Dhaka Mail Logo

মতামত

শুধু গ্যাসের চাপ নয়, রাষ্ট্রেরও একটু ‘প্রেশার’ দরকার

১৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:০১ এএম

আজকাল বাংলাদেশের সকাল শুরু হয় শুধু পাখির ডাক কিংবা আজানের ধ্বনিতে নয়-অনেকের সকাল শুরু হয় গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়ে। ঢাকার সিএনজি স্টেশনে গাড়ির সারি, কারখানায় উৎপাদন বন্ধ, বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা-সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, দেশের অর্থনীতি যেন একখানা পুরোনো হারমোনিয়াম; ফুঁ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সুর বেরোচ্ছে না। বাঙালির জীবনে এখন ‘লাইন’ একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান-কখনো চালের জন্য, কখনো গ্যাসের জন্য, কখনো হাসপাতালের জন্য; শুধু রাষ্ট্রের অফিসে কাজ পাওয়ার লাইনে দাঁড়ালে কাজটি একটু কঠিন।

দেশজুড়ে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এখন আর কেবল জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ফাইলের বিষয় নয়, এটি সরাসরি অর্থনীতির উৎপাদনশীলতার প্রশ্ন। গ্যাসের স্বল্পচাপে শত শত কারখানা ও টেক্সটাইল মিল উৎপাদন কমিয়ে বা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে; শিল্পাঞ্চলের বাইরে রাজধানীর সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ লাইন। গত সপ্তাহের তীব্র সংকট কিছুটা কমলেও শিল্পকারখানা এখনো পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না, কারণ সীমিত সরবরাহের বড় অংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আগস্টে আসার কথা থাকা চারটি এলএনজি কার্গোর কোনোটি এখনো পৌঁছায়নি-ফলে সংকট দ্রুত কাটার নিশ্চয়তাও নেই।

এখানেই রাষ্ট্রের আসল পরীক্ষা। বিদ্যুৎকেন্দ্রকে গ্যাস দিলে শিল্পে ঘাটতি, শিল্পকে দিলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ঘাটতি-এটি কেবল সরবরাহের সমস্যা নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার প্রশ্ন। যে শিল্পে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করেন, যে কারখানা রপ্তানি আয় আনে, তার চাকা যদি গ্যাসের অভাবে থেমে যায়, তাহলে বিদ্যুতের বাতি জ্বললেও অর্থনীতির ঘরটি অন্ধকারই থাকে। জ্বালানি নিরাপত্তা তাই কেবল মেগাওয়াট বা বিলিয়ন ঘনফুটের হিসাব নয়; এর সঙ্গে কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং বাজারদরেরও হিসাব জড়িত।

এই অন্ধকারের মধ্যে আরেকটি খবর রাষ্ট্রের জবাবদিহির প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটরের দপ্তর সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির জন্য ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছে। প্রসিকিউশন বলছে, তিনি বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন। আইন যদি সত্যিই সবার জন্য সমান হয়, তবে পদমর্যাদা যত উঁচুই হোক, জবাবদিহির দরজা তার জন্যও খোলা থাকবে-এটাই রাষ্ট্রের স্বাভাবিক সৌন্দর্য। রাষ্ট্রের শক্তি প্রতিশোধে নয়, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগে।

রোহিঙ্গা প্রশ্নেও ঢাকা আজ বেশ শক্ত ভাষায় কথা বলেছে। প্রত্যাবাসনের সংখ্যা ও রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বক্তব্য বাংলাদেশ প্রত্যাখ্যান করেছে। মিয়ানমার ৩ লাখের কিছু বেশি মানুষকে যাচাইকৃত হিসেবে গ্রহণের কথা বললেও বাংলাদেশের জমা দেওয়া তালিকার একটি বড় অংশ নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। বাংলাদেশ যথার্থই মনে করিয়ে দিতে পারে-এই সংকটের জন্ম মিয়ানমারে, সমাধানের পথও সেখানেই। প্রায় এক দশক ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া কোনো দেশের জন্য অনন্তকালীন দায়িত্ব হতে পারে না। প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই; সংখ্যার খেলায় মানুষের পরিচয় হারিয়ে গেলে কূটনীতি তার মানবিক অর্থ হারায়।

