Dhaka Mail Logo

মতামত

রাষ্ট্রের চাকা ঘুরুক, কিন্তু মানুষ যেন তার নিচে না পড়ে

১৮ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫০ এএম

ভোরের ঢাকা শহরটাকে আজকাল দেখলে মনে হয়, শহরটি একই সঙ্গে ঘুমোচ্ছে এবং ছুটছে। কেউ গ্যাসের খোঁজে, কেউ বাসের, কেউ ফুটপাতের একটু জায়গার সন্ধানে; কেউ আবার রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কোন স্টেশনে গিয়ে থামবে—তার হিসাব কষছেন। আমাদের এই বঙ্গদেশে রাষ্ট্রের হিসাব আর সংসারের হিসাবের মধ্যে খুব বেশি তফাত নেই—দুটিরই শেষ প্রশ্ন, ‘আজকের দিনটা কীভাবে কাটবে?’ তবে আশার কথা, মাঝে মাঝে রাষ্ট্র এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেয়, যাতে বোঝা যায় আগামীকালটা আজকের চেয়ে একটু বুদ্ধিমান হতে পারে।

রাষ্ট্রের বুদ্ধিমত্তার একটি লক্ষণ হলো সময়কে ঠিক জায়গায় বসানো। বাংলাদেশে অর্থবছর বর্তমানে ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন। কিন্তু জুলাই-আগস্টে যখন বর্ষা নামে, তখন আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পও যেন ছাতা হাতে রাস্তায় নামে। কাদা, জলাবদ্ধতা, বৃষ্টির কারণে কাজের গতি কমে; কাজ দীর্ঘায়িত হয়, গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, আর সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। তাই ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ অর্থবছর করার প্রস্তাবটি নিছক হিসাবের খাতা বদলানো নয়—এটি উন্নয়নকাজের সঙ্গে বাংলাদেশের ঋতুচক্রকে মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। বর্ষা আসার আগেই রাস্তা, সেতু, ড্রেন, ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামোর কাজ শেষ করার সুযোগ তৈরি হলে সরকারের অর্থবছর আর প্রকৃতির সঙ্গে কুস্তি না করে প্রকৃতির সঙ্গেই হাঁটতে পারবে। অর্থনীতিরও মাঝে মাঝে ছাতা দরকার—এই সিদ্ধান্তটি সেই ছাতারই এক ধরনের নকশা।

আইনের খাতাতেও একটি পরিবর্তনের হাওয়া। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) পরিবর্তে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’—এসআরবি—গঠনের খসড়া আইন মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে। নাম বদলালেই প্রতিষ্ঠান বদলায় না—এ কথা মনে রাখা জরুরি। একটি বিশেষায়িত বাহিনীর প্রকৃত পরিচয় তার নামের সংক্ষিপ্ত রূপে নয়, তার আইনি ভিত্তি, জবাবদিহি, প্রশিক্ষণ, পেশাদারিত্ব এবং নাগরিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধায়। রাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োজন, কিন্তু সেই শক্তির সবচেয়ে বড় অলংকার হওয়া উচিত আইনের সীমারেখা। বন্দুকের নল রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে না; নলের ওপর আইনের নিয়ন্ত্রণই রাষ্ট্রকে সভ্য করে।

ঢাকার ফুটপাতের গল্পটি আরও পুরোনো, এবং সম্ভবত ঢাকার জন্মের কাছাকাছি। হাঁটার জায়গা কোথায় শেষ আর হকারের দোকান কোথায় শুরু—এই প্রশ্নের উত্তর বহুদিন ধরেই ঢাকা শহর নিজেও জানে না। এবার স্থানীয় সরকার বিভাগ জারি করেছে ‘হকার ম্যানেজমেন্ট পলিসি ঢাকা সিটি ২০২৬’। এর আওতায় হকারদের নিবন্ধন এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার—ঢাকা হবে পরিচ্ছন্ন, যানজটমুক্ত এবং পথচারীবান্ধব। কিন্তু হকারও তো এই শহরেরই মানুষ; তার পেটের ভাতকে ফুটপাতের মতো উচ্ছেদ করে দিলে নগর ব্যবস্থাপনা মানবিক হয় না। অতএব নীতির সাফল্য হবে তখনই, যখন ফুটপাত পথচারীর থাকবে, শহরও পরিচ্ছন্ন থাকবে, আবার হকারের জীবিকাটিও সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকবে। ঢাকাকে মানুষমুক্ত নয়, বরং বিশৃঙ্খলামুক্ত করাই আসল কাজ।

