাপত্তা যেন অটুট থাকে।

দেশের সীমানার বাইরে তাকালেও মন খুব নিশ্চিন্ত হয় না। বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে; মার্চ থেকে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ আশি হাজার ছাড়িয়েছে এবং প্রায় এক হাজার শিশুর মৃত্যুর খবর এসেছে। সংখ্যাটি পড়তে পড়তে আমাদের মনে রাখা দরকার—এক হাজার মানে শুধু একটি সংখ্যা নয়, এক হাজারটি পরিবার, এক হাজারটি অসমাপ্ত গল্প। আর আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও কিলিয়ান এমবাপ্পে নিজেদের রেকর্ডের গল্প লিখে চলেছেন। একজন হাজার গোলের মাইলফলকের দিকে এগোচ্ছেন, অন্যজন ফ্রান্সের হয়ে গোলের নতুন ইতিহাস তৈরি করছেন। পৃথিবী এমনই বিচিত্র—এক জায়গায় মানুষ হিসাব করছে কয়টি গোল হলো, অন্য জায়গায় পরিবার হিসাব করছে শিশুটিকে বাঁচানো যাবে কি না। মানুষের সভ্যতার সৌন্দর্যও বোধহয় এই বৈপরীত্যের মধ্যেই—আমরা একই দিনে রেকর্ডের জন্য হাততালি দিই এবং মৃত্যুর খবর শুনে নীরব হয়ে যাই।

রবিবারের এই প্রথম সকালে তাই গতকালের রাজনীতিকে দেখে খুব ভয় পাওয়ার দরকার নেই; বরং একটু হাসিমুখে তাকানো যেতে পারে—যদি হাসির আড়ালে দায়িত্বটিও মনে থাকে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজস্ব খেলা খেলবে, সংসদে সরকার-বিরোধী পক্ষ তর্ক করবে, রাজপথে মিছিল হবে; এটাই গণতন্ত্র। কিন্তু মানুষের প্রত্যাশা আরও সরল: জ্বালানি থাকবে, কারখানা চলবে, বাজার সহনীয় থাকবে, চিকিৎসক থাকবে, শিশু টিকা পাবে এবং প্রধানমন্ত্রী নিরাপদ থাকবেন। শেষ পর্যন্ত জনগণ খুব বেশি কিছু চায় না—রাষ্ট্রটি যেন রাষ্ট্রের মতো আচরণ করে। রাজনীতির পুরোনো চাল ফিরে আসুক, তাতে আপত্তি নেই; শুধু বাংলাদেশ যেন পুরোনো ভুলের ঘুঁটি না হয়ে যায়। নতুন সপ্তাহের প্রথম সকালটি তাই হোক একটু হাসির, একটু আত্মসমালোচনার এবং অনেকখানি কাজের। সপ্তাহের ব‍্যস্তময় প্রথম দিনটি ভালো কাটুক।