১৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৭ পিএম
একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। সেটিই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র তার কূটনৈতিক অগ্রাধিকার বদলায়, নতুন অংশীদার খোঁজে, পুরোনো সম্পর্ককে নতুন করে মূল্যায়ন করে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা দেখা যাচ্ছে। কেউ বলছেন, নতুন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে হবে। কেউ বলছেন, কৌশলগত স্বাধীনতা আরও বিস্তৃত করতে হবে। আবার কেউ কেউ ভারতের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমানোর কথাও বলছেন। এসব আলোচনা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যখন রাজনৈতিক আবেগ অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে আড়াল করতে শুরু করে, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে। রাষ্ট্রের অর্থনীতি কি স্লোগানে চলে, নাকি বাস্তবতার হিসাবেই তার পথ নির্ধারিত হয়?
বাংলাদেশের ভূগোল এমন যে, ভারতকে এড়িয়ে তার অর্থনীতি কল্পনা করা কঠিন। তিন দিক থেকে ভারতবেষ্টিত এই দেশের সঙ্গে কয়েক দশক ধরে গড়ে উঠেছে বিস্তৃত বাণিজ্যিক যোগাযোগ, পরিবহন ব্যবস্থা এবং শিল্পভিত্তিক সরবরাহ শৃঙ্খল। এসব সম্পর্ক কোনো রাজনৈতিক সদিচ্ছার দান নয়। এগুলো তৈরি হয়েছে ব্যবসার প্রয়োজন থেকে, উৎপাদনের যুক্তি থেকে, বাজারের চাহিদা থেকে। উদ্যোক্তারা এমন পথই বেছে নেন, যেখানে ব্যয় কম, সময় কম লাগে এবং উৎপাদন বেশি প্রতিযোগিতামূলক হয়। অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত আবেগের নয়, দক্ষতার ভাষাই বোঝে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এই শিল্পের কাঁচামাল পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আসে। সেই সরবরাহ ব্যবস্থায় ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তুলা, সুতা, বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক, রং, যন্ত্রপাতি, শিল্পকারখানার খুচরা যন্ত্রাংশ এবং প্যাকেজিং সামগ্রীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভারতীয় বাজার থেকে সংগ্রহ করা হয়। একই চিত্র ওষুধশিল্পেও দেখা যায়। অনেক কাঁচামাল ও উৎপাদন-উপকরণ আঞ্চলিক বাজারের মাধ্যমে আসে, যেখানে ভারতীয় উৎপাদকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি, প্লাস্টিক, সিরামিক, হালকা প্রকৌশল কিংবা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পও বিভিন্ন মাত্রায় সীমান্তপাড়ের সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।
আজকের পৃথিবীতে বাণিজ্যের অর্থ শুধু এক দেশ থেকে আরেক দেশে পণ্য কেনাবেচা নয়। একটি পণ্য বাজারে পৌঁছানোর আগে তার কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তি এবং পরিবহন-পরিষেবা অনেক দেশের ভেতর দিয়ে চলাচল করে। এটিই আধুনিক বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খল। এই শৃঙ্খলের একটি জায়গায় বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব পুরো উৎপাদন ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ে। উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, রপ্তানির সময় পিছিয়ে যায়, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা কমে। রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা তাই বিলাসিতা নয়, অপরিহার্য শর্ত।
সাম্প্রতিক সময়ে জনপরিসরে ভারতের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমানো কিংবা আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজানোর মতো মতামত শোনা গেছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ অবশ্যই তার আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে বহুমাত্রিক করবে। গত দুই দশকে দেশটি পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত করেছে। এই বৈচিত্র্য দেশের জন্য ইতিবাচক। কারণ একটি অর্থনীতি যত বেশি বিকল্প বাজার ও অংশীদার তৈরি করতে পারে, তত বেশি স্থিতিশীল হয়। কিন্তু বৈচিত্র্য সৃষ্টি আর বিদ্যমান সম্পর্ক দুর্বল করা এক জিনিস নয়। নতুন বন্ধুত্ব গড়ে তোলার জন্য পুরোনো কার্যকর সম্পর্ক ভেঙে ফেলার কোনো অর্থনৈতিক যুক্তি নেই।
অর্থনীতির একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য হলো, অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় শত্রু। উদ্যোক্তারা সিদ্ধান্ত নেন দীর্ঘমেয়াদি পূর্বানুমানের ভিত্তিতে। তারা জানতে চান, আগামী পাঁচ বা দশ বছর ব্যবসার পরিবেশ কতটা স্থিতিশীল থাকবে। যদি রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়, তবে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগ স্থগিত রাখে, বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজতে শুরু করে, কিংবা উৎপাদন পরিকল্পনা বদলে ফেলে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংক বহু গবেষণায় দেখিয়েছে, নীতিগত স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান শর্ত।
বাংলাদেশের জন্য এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে। এই উত্তরণের ফলে ধীরে ধীরে কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা কমে আসবে। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হলে উৎপাদন ব্যয় কমানো, সরবরাহব্যবস্থা আরও দক্ষ করা, অবকাঠামো উন্নত করা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ জোরদার করার বিকল্প থাকবে না। এমন সময়ে যদি অপ্রয়োজনীয় কারণে বিদ্যমান সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়, তবে তার ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হবে দেশের নিজের শিল্পখাতের।
এর প্রভাব শুধু বড় শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে পরিবহন, গুদামজাতকরণ, শুল্কসেবা, পণ্য পরিবহন, খুচরা ব্যবসা এবং কৃষিপণ্যের বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে হাজারো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার জীবিকা গড়ে উঠেছে। সীমান্তপাড়ের বৈধ বাণিজ্যে সামান্য অস্থিরতাও তাদের আয়ে সরাসরি প্রভাব ফেলে। রাজনৈতিক বিতর্কের ঢেউ রাজধানীতে যতটা অনুভূত হয়, তার চেয়ে বেশি ধাক্কা লাগে সীমান্তের জনপদে।
দক্ষিণ এশিয়া এখনো বিশ্বের সবচেয়ে কম অর্থনৈতিকভাবে সংযুক্ত অঞ্চলগুলোর একটি। অথচ বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণা দেখিয়েছে, আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা কমানো গেলে এই অঞ্চলের দেশগুলো উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। এমন এক সময়ে বিশ্বব্যাপী সরবরাহব্যবস্থা ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সুরক্ষাবাদী নীতির কারণে নতুন করে বিন্যস্ত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা দুর্বলতার নয়, বরং কৌশলগত সক্ষমতার পরিচয়।
এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্কের কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আলোচনার জায়গা হতে হবে নীতিনির্ধারণ ও কূটনীতির টেবিল। রাজনৈতিক আবেগের উত্তাপ দিয়ে অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হয় না। বরং অনেক সময় নতুন সমস্যার জন্ম দেয়।
আধুনিক বিশ্বে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ অনেক সময় আকর্ষণীয় শোনায়। মনে হয়, বাইরের ওপর নির্ভরতা কমালেই রাষ্ট্র আরও স্বাধীন হবে। বাস্তবতা ভিন্ন। আজকের বিশ্বে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, অর্থায়ন, উৎপাদন এবং সরবরাহব্যবস্থা এত গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত যে, মাঝারি আকারের কোনো অর্থনীতির পক্ষে একা চলার কল্পনা বাস্তবসম্মত নয়। প্রকৃত কৌশলগত স্বাধীনতা আসে সম্পর্ক ছিন্ন করার মাধ্যমে নয়। আসে বহু দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার গল্প মূলত উন্মুক্ততার গল্প। রপ্তানি বৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগ, বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ এবং উৎপাদনশীলতার ধারাবাহিক উন্নতি এই অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি করেছে। সেই পথ থেকে সরে এসে আবেগকে অর্থনীতির চালিকাশক্তি বানানো হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে বাংলাদেশেরই।
রাজনীতি বদলাবে। সরকার বদলাবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অগ্রাধিকারও সময়ের সঙ্গে পাল্টাবে। কিন্তু ভূগোল বদলাবে না। বাংলাদেশ ও ভারত প্রতিবেশী ছিল, আছে এবং থাকবে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে কোনো অর্থনৈতিক কৌশল দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব জাতীয় স্বার্থকে আবেগের ঊর্ধ্বে রাখা। কারণ স্থিতিশীল বাণিজ্য, নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতামূলক শিল্প এবং কর্মসংস্থানের বিস্তার কোনো দেশের সার্বভৌমত্বকে খর্ব করে না। বরং এগুলোই একটি রাষ্ট্রকে আরও আত্মবিশ্বাসী, আরও সক্ষম এবং আরও স্বাধীন করে তোলে।
লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক শিক্ষক, সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়