Dhaka Mail Logo

মতামত

একটু থামো, অন্তরের দিকে তাকাও

২৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৮ পিএম

শুক্রবারের সকালটি অন্য দিনের মতো নয়। সপ্তাহের ব্যস্ততা আজ একটু থামে, বাজারের কোলাহল কিছুটা দূরে সরে যায়, আর মানুষ—যদি সে নিজেকে একটু অবকাশ দেয়—নিজের ভেতরের মানুষের সঙ্গে দেখা করতে পারে। সুফিরা বলতেন, মানুষ যত দূরেই যাক, শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরতে হয় নিজের অন্তরের দরজায়। পৃথিবীর খবরও যেন আজ সেই দরজায় এসে কড়া নাড়ছে—ক্ষমতার, মৃত্যুর, প্রবাসের, রাজনীতির, যুদ্ধের; আর সব খবরের আড়ালে একটি পুরোনো প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই মানুষ হয়ে উঠছি?

জাতীয় সংসদের নতুন অধিবেশনের প্রথম দিনেই সেই প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিল। আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বিরোধী দলের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে প্রায় ১৪ মিনিট ধরে সংসদ উত্তপ্ত হয়; বিরোধী সদস্যদের প্রতিবাদের মুখে একপর্যায়ে মন্ত্রী তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করেন।  সংসদ আসলে কেবল ইট-পাথরের একটি ভবন নয়—এটি জাতির বিবেকের মঞ্চ। সেখানে কণ্ঠ যত উঁচু হয়, যুক্তি যেন তত নিচে নেমে না যায়—এইটুকু সংযমই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। জিহ্বা শুধু কথা বলার অঙ্গ নয়, আত্মারও পরীক্ষা; কথার আগে তাই নীরবতার সঙ্গে একটু পরামর্শ করে নেওয়া ভালো।

এরই মধ্যে সরকার হুইপসহ ৩০ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে নতুন দায়িত্ব দিয়েছে।  দায়িত্ব বদলায়, চেয়ার বদলায়, কাগজে স্বাক্ষর বদলায়; কিন্তু মানুষের প্রত্যাশা বদলায় না। একজন মন্ত্রীর নামের পাশে যত পদই লেখা থাকুক, শেষ বিচারে তাঁর পরিচয় একটিই—তিনি মানুষের আমানতদার। আর আমানতের হিসাব কাগজে নয়, মানুষের জীবনে লেখা থাকে। এই কারণেই আগস্টের প্রথম ২৬ দিনে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ২৪৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।  দূর মরুভূমিতে ঘাম ঝরানো মানুষের পাঠানো এই অর্থের প্রতিটি ডলারে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি মায়ের অপেক্ষা, একটি সন্তানের ভবিষ্যৎ—রাষ্ট্রের অর্থনীতির পরিসংখ্যানের চেয়েও যার মানবিক মূল্য অনেক বড়।

কিন্তু মানুষের ঘরে আলো জ্বলে যেমন প্রবাসীর পাঠানো অর্থে, তেমনি কোনো কোনো ঘরে হঠাৎ নেমে আসে এমন অন্ধকার যার ভাষা নেই। রিয়াদের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ বাংলাদেশির মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হওয়া নয়জনের মরদেহ দেশে পৌঁছেছে।  বিমানবন্দরে কফিন আসে, সঙ্গে আসে নয়টি পরিবারের পৃথিবী বদলে যাওয়ার গল্প। জীবিকার সন্ধানে যে মানুষ বিদেশে যায়, তার সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা সাধারণত খুব সামান্য—কিছু টাকা নিয়ে নিরাপদে ঘরে ফেরা। কখনো কখনো সেই ফেরাটা হয় কাঠের বাক্সে। তখন মনে হয়, মানুষের জীবনের হিসাবের খাতা কত অদ্ভুত—কেউ রেমিট্যান্সের অঙ্ক হয়ে দেশে ফেরে, কেউ ফেরে অশ্রুর অঙ্ক হয়ে।

রংপুরের একই পরিবারের চারজনের হত্যাকাণ্ডও মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। ময়নাতদন্তে চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যার তথ্য এসেছে; আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলেছে, ঘটনার প্রকৃতি, উদ্দেশ্য ও প্রকৃত জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও পেশাদার তদন্ত জরুরি।  সত্যের পথ কখনো তাড়াহুড়োর পথ নয়। অপরাধের বিচার যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সত্যের প্রতি ন্যায়বিচার। কারণ ভুল মানুষকে অপরাধী বানিয়ে দিলে শুধু একজন নির্দোষ মানুষের জীবনই নষ্ট হয় না—রাষ্ট্রের ন্যায়বোধের ওপরও একটি কালো দাগ পড়ে।

এই দাগের কথাই মনে করিয়ে দেয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মধ্যরাতের সেই ভিডিও—ঢাকা-টঙ্গী মহাসড়কে একটি মোটরসাইকেলের দুই তরুণের মাঝখানে এক তরুণীকে অচেতন অবস্থায় বহনের দৃশ্য। ভিডিওটি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও পুলিশ মোটরসাইকেলের নম্বর দেখে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছে; সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সব দাবি অবশ্য স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি।  এই ঘটনাটি যেন আমাদের আরেকটি শিক্ষা দেয়—দেখা আর জানা এক কথা নয়। একটি ছবি চোখকে উত্তেজিত করতে পারে, কিন্তু সত্য জানতে লাগে ধৈর্য। আজকের ডিজিটাল যুগে গুজবের গতি আলোর চেয়েও দ্রুত; তাই আঙুলের একটি স্পর্শে কোনো অজানা মানুষের বিচার করে ফেলার আগে বিবেককে একবার জিজ্ঞেস করা দরকার—“আমি কি সত্য জানি?”

এদিকে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে নতুন সদস্য নেওয়ার পথ খোলা রেখেছে পাকিস্তান। বাংলাদেশের সম্ভাব্য আগ্রহের প্রসঙ্গও আলোচনায় এসেছে।  ভূরাজনীতির এই নতুন সমীকরণে ঢাকা নিশ্চয়ই নিজের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার আলোকে পথ বেছে নেবে। সুফির পথ যেমন অন্ধ অনুসরণের পথ নয়, রাষ্ট্রের পথও তেমন নয়—বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু সিদ্ধান্ত হবে নিজের বিবেক ও প্রয়োজনের আলোকে। একই সময়ে দূর নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসে ভয়াবহ বন্যায় শত শত প্রাণ ঝরে গেছে, নিখোঁজের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে; প্রকৃতিও যেন মানুষকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, পৃথিবীর মালিকানা নিয়ে যত অহংকারই করি, একটি পাহাড়ি বরফের দেয়াল ভেঙে পড়লেই মানুষের সব হিসাব মুহূর্তে বদলে যেতে পারে। 

আজকের আকাশেও তাই এক অদ্ভুত ইশারা। বিরল আংশিক চন্দ্রগ্রহণে চাঁদের প্রায় ৯৬ শতাংশ পৃথিবীর ছায়ায় ঢাকা পড়বে; বাংলাদেশ থেকে পূর্ণ দৃশ্যটি দেখা যাবে না, তবে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে মানুষ আকাশের দিকে তাকাবে।  মানুষের জীবনও কি এমন নয়—আলো আছে, তার মাঝেই ছায়া; ক্ষমতা আছে, তার পাশে দায়িত্ব; সম্পদ আছে, তার পাশে অশ্রু; প্রযুক্তি আছে, তার পাশে প্রতারণা; রাজনীতি আছে, তার পাশে মানুষের নীরব প্রত্যাশা। শুক্রবারের এই অবকাশে তাই হয়তো সবচেয়ে জরুরি কাজ খবর পড়া নয়—খবরের ভেতর নিজেকে পড়া।

দুটি সম্পাদকীয়ের কথাও আজ একই জায়গায় এসে মিশে যায়। নেপালের বিপর্যয়কে তারা শুধু নেপালের শোক হিসেবে দেখেনি; দক্ষিণ এশিয়ার জন্য যৌথ হিমবাহ পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার প্রয়োজনের কথা বলেছে। একই পৃষ্ঠায় অনলাইন ঋণ প্রতারণা থেকে মানুষকে রক্ষার আহ্বানও এসেছে।  আরেকটি সম্পাদকীয় তরুণ উদ্যোক্তাদের সংগ্রামের দিকে তাকিয়েছে—উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিতে ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ডসহ নানা উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে তরুণদের সামনে এখনও বহু বাধা।  এক সম্পাদকীয় পাহাড়ের বরফ গলতে দেখে, অন্যটি তরুণের স্বপ্ন গলতে না দেওয়ার কথা বলে—দুটির মাঝখানে একই আর্তি: ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করতে হলে আজই দায়িত্বশীল হতে হবে।

আর পৃথিবীর অন্য প্রান্তে যুদ্ধের আগুন এখনও নিভেনি। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াচ্ছে, অথচ আলোচনার দরজাটি কার্যত বন্ধ। কাতারের প্রধানমন্ত্রী তেহরানে গিয়ে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছেন; হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও জাহাজ চলাচলও সেই কূটনীতির কেন্দ্রে।  ছয় মাসের যুদ্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কেউই যেন পুরোপুরি জিততে পারছে না, অথচ যুদ্ধের মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ—মূল্যস্ফীতি, খাদ্যের দাম, অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্য দিয়ে। 

শুক্রবারের শেষে তাই পৃথিবীকে নতুন করে আবিষ্কার করার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন শুধু তাকে একটু গভীর চোখে দেখা। সংসদে সংযম চাই, প্রশাসনে আমানতদারি চাই, প্রবাসীর ঘরে নিরাপদ ফেরার নিশ্চয়তা চাই, অপরাধের তদন্তে সত্য চাই, সামাজিক মাধ্যমে দায়িত্ব চাই, কূটনীতিতে প্রজ্ঞা চাই, আর যুদ্ধের পৃথিবীতে শান্তির জন্য মানুষের একটু বেশি সাহস চাই। সুফিরা হয়তো বলতেন—আলো খুঁজতে দূরে যেও না; অন্তরের প্রদীপটি জ্বালাও। কারণ মানুষের অন্তর আলোকিত হলে সংসদও একটু শান্ত হয়, রাষ্ট্রও একটু ন্যায়বান হয়, আর পৃথিবীটাও—অন্তত কিছুটা—বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব