নিজস্ব প্রতিবেদক
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২৭ পিএম
ছয় হাজার ৫০০ জিবিপিএস থেকে আগামী ১০ বছরে ৩০ থেকে ৪০ হাজার জিবিপিএস—এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে বাংলাদেশের ইন্টারনেট কোন পথে যাবে। তবে ৩০ থেকে ৪০ হাজার জিবিপিএস চাহিদা তৈরি হবে কি না, তা আগামী দিনের বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করবে।
বাংলাদেশের ইন্টারনেট নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো, দেশের ইন্টারনেট কি ভারতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে? কেউ কেউ বলছেন, বাংলাদেশের ইন্টারনেট সার্বভৌমত্ব ভারতের কাছে জিম্মি। আবার কেউ বলছেন, বাংলাদেশে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ ব্যান্ডউইথ ভারতীয় ভূখণ্ড দিয়ে আসায় দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা হুমকির মুখে।
বিষয়টি নিয়ে আবেগ, রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নয়; প্রয়োজন সঠিক প্রযুক্তিগত তথ্য।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আমরা মনে করি, বাংলাদেশের ইন্টারনেট ভারতের কাছে জিম্মি—এ বক্তব্য পুরোপুরি সঠিক নয়। কিন্তু ভারতের স্থলভিত্তিক আন্তর্জাতিক রুটের ওপর বাংলাদেশের অতিরিক্ত নির্ভরতা যে একটি কৌশলগত ঝুঁকি, সেটি অত্যন্ত বাস্তব।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশের ইন্টারনেটের বর্তমান অবস্থা কী এবং আগামী এক দশকে আমরা কোথায় যেতে চাই।
৬ হাজার ৫০০ জিবিপিএসের বাংলাদেশ
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহার প্রায় ৬ হাজার ৫০০ জিবিপিএস বা ৬ দশমিক ৫ টিবিপিএস পর্যায়ে ছিল। এর প্রায় ৬০ শতাংশ, অর্থাৎ আনুমানিক ৩ হাজার ৯০০ জিবিপিএস, ভারতীয় স্থলভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্ট্রিয়াল কেবল বা আইটিসি রুট দিয়ে আসছিল। বাকি প্রায় ৪০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার ৬০০ জিবিপিএস আসছিল রাষ্ট্রীয় বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস পিএলসির সাবমেরিন কেবল থেকে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের অর্ধেকেরও বেশি একটি প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ডনির্ভর স্থলপথের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
এ কারণেই ২০২৫ সালে বিটিআরসি ভারতীয় আইটিসি রুটের ব্যবহার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশে সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ভারতীয় রুটের অংশ ৩০ শতাংশে নামিয়ে সাবমেরিন কেবলের অংশ ৬০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য জানানো হয়। অবশিষ্ট ১০ শতাংশের জন্য স্যাটেলাইট বা অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থার কথা বলা হয়।
এই সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে, সরকার নিজেও একটি মাত্র আন্তর্জাতিক রুটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি উপলব্ধি করেছে।
ছয়টি আইটিসি কোম্পানি কারা
২০১২ সালে বাংলাদেশে ছয়টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্ট্রিয়াল কেবল বা আইটিসি লাইসেন্স দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—
১. নভোকম লিমিটেড
২. ওয়ান এশিয়া-এএইচএল জয়েন্ট ভেঞ্চার বা ওয়ান এশিয়া অ্যালায়েন্স কমিউনিকেশন
৩. বিডি লিংক কমিউনিকেশন লিমিটেড
৪. ম্যাঙ্গো টেলিসার্ভিসেস লিমিটেড
৫. সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেড
৬. ফাইবার অ্যাট হোম লিমিটেড
বিটিআরসির পুরোনো লাইসেন্স–সংক্রান্ত তথ্য ও আন্তর্জাতিক অবকাঠামোবিষয়ক গবেষণাতেও এই ছয় প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া যায়। তবে পরবর্তী সময়ে আইটিসি লাইসেন্সধারীর সংখ্যা নিয়ে পরিবর্তন এসেছে। সাম্প্রতিক নথি ও সংবাদ প্রতিবেদনে সাতটি আইটিসি অপারেটরের কথা বলা হয়েছে। তাই ছয়টি কথাটি মূলত ২০১২ সালের লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি আইটিসি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
এখানে আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের আইটিসি কোম্পানি এবং ভারতের ব্যান্ডউইথ সরবরাহকারী কোম্পানি এক জিনিস নয়।
বাংলাদেশের আইটিসি প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতীয় ভূখণ্ডে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার বা নেটওয়ার্ক প্রোভাইডারের কাছ থেকে সক্ষমতা সংগ্রহ করে বাংলাদেশে নিয়ে আসে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব আপস্ট্রিম প্রোভাইডারের মধ্যে ভারতী এয়ারটেল, টাটা কমিউনিকেশনস, সিফাই টেকনোলজিস, লাইটস্টর্ম টেলিকম কানেকটিভিটি এবং রিলায়েন্স জিও ইনফোকমের মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ভারতীয় টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক ট্রাইয়ের নথিতেও এসব প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক সংযোগ ও ক্যারিয়ার কার্যক্রমের উপস্থিতি দেখা যায়।
সুতরাং সংবাদ ও জনআলোচনায় ছয়টি ভারতীয় কোম্পানি বাংলাদেশে ইন্টারনেট দেয়—এভাবে বললে বিষয়টি অতিরিক্ত সরলীকরণ হয়ে যায়।
ভারতীয় রুট আসলে কোথা দিয়ে
বাংলাদেশ-ভারত স্থলভিত্তিক আন্তর্জাতিক ফাইবারের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোর একটি হলো বেনাপোল-পেট্রাপোল রুট। ভারতীয় দিকের নেটওয়ার্ক কলকাতা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক কানেকটিভিটি হাবের সঙ্গে যুক্ত। বিভিন্ন ভারতীয় ক্যারিয়ারের নিজস্ব জাতীয় ব্যাকবোন এবং সাবমেরিন কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টির কৌশলগত গুরুত্ব এখানেই।
বাংলাদেশের আইটিসি সংযোগ শুধু ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ নয়; ভারতীয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এটি আবার আন্তর্জাতিক সাবমেরিন কেবল, ডেটা সেন্টার, ক্লাউড এবং বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যাকবোনের সঙ্গে যুক্ত হয়।
অর্থাৎ, ভারত এখানে শুধু কনটেন্টের উৎস নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে ট্রানজিট এবং আন্তর্জাতিক কানেকটিভিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডগত পথ। তাহলে কি ফেসবুক, ইউটিউব, গুগল ও অ্যামাজনের ইন্টারনেট ভারত থেকে আসে এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল ধারণা রয়েছে।
বাংলাদেশে ফেসবুক, ইউটিউব, গুগল, অ্যামাজন বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কনটেন্ট ডেলিভারির ক্ষেত্রে সিডিএন, ক্যাশ এবং ডিস্ট্রিবিউটেড সার্ভার আর্কিটেকচার ব্যবহৃত হয়। জনপ্রিয় কনটেন্ট অনেক সময় ব্যবহারকারীর কাছাকাছি নেটওয়ার্ক নোডে ক্যাশ করা থাকে।
তাই একজন বাংলাদেশি ইউটিউব ব্যবহার করলেই তাঁর প্রতিটি ভিডিও ভারতীয় কোনো সার্ভার থেকে আসছে, এমন নয়। আবার এটাও বলা যাবে না যে আইটিসি দিয়ে আসা ব্যান্ডউইথ শুধু বিনোদনের জন্য ব্যবহৃত হয়।
আইটিসি হলো আন্তর্জাতিক কানেকটিভিটির একটি পথ। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের আইপি ট্রাফিক, আন্তর্জাতিক ট্রানজিট, প্রাইভেট কানেকটিভিটি এবং অন্যান্য ডেটা সেবা চলাচল করতে পারে।
সুতরাং আইটিসি মানেই ফেসবুক-ইউটিউবের ব্যান্ডউইথ—এ ধারণা প্রযুক্তিগতভাবে অসম্পূর্ণ। তাহলে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন কোথায় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি অন্য জায়গায়।
ধরা যাক, বাংলাদেশের ৬ হাজার ৫০০ জিবিপিএস আন্তর্জাতিক চাহিদার প্রায় ৩ হাজার ৯০০ জিবিপিএস একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক স্থলপথ দিয়ে আসছে। কোনো কারণে সেই পথের বড় অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে কী হবে? এটাই মূল প্রশ্ন।
একটি রাষ্ট্রের ব্যাংকিং ব্যবস্থা, মোবাইল আর্থিক সেবা, সরকারি ওয়েবসাইট, হাসপাতাল, বিমানবন্দর, রপ্তানি বাণিজ্য, ই-কমার্স, সংবাদমাধ্যম, শিক্ষা, ক্লাউড সেবা এবং মোবাইল যোগাযোগ যদি একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক রুটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়, তাহলে সেই নির্ভরতা অবশ্যই জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়।
এটিকে সরাসরি ভারতের কাছে সার্বভৌমত্ব হস্তান্তর বলা ঠিক হবে না। কিন্তু এটিকে কৌশলগত নির্ভরতা বলা অবশ্যই যায়। সাবমেরিন কেবলই কি একমাত্র সমাধান না। বরং আমাদের প্রয়োজন একাধিক আন্তর্জাতিক রুট।
বাংলাদেশের দুটি কার্যকর সাবমেরিন কেবল—সি-মি-উই-৪ এবং সি-মি-উই-৫—বর্তমানে আন্তর্জাতিক কানেকটিভিটির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বিএসসিপিএলসির তথ্য অনুযায়ী, এই দুই ব্যবস্থার মোট সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ২০০ জিবিপিএস। ২০২৫ সালের অক্টোবরে এর প্রায় ৪ হাজার ২০০ জিবিপিএস দেশীয়ভাবে ব্যবহার হচ্ছিল এবং আরও প্রায় ৩ হাজার জিবিপিএস বরাদ্দযোগ্য সক্ষমতা ছিল। এখানে একটি ইতিবাচক বিষয় আছে।
বিএসসিপিএলসি তৃতীয় সাবমেরিন কেবল সি-মি-উই-৬ বাস্তবায়ন করছে। কোম্পানির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের এই নতুন কেবল সংযোগের মাধ্যমে প্রায় ৩০ হাজার জিবিপিএস বা ৩০ টিবিপিএস সক্ষমতা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৬ সালের শেষ প্রান্তিক বা ২০২৭ সালের শুরুতে সেবা চালুর লক্ষ্য রয়েছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সামনে এখন বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সক্ষমতা তৈরি করলেই হবে না। প্রশ্ন হলো, আমরা সেই সক্ষমতা ব্যবহার করছি কি না। আগামী ১০ বছরে চাহিদা কত হতে পারে এখানে একটি বাস্তবসম্মত হিসাব করা প্রয়োজন।
২০২৫ সালের বেঞ্চমার্ক হিসেবে যদি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা ৬ হাজার ৫০০ জিবিপিএস ধরা হয়, তাহলে আগামী ১০ বছরে চাহিদা কী হতে পারে, তার তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট তৈরি করা যায়।
১৫ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হলে: ২০৩৫ সালে চাহিদা দাঁড়াবে প্রায় ২৬ হাজার ৪০০ জিবিপিএস বা ২৬ দশমিক ৪ টিবিপিএস।
১৮ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হলে: ২০৩৫ সালে চাহিদা হবে প্রায় ৩৪ হাজার জিবিপিএস বা ৩৪ টিবিপিএস।
২০ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হলে: চাহিদা দাঁড়াবে প্রায় ৪০ হাজার ৩০০ জিবিপিএস বা ৪০ দশমিক ৩ টিবিপিএস।
আর ২৫ শতাংশের মতো উচ্চ প্রবৃদ্ধি হলে তা ৬০ টিবিপিএসের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
এগুলো সরকারি পূর্বাভাস নয়। বর্তমান ৬ দশমিক ৫ টিবিপিএস ভিত্তির ওপর যৌগিক বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার প্রয়োগ করে করা পরিকল্পনাগত হিসাব।
কিন্তু বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি, ফাইভজি, ক্লাউড কম্পিউটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আইওটি, ভিডিও স্ট্রিমিং, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল আর্থিক সেবা, ডেটা সেন্টার এবং এন্টারপ্রাইজ কানেকটিভিটি দ্রুত বাড়লে ১৮ থেকে ২০ শতাংশের মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি অসম্ভব নয়।
অতএব, ২০৩৫ সালের জন্য অন্তত ৩০ থেকে ৪০ টিবিপিএস আন্তর্জাতিক সক্ষমতার পরিকল্পনা করা উচিত।
৩০ টিবিপিএস সি-মি-উই-৬ কি যথেষ্ট
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে। ৩০ টিবিপিএস সক্ষমতা মানেই ৩০ টিবিপিএস ব্যবহার করা যাবে, এমন নয়।
সক্ষমতা হলো সম্ভাব্য পরিবহন ক্ষমতা। এর পাশাপাশি প্রয়োজন রুট ডাইভারসিটি, রিডানড্যান্সি, দেশীয় ব্যাকবোন, আইআইজি সক্ষমতা, ডেটা সেন্টার, সিডিএন, বিদ্যুৎ এবং দুর্যোগ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা।
যদি ২০৩৫ সালে বাংলাদেশের চাহিদা ৩৪ থেকে ৪০ টিবিপিএস হয়, তাহলে শুধু সি-মি-উই-৬-এর ৩০ টিবিপিএস সক্ষমতা দিয়ে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।
আমাদের তখন প্রয়োজন হবে—সাবমেরিন কেবল, আইটিসি, নতুন আন্তর্জাতিক স্থলভিত্তিক রুট, স্যাটেলাইট, প্রাইভেট সাবমেরিন কেবল এবং স্থানীয় সিডিএন ও ক্যাশ—সব মিলিয়ে একটি বহুমুখী ব্যবস্থা।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বন্ধ নয়, নির্ভরতা কমানো দরকার
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন ভারতীয় আইটিসি রুট বন্ধ করার দাবি করে না। কারণ, আইটিসি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প ও বৈচিত্র্যময় রুট।
বাস্তবে সাবমেরিন কেবলে সমস্যা হলে আইটিসি বাংলাদেশকে সচল রাখতে পারে। অতীতেও সাবমেরিন কেবল সমস্যার সময় আইটিসি অপারেটররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি সাবমেরিন কেবল সমস্যার সময় আইটিসির সক্ষমতা আন্তর্জাতিক সংযোগ সচল রাখতে সহায়তা করেছে।
সুতরাং আইটিসিকে দুর্বল করা নয়; বরং আইটিসি ও সাবমেরিন কেবল—দুটোকেই শক্তিশালী করা দরকার। সমস্যা হচ্ছে ভারসাম্যের।
একদিকে যদি ৬০ শতাংশ ভারতের আইটিসি রুটে থাকে, অন্যদিকে সাবমেরিন কেবলের সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকে, তাহলে সেটি জাতীয় অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা।
ইন্টারনেট সার্বভৌমত্ব মানে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়
আমরা মনে করি, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব শব্দটির অর্থও পরিষ্কার হওয়া দরকার। সার্বভৌম ইন্টারনেট মানে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়।
সার্বভৌম ইন্টারনেট মানে— বাংলাদেশ যেন কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল না হয়। ভারত থাকবে, সিঙ্গাপুর থাকবে, মধ্যপ্রাচ্য থাকবে, ইউরোপ থাকবে, সাবমেরিন থাকবে, স্থলভিত্তিক রুট থাকবে, স্যাটেলাইট থাকবে। কিন্তু কোনো একটি রুট বন্ধ হলে বাংলাদেশ যেন অচল না হয়ে যায়। এই নীতিই হওয়া উচিত বাংলাদেশের জাতীয় ইন্টারনেট স্থিতিশীলতা কৌশলের ভিত্তি।
এখনই পাঁচটি সিদ্ধান্ত প্রয়োজন
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আমরা পাঁচটি সুস্পষ্ট প্রস্তাব দিতে চাই।