দেশের স্বাস্থ্যচিত্রও আজ খুব স্বস্তির নয়। হামের লক্ষণ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে; একই সঙ্গে ডেঙ্গুর নতুন আক্রান্ত ও মৃত্যুও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। হামের বিস্তার আমাদের আবার সেই পুরোনো প্রশ্নের কাছে ফিরিয়ে দেয়-প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা কি যথেষ্ট শক্তিশালী? একটি শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করার পরে চিকিৎসা দেওয়া জরুরি, কিন্তু তার আগেই টিকা, নজরদারি ও প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা আরও বুদ্ধিমানের কাজ। রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যনীতি যদি শুধু হাসপাতালের বিছানা গোনে, তবে রোগীর সংখ্যা কমে না; বরং বিছানার সংখ্যা বাড়াতে হয়।

সরকারের ছয় মাস পূর্তিতে জনপ্রশাসন নিয়েও বিতর্ক কমেনি। পদায়ন বদলি, অবসর থেকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে মেধা, দক্ষতা ও পেশাদারত্বের পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা কোটারি স্বার্থ কাজ করছে—এমন অভিযোগ ও সমালোচনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী নিজেও বলেছেন, পছন্দের পোস্টিং বা পদোন্নতির জন্য পেশাদারিত্ব বিসর্জন দিলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কথাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকার বদলালেই যদি প্রশাসনের আনুগত্যের ঠিকানাও বদলে যায়, তবে রাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিষ্ঠান কোথায়? কর্মকর্তা কোনো দলের কর্মী নন; তিনি সরকারের কর্মচারী, কিন্তু তার প্রথম আনুগত্য সংবিধান, আইন ও জনগণের প্রতি। প্রশাসনের সংস্কারের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা এখানেই।

আজকের লেখা আমাদের উন্নয়নের আরেকটি অদ্ভুত রোগের কথা মনে করিয়ে দেয়-নতুন প্রকল্পের প্রতি আমাদের দুর্বলতা। নতুন সেতু, নতুন রাস্তা, নতুন কালভার্ট উদ্বোধন করতে আমাদের যে আনন্দ, পুরোনো ও অসম্পূর্ণ প্রকল্প শেষ করতে ততটা উৎসাহ দেখা যায় না। কোথাও সেতু তৈরি হয়ে আছে, কিন্তু সংযোগ সড়ক নেই; কোথাও রাস্তার কাজ শেষ হয়নি, কোথাও নির্মিত অবকাঠামো ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠেনি। উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি প্রকল্পের সংখ্যা নয়, মানুষের ব্যবহারের উপযোগিতা। সেতু যদি নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে থাকে আর রাস্তা যদি এপারে বসে থাকে, তবে দুজনের মধ্যে রাষ্ট্রের বাজেট ছাড়া আর কোনো সম্পর্ক থাকে না।

এবার আসা যাক সীমান্তের ওপারের কূটনীতিতে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানে ভারত সফরে নিতে দিল্লির ব্যাপক তৎপরতা ক্রমেই সন্দেহজনক তিক্ততায় পরিণত হচ্ছে। একদিকে দেশটির মুখপাত্র বলেছেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক চায়; ঢাকার হাইকমিশনার বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ‘সম্মানজনক ও স্মরণীয়’ অভ্যর্থনা দেয়া হবে। কিন্তু ঢাকা থেকে স্পষ্ট করে কিছু শর্ত ও প্রত্যাশার কথা সামনে রেখেছে, সেখানে পতিত স্বৈরাচারের প্রত্যর্পণসহ দ্বিপক্ষীয় আস্থার প্রশ্নগুলো নিষ্পত্তি না হলে সফরের পরিবেশ কতটা তৈরি হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

ভারতীয় সাবেক কূটনীতিকদের দিয়ে ঢাকার অবস্থানকে কঠোর বা ‘রূঢ়’ বলানো হচ্ছে, এমনকি সুযোগ হারিয়ে যাবে এমন সতর্কবাণী দিচ্ছেন; কিন্তু কূটনীতিতে বন্ধুত্বের অর্থ এই নয় যে এক পক্ষ প্রশ্ন করবে আর অন্য পক্ষ শুধু উত্তর দেবে। সম্পর্ক টেকসই হয় পারস্পরিক সম্মান, স্বার্থের ভারসাম্য ও বিশ্বাসের ওপর।

আর পৃথিবীর অন্য প্রান্তে হরমুজ প্রণালি যেন এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট বলেছেন, ইরানের সঙ্গে বর্তমানে কোনো আলোচনা চলছে না এবং কোনো বৈঠকও নির্ধারিত নেই। একই সঙ্গে তিনি এমন একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছেন যেখানে হরমুজকে আমেরিকার নতুন ভূখণ্ড হিসেবে দেখানো হয়েছে। ইরানও পিছু হটার লক্ষণ দেখাচ্ছে না; তারা বলছে, শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রণালির স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ থাকবে এবং অতর্কিত আক্রমণের হুমকি দিয়েছে। একজন মার্কিন সেনাকে হত্যা বা আটক করতে পারলে ইরানের সেনাপ্রধানের পক্ষ থেকে ৩০ হাজার ডলার পুরস্কারের ঘোষণার খবরও পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে।

এদিকে হরমুজ নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রভাব তেলের বাজারে সরাসরি পড়ছে-ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম তিন সপ্তাহের সর্বোচ্চ, ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯১ ডলারে উঠেছে। বাংলাদেশের জন্য এই খবর দূরের কোনো মরুভূমির গল্প নয়। যে গ্যাসের লাইনে আজ ঢাকার চালক দাঁড়িয়ে আছেন, হরমুজের সংকট তারও অর্থনীতিতে এসে ধাক্কা দিতে পারে।

বিশ্বরাজনীতির ক্ষেপণাস্ত্র অনেক দূরে ছোড়া হয়, কিন্তু তার মূল্য দিতে হয় প্রায়ই নিকটবর্তী বাজারে।

সুতরাং আজকের বাংলাদেশের গল্পটি শেষ পর্যন্ত গ্যাসের গল্প, আবার শুধু গ্যাসের গল্প নয়। এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতার গল্প। কারখানায় গ্যাস নেই, হাসপাতালে রোগী বাড়ছে, প্রশাসনে নিরপেক্ষতার প্রশ্ন উঠছে, সীমান্তে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান হচ্ছে না, পুরোনো প্রকল্প পড়ে আছে, আর দূর হরমুজে তেলের দাম বাড়ছে-সবগুলো সুতো এসে একই জায়গায় বাঁধা: রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত?

একটু দুষ্টুমি করে বলা যায়-বাংলাদেশের এখন শুধু গ্যাসের চাপ নয়, রাষ্ট্রেরও একটু ‘প্রেশার’ দরকার। সেই চাপ হবে জনগণের প্রত্যাশার, আইনের শাসনের, দক্ষ প্রশাসনের এবং বাস্তব ফল দেখানোর। নাম বদলালে প্রতিষ্ঠান বদলায় না, সাইনবোর্ড বদলালে রাস্তা হয় না, আর আশ্বাসে গ্যাসের চুলা জ্বলে না। রাষ্ট্রকে তাই কথার চেয়ে কাজে একটু বেশি গরম হতে হবে-তবে যেন সেই উত্তাপ মানুষের ঘর পোড়ায় না, চুলায় ভাত রাঁধে। আজকের দিনটি হোক সংকটকে অস্বীকার না করে তার মুখোমুখি দাঁড়ানোর দিন।

লেখক: সাবেক সচিব ও সিনিয়র ব্যুরোক্রেট বিশ্লেষক