গ্যাসের গল্পটি অবশ্য আরও সরল, কিন্তু তার অঙ্ক বেশ কঠিন। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলো বুড়ো হচ্ছে, চাহিদা বাড়ছে, আর এলএনজি আমদানির বিল বাড়ছে—এই তিনে মিলে জ্বালানি ব্যবস্থার কপালে চিন্তার ভাঁজ। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কর্মসূচি নিয়েছে; ইতোমধ্যে ২৯টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে এবং সেগুলো থেকে দৈনিক ২৭০.৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যোগ হয়েছে, যার ১৩৯.৬ মিলিয়ন ঘনফুট জাতীয় গ্রিডে যাচ্ছে। কিন্তু গত বছরই ১০৯টি এলএনজি কার্গোর পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩.৮৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ কূপ খোঁড়া ভালো, কিন্তু কূপের সঙ্গে যদি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি না থাকে, তবে গর্ত থেকে গ্যাস উঠবে আর বাজেটের গর্ত থেকে টাকা বেরোবে—দুটিই একসঙ্গে চলবে।

ঢাকার যানজটের চিরন্তন মহাকাব্যে নতুন একটি অধ্যায় যোগ হতে যাচ্ছে—নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর ৫০ কিলোমিটার রেলপথে বৈদ্যুতিক রেল প্রকল্প। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দৈনিক যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা ২ লাখ ৩২ হাজার থেকে বেড়ে ৮ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি হতে পারে; ট্রেনের সংখ্যা ৬৫ থেকে ২৩৫ এবং ব্যস্ত সময়ে বিরতি ১৫ মিনিটে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। ডিজেল কমবে, ধোঁয়া কমবে, অপেক্ষা কমবে—ঢাকাবাসীর কাছে এর চেয়ে সুন্দর কবিতা আর কী হতে পারে! তবে আমাদের উন্নয়ন-অভিজ্ঞতা বলে, প্রকল্পের ঘোষণা যতটা সহজ, সময়মতো শেষ করা ততটাই কঠিন। তাই এবার রেল যেন ফাইলের পাতায় নয়, যাত্রীর সময়ের মধ্যে এসে পৌঁছায়।

আর নারীদের জন্য ঢাকায় চালু হচ্ছে ‘পিংক বাস’—শুধু নারী চালক ও নারী কন্ডাক্টর পরিচালিত বিশেষ বাসসেবা। এটি নিছক গোলাপি রঙের বাস নয়; গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের একটি সামাজিক পরীক্ষা। তবে পরীক্ষার সাফল্য বাসের রঙে নয়, নিয়মিততা, নিরাপত্তা, রুটের যৌক্তিকতা এবং যাত্রীর আস্থায়। সরকারি প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বিপদ উদ্বোধনের দিন; কারণ সেদিন ফিতা কাটার লোক থাকে, কিন্তু ছয় মাস পরে যাত্রী থাকে কি না—সেটিই আসল পরীক্ষা।

এই খবরগুলো পাশাপাশি রাখলে আজকের বাংলাদেশের একটি বেশ চমৎকার প্রতিকৃতি পাওয়া যায়। যে জাতি স্বৈরাচার নামাতে মাস বাড়িয়ে ৩৬ জুলাই করতে পারে, তারা অর্থবছর বদলাচ্ছে প্রকৃতির সঙ্গে তাল মেলাতে, বিশেষায়িত বাহিনীর নতুন কাঠামো তৈরি হচ্ছে, ফুটপাতের হকারদের জন্য নিয়ম হচ্ছে, গ্যাসের নতুন কূপ খোঁড়া হচ্ছে, রেল বিদ্যুতে যাচ্ছে, নারীর জন্য আলাদা বাস নামছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র শুধু সচিবালয়ের ফাইলে বসে নেই; সে রাস্তা, ফুটপাত, গ্যাসের পাইপ, রেললাইন এবং বাসের দরজায়ও তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। এখন প্রশ্ন একটাই—এই উপস্থিতি নাগরিকের জীবনে স্বস্তি হয়ে পৌঁছাবে তো?

আজকের লেখাটি তাই ‘পরিকল্পনা’ নয়, ‘বাস্তবায়ন’ নিয়ে। আমাদের রাষ্ট্রে পরিকল্পনার অভাব কখনো ছিল না; বরং পরিকল্পনা এত বেশি যে মাঝে মাঝে মনে হয়, পরিকল্পনাগুলোর নিজেদের মধ্যে একটি সমন্বয় সভা করা দরকার। আসল সাফল্য হবে তখনই, যখন অর্থবছর বদলানোর সুফলে বর্ষার আগে রাস্তা শেষ হবে, নতুন বাহিনী আইনের অধীনে জবাবদিহির সঙ্গে কাজ করবে, হকার নীতিতে জীবিকা ও নগরশৃঙ্খলার সমন্বয় হবে, গ্যাসের কূপ আমদানিনির্ভরতা কমাবে এবং বৈদ্যুতিক রেল মানুষের যাতায়াতের সময় বাঁচাবে। রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই উন্নয়ন, যখন তার হিসাব কাগজে নয়—মানুষের জীবনে মেলে।

আন্তর্জাতিক দিগন্তে অবশ্য মেঘ ঘন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাময়িক শান্তি-সমঝোতার ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হলেও স্থায়ী সমাধানের কোনো লক্ষণ নেই। বরং হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা আরও বেড়েছে; ইরানের এক কর্মকর্তা বলেছেন, কূটনীতি ব্যর্থ হলে দেশটি সেখানে আরও আক্রমণাত্মক সামরিক অবস্থান নেবে। মার্কিনীরা নাকি পারমাণবিক হামলার কথা ভাবছে, জবাবে ইরানও বদলা নেয়ার হুমকি দিয়ে রেখেছে। এই জলপথ দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি পরিবাহিত হতো। ফলে হরমুজের উত্তাপ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে আটকে থাকে না—তার আঁচ বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি, পরিবহন ব্যয় এবং বাজারদরের ওপরও পড়ে।

পৃথিবীর এই অস্থির সকালে আমাদের নিজের ছোট্ট ভূগোলটির দিকে তাকালে কথাটি আবার মনে পড়ে—রাষ্ট্র মানে শেষ পর্যন্ত মানুষ। বড় শক্তির যুদ্ধ, ছোট দেশের গ্যাস, রাজধানীর ফুটপাত, সংসারের হিসাব, অফিসগামী মানুষের রেল—সবকিছুর কেন্দ্রে সেই মানুষটি, যে সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে সন্ধ্যায় নিরাপদে ফিরতে চায়। রাজনীতি যদি তার পথ সহজ করে, প্রশাসন যদি তার কাজ সহজ করে, অর্থনীতি যদি তার সংসারটাকে একটু স্বস্তি দেয়—তবেই রাষ্ট্রের অগ্রগতি কাগজ থেকে জীবনে নেমে আসে। আজকের প্রভাতের প্রার্থনা তাই খুব সাধারণ: রাষ্ট্রের চাকা ঘুরুক, কিন্তু মানুষ যেন তার নিচে না পড়ে।

লেখক: সাবেক সচিব ও সিনিয়র ব্যুরোক্রেট বিশ্লেষক