প্রথমত, বিটিআরসিকে প্রতি মাসে প্রকাশ করতে হবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের কত শতাংশ কোন রুট দিয়ে আসছে।
দ্বিতীয়ত, আইটিসি, সাবমেরিন কেবল, স্যাটেলাইট ও প্রাইভেট সাবমেরিন কেবলের জন্য একটি জাতীয় বিকল্প সক্ষমতার অনুপাত নির্ধারণ করতে হবে। কোনো একটি রুট যেন মোট আন্তর্জাতিক সক্ষমতার বিপজ্জনক মাত্রায় না পৌঁছায়।
তৃতীয়ত, সি-মি-উই-৬ চালুর পর এর সক্ষমতা যাতে অব্যবহৃত না থাকে, সে জন্য প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, ভারত ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, সিঙ্গাপুর, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপমুখী একাধিক স্বাধীন স্থলভিত্তিক ও সাবমেরিন রুট তৈরি করতে হবে।
পঞ্চমত, ২০৩৫ সালের জন্য অন্তত ৩০ থেকে ৪০ টিবিপিএস আন্তর্জাতিক চাহিদার সম্ভাব্য দৃশ্যপট ধরে এখন থেকেই জাতীয় ব্যান্ডউইথ মহাপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।
শেষ কথা
বাংলাদেশের ইন্টারনেট ভারতের কাছে জিম্মি—এ কথা পুরো সত্য নয়। আবার ভারতের ওপর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা নেই—এ কথাও সত্য নয়। প্রকৃত সত্য মাঝখানে। বাংলাদেশ ভারতের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়; কিন্তু ভারতীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রুটের ওপর বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা রয়েছে। এই পার্থক্যটি বুঝতে হবে।
আজ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা প্রায় ৬ দশমিক ৫ টিবিপিএস। আগামী এক দশকে সেটি ৩০, ৩৫ কিংবা ৪০ টিবিপিএস ছাড়িয়ে যেতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড, ফাইভজি, আইওটি, স্ট্রিমিং, ডিজিটাল বাণিজ্য এবং ডেটা অর্থনীতি দ্রুত বাড়লে চাহিদা আরও বেশি হতে পারে।
তাই আজকের ৬ হাজার ৫০০ জিবিপিএস নিয়ে বিতর্ক করে সময় নষ্ট করার চেয়ে আগামী দিনের ৪০ হাজার জিবিপিএস বাংলাদেশের জন্য পরিকল্পনা করাই বেশি জরুরি।
আমরা চাই না বাংলাদেশের ইন্টারনেট ভারতনির্ভর হোক।
আমরা এটাও চাই না যে ভারতীয় আইটিসি বন্ধ করে বাংলাদেশের ইন্টারনেটকে দুর্বল করা হোক।
আমরা চাই—ভারত থাকবে, কিন্তু ভারত একমাত্র হবে না। সাবমেরিন থাকবে, কিন্তু সাবমেরিন একমাত্র হবে না। স্যাটেলাইট থাকবে, কিন্তু সেটিও একমাত্র সমাধান হবে না।
বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট স্থাপত্য, যেখানে একটি কেবল কাটা গেলে অন্য কেবল চালু থাকবে, একটি স্থলভিত্তিক রুট বন্ধ হলে অন্য রুট সক্রিয় হবে এবং একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলেও বাংলাদেশের নাগরিক, ব্যবসা ও রাষ্ট্রীয় সেবা ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। এটাই প্রকৃত ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব। ইন্টারনেটের স্বাধীনতা শুধু ব্যান্ডউইথের মালিকানায় নয়; বিকল্প সংযোগের সক্ষমতায়।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন মনে করে, এখনই সময় রাজনৈতিক স্লোগানের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের আগামী ১০ বছরের জন্য একটি জাতীয় ইন্টারনেট স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক সংযোগ কৌশল প্রণয়ন করার।
কারণ, আগামী দিনের অর্থনীতি যতটা ইন্টারনেটনির্ভর হবে, আগামী দিনের জাতীয় নিরাপত্তাও ততটাই নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা স্বাধীনভাবে তার ইন্টারনেট সচল রাখতে পারে, তার ওপর।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন
এআর