০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৮ এএম
শুক্রবারের সকাল মানেই একটু থেমে নিজের দিকে তাকানোর দিন। সপ্তাহের ব্যস্ততার ভিড়ে জুমার আজান যেন মনে করিয়ে দেয়—দুনিয়ার সব হিসাবের ওপরে আরেকটি হিসাব আছে; সেখানে পদ-পদবি, ক্ষমতা কিংবা সম্পদের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় আমানত ও জবাবদিহি। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন আমানত তার হকদারের কাছে পৌঁছে দিতে এবং মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়বিচার করতে।” রাষ্ট্রের অর্থনীতি থেকে কৃষকের গোলা—এই আয়াতের শিক্ষা সর্বত্র প্রযোজ্য। কারণ একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু বড় বড় প্রকল্পের অঙ্কে নয়, মানুষের হক কতটা নিরাপদ—তার মধ্যেই মাপা হয়।
এই দৃষ্টিতে জ্বালানি নিরাপত্তায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন দেশের তেল পরিশোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ মেট্রিক টন থেকে ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার লক্ষ্যে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গ্রুপের সঙ্গে বড় একটি চুক্তি করেছে। আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি কমিয়ে নিজেদের পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানো শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি আমানত রক্ষারও উদ্যোগ। তবে প্রকল্পের অর্থায়ন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ স্বচ্ছতা, সময়ানুবর্তিতা ও ব্যয়ের প্রতিটি টাকার যথাযথ ব্যবহার। বড় প্রকল্প তখনই বড় হয়, যখন তার সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছায়।
ব্যাংক খাতেও আজ সংস্কারের প্রয়োজনটি তেমনি স্পষ্ট। জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘ব্যাংক রেজোলিউশন (সংশোধন) বিল ২০২৬’ উত্থাপন করেছেন; দুর্বল ব্যাংকের মালিকানা ফিরে পাওয়ার বিতর্কিত বিধানটি বাদ দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে এতে। ব্যাংক মানুষের আমানতের প্রতিষ্ঠান—এখানে মালিকের স্বার্থের চেয়ে আমানতকারীর নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতাই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। যে অর্থ মানুষ কষ্ট করে জমায়, সেটি কারও ব্যক্তিগত খেলার পুঁজি নয়। ইসলামও সম্পদ ও আমানতের ব্যাপারে সতর্ক করেছে; সুতরাং ব্যাংক সংস্কারের মূলনীতি হওয়া উচিত—আমানতকারীর স্বার্থ, জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচার।
কিন্তু অর্থনীতির বড় নীতির পাশে কৃষকের ছোট্ট বস্তাটিও যেন হারিয়ে না যায়। আমন মৌসুমে দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার সরকারি দাবি থাকলেও মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম সংকট ও ডিলারদের কারসাজির অভিযোগে কৃষকদের ক্ষোভ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে কৃষকের কণ্ঠস্বর যতটা উচ্চ, তার চেয়েও উচ্চ হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেক। সার গুদামে থাকলেই কৃষকের হক আদায় হয় না; সঠিক সময়ে, সঠিক দামে, সঠিক মানুষের হাতে পৌঁছালেই আমানত পূর্ণ হয়। একজন কৃষককে যদি তার প্রয়োজনীয় সার পাওয়ার জন্য দালালের দরজায় দাঁড়াতে হয়, তবে সমস্যা শুধু বাজারে নয়—ব্যবস্থাপনার কোথাও একটি দরজা ঠিকমতো খোলা নেই।
জাতীয় সম্পাদকীয়ও যেন একই কথার দুই অধ্যায়। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করে সবুজ অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে একটিতে; অন্যটিতে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর তাগিদ রয়েছে। কোরআনে অপচয় সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে—“নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।” আমাদের শহরের আবর্জনা যদি সম্পদে পরিণত হয়, কৃষির বর্জ্য যদি জ্বালানিতে রূপ নেয়, আর জলবায়ুর ক্ষতি মোকাবিলায় বিশ্ব যদি ন্যায্য অর্থ দেয়—তবে পরিবেশ রক্ষা কেবল স্লোগান থাকবে না, অর্থনীতিরও নতুন দরজা খুলবে। প্রকৃতি আল্লাহর আমানত; তাকে নষ্ট করে উন্নয়ন করা শেষ পর্যন্ত নিজের ঘরেই আগুন ধরানো।
বিশ্বের দিকে তাকালেও আজ মানুষের অসহায়ত্ব চোখে পড়ে। হরমুজ প্রণালী ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নতুন সামরিক-কূটনৈতিক উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। আর নেপালে ভয়াবহ বন্যা—যাকে কেউ কেউ ‘হিমালয়ান সুনামি’ বলছেন—প্রাণহানি এক হাজার দুইশ ছাড়িয়ে গেছে এবং দেশটি জরুরি আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে। পাহাড়ের ঢল কিংবা সমুদ্রপথের সামরিক উত্তেজনা—দুটিই আমাদের শেখায়, পৃথিবী এখন এমন এক ঘরে বসবাস করছে যেখানে এক প্রান্তের আগুন অন্য প্রান্তের চুলার আঁচ বদলে দিতে পারে। তাই জাতীয় নিরাপত্তা আর শুধু সীমান্ত পাহারা নয়; জ্বালানি, খাদ্য, পানি, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
জুমার এই পবিত্র দিনে শেষ কথাটি তাই খুব সাধারণ—আমানত রক্ষা করুন। যে কৃষকের ঘামে খাদ্য আসে, তার হক রক্ষা করুন; যে নাগরিকের টাকায় ব্যাংক চলে, তার আমানত রক্ষা করুন; যে জনগণের করের টাকায় প্রকল্প হয়, তার প্রতিটি পয়সার হিসাব দিন; আর যে পৃথিবী আল্লাহ আমাদের বসবাসের জন্য দিয়েছেন, তাকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ রাখুন। রাষ্ট্র যদি ন্যায়কে ভিত্তি করে, প্রশাসন যদি আমানতদার হয় এবং মানুষ যদি নিজের দায়িত্বটুকু পালন করে, তবে সংকট যত বড়ই হোক পথ নিশ্চয়ই বের হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হালাল রিজিক, ন্যায়বিচার, আমানতদারি ও সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন।