০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
শনিবারের সকাল। ঢাকা আজ একটু ধীর-অফিসগামী মানুষের ভিড় কম, রাস্তায় তাড়া কম, চায়ের কাপে অবকাশ একটু বেশি। সপ্তাহের এই একটি দিন মানুষ যেন নিজের সঙ্গে একটু দেখা করতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের বোধ হয় শনিবার নেই। বাজারে দ্রব্যমূল্য তার নিজের নিয়মে চলে, মশা ছুটির দিন বোঝে না, হাসপাতালের দরজা রোগীর জন্য সবসময় খোলা থাকে না, আর রাজনীতিরও ক্যালেন্ডারে অবকাশ নেই। আজ ১১-দলীয় বিরোধী জোটের ঢাকা-চট্টগ্রাম লং মার্চ সেই নাগরিক অস্বস্তিরই একটি রাজনৈতিক প্রকাশ; আয়োজকদের হিসাবে প্রায় ১,৫০০ যানবাহন এতে অংশ নেবে।
দাবির মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলার উন্নতি—দুটি কথাই আছে, অথচ এই দুটি কথার মধ্যেই আজকের বাংলাদেশের বহু পরিবারের সকাল-সন্ধ্যার হিসাব লেখা।
রাজনীতির রাজপথ থেকে যদি একটু সরে হাসপাতালের দিকে তাকাই, ছবিটি আরও মর্মস্পর্শী। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ উপজেলা হাসপাতালে নানা ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকার খবর এসেছে। অপারেশন থিয়েটার আছে, কিন্তু অপারেশন নেই—ব্যাপারটি শুনলে প্রথমে কৌতুক মনে হতে পারে; কিন্তু যে রোগীকে জেলা শহরে ছুটতে হয়, ধার করে টাকা জোগাড় করতে হয়, তার কাছে এটি কোনো কৌতুক নয়। রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন রাজধানীর হাসপাতালের সঙ্গে প্রত্যন্ত উপজেলার হাসপাতালের দূরত্ব শুধু মানচিত্রে থাকে, চিকিৎসার সুযোগে নয়। তার ওপর ডেঙ্গু আবার দরজায় কড়া নাড়ছে।
৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ বছর দেশে ৪০ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১১১-এ পৌঁছেছে। মশাটি ছোট, কিন্তু তার হাতে যেন রাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি বড় আয়না।
কৃষকের ক্ষেতেও আয়নাটি খুব আলাদা নয়। সম্পাদকীয়তে প্রান্তিক কৃষকের জন্য বরাদ্দ সরকারি সহায়তা প্রকৃত চাষির কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা ও লক্ষ্যভ্রষ্টতার সমালোচনা করে সঠিক ও স্বচ্ছ বণ্টনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কৃষককে সহায়তা করা মানে শুধু কৃষককে সাহায্য করা নয়—এটি শহরের বাজারকে শান্ত রাখা, খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং একটি পরিবারের হাঁড়িতে ভাত নিশ্চিত করা। কাগজে যদি কৃষকের জন্য সার থাকে, গুদামে যদি বীজ থাকে, বাজেটে যদি টাকা থাকে—তবু মাঠে যদি তার দেখা না মেলে, তবে রাষ্ট্রের হিসাব মিললেও কৃষকের হিসাব মেলে না। আর কৃষকের হিসাব না মিললে শেষ পর্যন্ত শহরের মধ্যবিত্তের বাজারের খাতাটিও মেলে না।
তবে এই দীর্ঘ অস্বস্তির ভেতরেও বাংলাদেশের একটি অন্য মুখ আছে। ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ট্রাভেল মার্ট ২০২৬ আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে—বাংলাদেশ শুধু সমস্যা সামলানোর দেশ নয়, সম্ভাবনা তৈরির দেশও হতে পারে। পর্যটন, সংস্কৃতি, নদী, পাহাড়, সমুদ্র, ঐতিহ্য এবং মানুষের আতিথেয়তাকে যদি সুশৃঙ্খল অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে পর্যটন কেবল বেড়ানোর আনন্দ নয়, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক আয়েরও বড় উৎস হতে পারে। তিন দিনের এই আয়োজন সেই সম্ভাবনার দরজায় একটি ছোট্ট কড়া নাড়া। আমাদের দুর্ভাগ্য, দরজা খুলতে আমরা মাঝে মাঝে এত সময় নিই যে অতিথি ফিরে গিয়ে নিজের দেশেই হোটেল বানিয়ে ফেলেন।
সামাজিক মাধ্যমেও আজ দেশের বড় উদ্বেগগুলোর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আশ্রিত বিপুল রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন, দেশের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে নাগরিক ক্ষোভ বাড়ছে। মানবিকতার দায় বাংলাদেশ পালন করেছে; কিন্তু মানবিকতার স্থায়ী সমাধানও তো দরকার। একই সময়ে কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাস সেখানকার বাংলাদেশিদের চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে, বিশেষ করে সামরিক স্থাপনা থেকে দূরে থাকতে এবং হামলার ছবি-ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রচার না করতে বলেছে। বিদেশে কাজ করতে যাওয়া একজন বাংলাদেশির কাছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি তাই আর টেলিভিশনের পর্দার খবর নয়—তার ঘরের দরজার বাইরের বাস্তবতা।
আর পৃথিবীও যেন আজ একটু বেশি অস্থির। নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যা বিপুল; নেপালেই মৃতের সংখ্যা ১,২৮৭ এবং নিখোঁজ ৫,০৮৩ বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ড্রোন হামলা ও ইরানকে ঘিরে নতুন উত্তেজনা বিশ্বকে আবারও জ্বালানি ও নিরাপত্তার অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই পৃথিবীতে হরমুজ প্রণালি থেকে ঢাকার রান্নাঘর খুব বেশি দূরে নয়; যুদ্ধের ধোঁয়া শেষ পর্যন্ত তেলের দাম হয়ে আসে, তেলের দাম পরিবহন ব্যয় হয়ে আসে, আর পরিবহন ব্যয় একদিন বাজারের থলিতে গিয়ে বসে। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখন আর দূরের কোনো রাজধানীর বিষয় নয়—এটি আমাদের প্রতিদিনের সংসারেরও অদৃশ্য অতিথি।
শনিবারের এই শান্ত সকালে তাই মনে হয়, রাষ্ট্রের আসল পরীক্ষা খুব বড় কোনো বক্তৃতায় নয়—একজন রোগী উপজেলা হাসপাতালে অস্ত্রোপচার পেলেন কি না, একজন কৃষক তার প্রাপ্য সহায়তা পেলেন কি না, একজন নাগরিক রাতে নিরাপদে বাড়ি ফিরলেন কি না, একটি পরিবার বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে স্বস্তিতে ঘরে ফিরতে পারল কি না—সেখানেই। আমাদের সামনে সমস্যা কম নয়; কিন্তু সম্ভাবনাও কম নয়। বাংলাদেশের সৌন্দর্য যেমন তার নদীতে, পাহাড়ে, সমুদ্রে—তেমনি তার শক্তি তার মানুষের মধ্যে। প্রয়োজন শুধু সেই মানুষটির পাশে রাষ্ট্রকে দাঁড় করানো। শনিবার তাই বিশ্রামের হোক, কিন্তু দায়িত্বের নয়; ছুটি হোক অফিসের, মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার নয়। আজকের দিনটি হোক একটু শান্ত, একটু সুন্দর, আর আগামীকালটির জন্য একটু বেশি আশাবাদী।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব