Dhaka Mail Logo

মতামত

আস্থার সংকট, মানুষের আস্থা

২৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:০৭ এএম

সকালের চায়ের কাপটি হাতে নিয়ে আজকের খবরের কাগজ খুললে মনে হয়, রাষ্ট্র আসলে ইট-পাথরের কোনো বিশাল ভবন নয়—রাষ্ট্র মানুষের বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক অদৃশ্য ঘর। সেই ঘরের কোথাও আজ চেয়ার আছে, কিন্তু মানুষ নেই; কোথাও মানুষ আছে, কিন্তু চেয়ার নেই; কোথাও চেয়ারে বসা মানুষটির ওপর আস্থা নেই। আর ঘরের বাইরে, বন্যার পানিতে ভিজে, তরুণেরা নিজেদের পকেটের টাকা আর মানুষের কাছ থেকে সংগ্রহ করা সামগ্রী নিয়ে ছুটছে দুর্গত মানুষের কাছে। বড় বিচিত্র দেশ বাংলাদেশ!

ক্ষমতায় আসার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও প্রশাসনের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর জন্য আস্থাভাজন ও উপযুক্ত কর্মকর্তা বাছাই করতে পারছে না সরকার—এমন খবর এখন আর কেবল একটি প্রশাসনিক খবর নয়, এটি রাষ্ট্র পরিচালনার গভীর এক সংকেত। নিয়মিত কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ আগের সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন; ফলে তাঁদের মধ্য থেকে বাছাইয়ে তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট। এই সংকট সামলাতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আগের বিএনপি সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগ উঠেছে, অন্তত সাতজন সচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বেশ কিছু কর্মকর্তা এখনো বহাল আছেন; বিপরীতে বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত বহু কর্মকর্তা দাবি করছেন, তাদের এখন পদোন্নতি বা গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার পথে নতুন করে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্বগোত্রীরাই, যা প্রশাসনের জন্য অস্বস্তিকর। 

একটি রাষ্ট্রের প্রশাসন যদি অযোগ্যতা ও দলাদলিতে লিপ্ত হয়ে পড়েন, তা জনগনের কাছে ভুল বার্তা যায়। ভুল লোকের হাতে আমলাতন্ত্র পড়লে কেমন হতে পারে তার জলন্ত প্রমান জ্বালানী সংকট! সামনে আরও অনেক জটিলতা আসলে চোখ-মুখে অন্ধকার দেখতে হবে।

এখানে এসে ব্যাংকের হিসাবটিও যেন একই গল্পের আরেক অধ্যায় খুলে দেয়। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকার ৫৬ হাজার কোটি টাকা ধার করেছে; একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে আগের ঋণের প্রায় ৪৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করায় নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ অঙ্কটি যতটা ভয়াবহ শোনায়, তার ভেতরের হিসাবটি একটু অন্যরকম; তবু প্রশ্নটি থেকে যায়—রাষ্ট্রের রাজস্ব আয় যদি ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে, তবে ধার করার এই পথ কত দূর চলবে? 

সরকারের ঋণ নেওয়া নিজে কোনো পাপ নয়; পৃথিবীর প্রায় সব সরকারই ঋণ নেয়। সমস্যা শুরু হয় যখন ঋণ উৎপাদনশীল বিনিয়োগের বদলে দৈনন্দিন ঘাটতি মেটানোর অভ্যাসে পরিণত হয়। ব্যাংক থেকে সরকার বেশি ধার করলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের জোগান ও সুদের ওপর চাপ পড়তে পারে। তাই অর্থনীতির এই খবরটিও শেষ পর্যন্ত আস্থার খবর—মানুষ কি বিশ্বাস করবে যে আজকের ধার আগামী দিনের উৎপাদন বাড়াবে, নাকি কেবল আজকের ঘাটতি ঢাকবে?

রাষ্ট্রের হিসাবের খাতা যখন এত ভারী, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে ওঠা অন্য এক বাংলাদেশের ছবি মন ভালো করে দেয়। বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের নিজ উদ্যোগে ত্রাণ সংগ্রহ, অর্থ জোগাড়, নৌকায় করে খাবার পৌঁছে দেওয়ার ভিডিও ও পোস্ট ছড়িয়ে পড়ছে। কোনো মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ নেই, কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপন নেই, কোনো ফাইলের নোটিং নেই—আছে শুধু মানুষের জন্য মানুষের টান। এই দৃশ্যটি আমাদের একটু থামিয়ে দেয়। রাষ্ট্রযন্ত্রে আস্থার সংকট থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের আস্থা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

সম্ভবত এ কারণেই আজকের সম্পাদকীয় আলোচনায় জলবায়ু ও খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নটি এত গুরুত্বপূর্ণ। আকস্মিক বন্যা এখন আর শুধু কয়েক দিনের পানিবন্দিত্ব নয়; কৃষি উৎপাদন, বীজ, মাটি, বাজার, কৃষকের আয় এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যের দাম—সবকিছুর ওপর তার দীর্ঘ ছায়া পড়ে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণও বলছে, রেকর্ড উষ্ণতা, তাপপ্রবাহ, খরা, দাবানল ও বন্যা একই সঙ্গে পৃথিবীর জলবায়ুর নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠছে। 

অন্য সম্পাদকীয় আলোচনাটি ব্যাংক খাত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দিকে আঙুল তুলছে। খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বহু পুরোনো দুর্বলতা স্পষ্ট হচ্ছে। ঋণ শ্রেণিকরণ কঠোর হওয়ায় লুকিয়ে থাকা সমস্যাগুলো এখন প্রকাশ্যে আসছে; ঋণ আদায় ও অর্থঋণ আদালতের কার্যকারিতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ রোগটি নতুন নয়—শুধু এবার এক্স-রে মেশিনটি একটু ভালো হয়েছে। 

আর পৃথিবীর বড় মঞ্চে আজও শান্তির পর্দা উঠল না। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং বৃহত্তর যুদ্ধ-সমাপ্তির বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সমাধান দেখা যায়নি। ইরান নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে যুদ্ধেরই আরেক রূপ বলে সতর্ক করছে; অন্যদিকে পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ কূটনৈতিক পথ খোলা রাখার চেষ্টা করছে। হরমুজের জলরাশি তাই শুধু ভূগোলের একটি সরু প্রণালী নয়—আজ সেটি বিশ্ব অর্থনীতির গলাটিপে ধরা একটি অদৃশ্য হাতের মতো। 

গাজাতেও যুদ্ধবিরতির ভাষা আর যুদ্ধের বাস্তবতা এখনো পাশাপাশি হাঁটছে। মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে; যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় নতুন সমঝোতার চেষ্টা হলেও ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে মূল বিরোধ—কে আগে কী করবে—সেটিই অমীমাংসিত। শান্তির সবচেয়ে বড় শত্রু কখনো কখনো যুদ্ধ নয়, ‘আগে তুমি’ কথাটি।

আর জলবায়ু যেন যুদ্ধের খবরের পাশেই নিজের নীরব সংবাদটি লিখে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা ২০২৬ সালের বিকাশমান এল-নিনোকে অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা করছেন; বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত উষ্ণ সমুদ্র, তাপপ্রবাহ, বন্যা ও খরার ঝুঁকি বাড়ছে। পৃথিবী আমাদের বারবার চিঠি লিখছে—কখনো বন্যার পানিতে, কখনো আগুনে, কখনো অসহ্য গরমে। আমরা চিঠি পড়ি, সভা করি, সিদ্ধান্ত নিই; তারপর আবার আগের মতোই চলি। 

আজকের সব খবরকে পাশাপাশি রাখলে তাই অদ্ভুত এক ছবি তৈরি হয়। প্রশাসন খুঁজছে আস্থাভাজন কর্মকর্তা, ব্যাংক খুঁজছে টাকার জোগান, সরকার খুঁজছে রাজস্বের পথ, পৃথিবী খুঁজছে যুদ্ধের অবসান, জলবায়ু খুঁজছে তার হারানো ভারসাম্য। আর এর মধ্যে বন্যার পানিতে দাঁড়িয়ে তরুণেরা খুঁজছে মানুষের হাত। বড় রাষ্ট্রচিন্তার মাঝখানে এই ছোট দৃশ্যটিই হয়তো আজকের সবচেয়ে বড় সংবাদ।

কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের শক্তি কেবল সচিবালয়ের ফাইলে, ব্যাংকের হিসাবে কিংবা ক্ষমতার করিডরে থাকে না। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি থাকে নাগরিকের বিশ্বাসে। যে তরুণ অপরিচিত বন্যার্তের জন্য নিজের ঘর থেকে এক বস্তা চাল নিয়ে বেরিয়ে যায়, সে কোনো পদে নেই—তবু সে রাষ্ট্রের সবচেয়ে সুন্দর কর্মচারী। তার কোনো পরিচয়পত্র লাগে না, কোনো পদোন্নতি লাগে না, কোনো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও নয়।

সুতরাং আজকের প্রভাতের কথাটি খুব ছোট করে বলা যায়—ক্ষমতার জন্য আস্থাভাজন মানুষ খুঁজতে হয়; কিন্তু মানুষের আস্থা অর্জন করতে ক্ষমতার চেয়েও বেশি কিছু লাগে—ন্যায়, যোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহস। প্রশাসন যদি সেই ভাষা শেখে, অর্থনীতি যদি সেই শৃঙ্খলা শেখে, আর সমাজ যদি সেই মানবিকতা ধরে রাখে—তবে বাংলাদেশ এখনো তার সবচেয়ে সুন্দর সকালটির অপেক্ষায় থাকতে পারে।

সুপ্রভাত।