Dhaka Mail Logo

মতামত

যুগে যুগে ১৫ আগস্ট

ঢাকা মেইল ডেস্ক

১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০২ পিএম

১৫ আগস্ট- বাংলার ইতিহাসে এমন এক তারিখ, যার পাতায় জন্ম, মৃত্যু, স্বাধীনতা, রাজনীতি, সাহিত্য এবং ব্যক্তিগত স্মৃতি- সবকিছু এসে অদ্ভুতভাবে পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে। একই দিনে কেউ জন্মেছেন, কেউ ইতিহাসের নির্মম অধ্যায় হয়ে গেছেন, কোনো জাতি পেয়েছে স্বাধীনতার নতুন সকাল, আবার কোনো পরিবার পেয়েছে আপনজনের জন্মদিনের আনন্দ। তাই ১৫ আগস্টকে শুধু একটি তারিখ দিয়ে বোঝা কঠিন; এটি যেন ইতিহাসের একটি দীর্ঘ আয়না।

১৯৪৫: একজন দেশনেত্রীর জন্ম

১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অন্যতম প্রধান নেত্রী, চারবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া। একজন গৃহবধূ থেকে ১৯৮৪ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে এসে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। 

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। রাষ্ট্রপতি-শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে আসার পর আবার প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তৃতীয়বার এবং ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত স্টাফ হিসেবে জীবনের ১৬টি বছর কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। রাজনীতির মঞ্চে যাঁকে আমরা দেখি, তাঁর বাইরেও কাছ থেকে দেখেছি একজন মানুষকে— যাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় পরিচয় ছিল প্রতিকূলতার সামনে নতি স্বীকার না করা।

২০১১ সালের ২৩ মে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় নিউ জার্সি সিনেট খালেদা জিয়াকে গণতন্ত্র, বিশ্বশান্তি, মানবাধিকার, সন্ত্রাস দমন, নারী শিক্ষা ও নারীর সক্ষমতা উন্নয়নে অবদানের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে একটি রেজ্যুলেশন পাস করে সম্মান জানায়। কয়েকজনসহ আমার সর্বোচ্চ প্রয়াসের ফল হিসাবে ঐ অনুষ্ঠানটি সংঘটন সম্ভব হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় একজন বাংলাদেশি নেতাকে সম্মান জানিয়ে এমন প্রস্তাব গ্রহণের ঘটনা তখন বিশেষভাবে আলোচিত হয়। রিজলিউশনে বলা হয়-

‘যেহেতু, খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন, যে ভূমিকায় তিনি শিল্পখাতের বেসরকারীকরণ ও বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে এবং নারীদের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলেন; এবং,

যেহেতু, এছাড়াও, খালেদা জিয়া শিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে বাধ্যতামূলক বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, দশম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা এবং ছাত্রীদের জন্য উপবৃত্তি; এবং,

যেহেতু, ১৯৯৬ সালে বিপুল ভোটে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও দেশের অস্বাভাবিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে খালেদা জিয়া অল্প কিছুদিন পরেই পদত্যাগ করেন এবং ২০০১ সালে পুনরায় পদটি গ্রহণ করেন। কিন্তু ২০০৬ সালে একটি সেনাবাহিনী-সমর্থিত সরকার ক্ষমতায় এসে তাঁর গ্রেফতারের ব্যবস্থা করলে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়; এবং,

যেহেতু, আপাতদৃষ্টিতে দুর্লঙ্ঘ্য প্রতিকূলতা সত্ত্বেও খালেদা জিয়া ন্যায়বিচার, শান্তি এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া প্রসারের মতো প্রশংসনীয় লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি তাঁর অবিচল নিষ্ঠার কারণে এবং গণতন্ত্র, নারী শিক্ষা ও অধিকার এবং বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাঁর অক্লান্ত সেবার জন্য অবিচল থেকেছেন; এবং,

যেহেতু, শান্তির সংস্কৃতি হলো এমন একটি পরিবেশ যেখানে মানবাধিকার ও মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, নারী-পুরুষের সমতা, ধর্ম ও বিবেকের স্বাধীনতা, সহনশীলতা, সুশাসন, শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং পরস্পরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংবেদনশীলতা সম্পর্কে গভীরতর জ্ঞান ও শ্রদ্ধাবোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ নীতিসমূহকে সমর্থন ও সম্মান করা হয়; এবং,

যেহেতু, খালেদা জিয়া নেতৃত্ব ও সেবার ক্ষেত্রে এমন এক উৎকৃষ্টতার মান স্থাপন করেছেন যা অর্জনের জন্য অন্যরা সচেষ্ট হতে পারে এবং তিনি নিউ জার্সি সিনেটের সদস্যদের উচ্চ সম্মান অর্জন করেছেন; অতএব, এখন, নিউ জার্সি রাজ্যের সিনেট কর্তৃক এই মর্মে প্রস্তাব গৃহীত হলো:

এই সংসদ এতদ্বারা খালেদা জিয়াকে সম্মান ও অভিবাদন জানাচ্ছে, বাংলাদেশের শিশু ও জনগণের প্রতি তাঁর নিবেদিত সেবার অসামান্য কীর্তির প্রশংসা করছে এবং তাঁর সকল ভবিষ্যৎ প্রচেষ্টায় অব্যাহত সাফল্যের জন্য শুভকামনা জানাচ্ছে।’

এরপর আসে দীর্ঘ প্রতিকূলতার অধ্যায়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে একপেশে নির্বাচন বয়কট করেন, ঐ সময় তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ২০১৮ সালের  মিডনাইট নির্বাচনের আগে তাঁকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে রাজবন্দি করা হয়। এরপরে  তিনি অসুস্থতাজনিত কারণে প্যারোলে থাকলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে স্বৈরাচার হাসিনার পতন হওয়া পর্যন্ত তিনি রাজবন্দিই থাকেন। 

বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফেরানোর আন্দোলনে খালেদা জিয়ার নিরলস সংগ্রাম, আপসহীনতা, কারাবরণ, ও ত্যাগ তিতিক্ষার কারণে তিনি সর্বসাধারণের কাছে বাংলাদেশের ‘গণতন্ত্রের মা’তে পরিণত হয়েছেন। বাংলাদেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় দল বিএনপির চার দশকের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াই একমাত্র রাজনৈতিক নেত্রী, যিনি কখনো কোনো নির্বাচনে হারেননি। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার সর্বমোট ২৩টি আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে সবগুলোতেই বিজয়ী হয়ে বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। 

পরবর্তীতে ১৬ বছরব্যাপী দেশের রাজনৈতিক দুর্দশা থেকে উত্তরণ ঘটাতে খালেদা জিয়া আমৃত‍্যু সংগ্রাম করে অবশেষে সফল হয়েছেন। কারাগারে তাঁর ওপর বিষপ্রয়োগ করার অভিযোগ রয়েছে, তাছাড়া যথাসময়ে সঠিক চিকিৎসা পাননি। ফলে শরীর দ্রুত ভেঙে পড়ে। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকালের মধ‍্য দিয়ে শেষ হয় একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অধ্যায়। পরদিন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত দেশের সর্ববৃহৎ জানাজায় সারাদেশের কোটি মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, একজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কখনো কখনো দলীয় পরিচয়ের সীমা ছাড়িয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।

আজ দেশনেত্রী জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধায়। দয়াময় আল্লাহ তাঁর রুহের মাগফেরাত করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।🤲🏼

১৯৭৫: আরেক ১৫ আগস্ট

বাংলাদেশের দ্বিতীয় মুক্তির দিবস আজ। ১৯৭৫ সালের এই রাতে সশস্ত্র সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রক্ষা পায় একদলীয় শাসন ও এক ব্যক্তির স্বৈরশাসন বাকশাল থেকে। প্রথমে সেনাবাহিনীর একটি অংশের সফল অভ্যুত্থানের পরে পুরো সেনাবাহিনী এর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে। ঐ সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হন তৎকালীন বাকশাল সিস্টেমের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য। 

অভ্যুত্থানের পরে ভূতপূর্ব মুজিব সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী খোন্দকার মুশতাক আহমদের নেতৃত্বে আগেকার ক্যাবিনেটের ১৬ জন সদস্য নিয়ে নতুন সরকার গঠন করা হয়। নতুন কেবিনেটে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেন ভূতপুর্ব রাষ্ট্রপতি মুহম্মদউল্লাহ, যাকে ৭ মাস আগে অসম্মানকভাবে হটিয়ে শেখ মুজিব রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেছিলেন সাংবিধানিক ক্যু-এর মাধ্যমে! ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরবসহ বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলি নতুন সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান করে অভিনন্দন জানায়। সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী, ফ্রন্টিয়ার্স, পুলিশ বাহিনীসহ সকলে নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্য পোষণ করে। আজ দীর্ঘ সময় পরে অনেকে বিভিন্নভাবে ব্যাখা করতে চাইলেও ঘটনার পর যে সব গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য জাতি শুনতে পায়:

# আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা ও সংসদের স্পিকার আবদুল মালেক উকিল ‘ফেরাউনের পতন হয়েছে...দেশ একজন স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্ত হয়েছে’ – বলে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

# আওয়ামী লীগের প্রাক্তন দুই সভাপতি মওলানা ভাসানী ও আবদুর রশীদ তর্কবাগিশ দুজনকেই শেখ মুজিব পিতৃবৎ সম্মান করতেন। তাঁরা দুজনই মোশতাকের সাফল্যের জন্য দোয়া করেছিলেন এবং মুজিব হত্যাকে সমর্থন দিয়েছিলেন। মাওলানা ভাসানী বলেন, ‘এটা ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। আল্লাহ সহায় হোন’, অন্যদিকে মাওলানা তর্কবাগীশ বলেন, ‘দেশে আইনের শাসন, শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠা করতে খোন্দকার মুশতাককে আল্লাহ সহায় হউন।’ 

# শেখ মুজিবের সময়কার (১৯৭২-৭৩) রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী মন্তব্য করেন, ‘রাষ্ট্রপতি মুশতাক আহমদ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তিনি দেশে গণতন্ত্র ফেরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন।’

# বর্তমান যুগে শেখ হাসিনার আমলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জন প্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম অবশ্য কয়েক বছর আগে স্বীকার করে নেন, ‘১৫ আগস্টের পরিবেশ আওয়ামী লীগ নিজেরাই সৃষ্টি করেছিল!’

# শেখ মুজিবের পরম বন্ধু মানিক মিয়ার পুত্র আনোয়ার হেসেন মঞ্জু ‘ঐতিহাসিক নবযাত্রা’ শিরোনামে দৈনিক ইত্তেফাকে সম্পাদকীয় লিখেন ১৬ আগস্ট। এতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জীবনে এই পরিবর্তনের এক বিষাদময় গুরুত্ব রহিয়াছে। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত ও অসংখ্য মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা একদিন যে স্বাধীনতা অর্জন করিয়াছিলাম, সেখানে আমাদের আশা ও স্বপ্ন ছিল অপরিমেয়। কিন্তু গত সাড়ে তিন বছরেরও ঊর্ধ্বকালে দেশবাসী বাস্তবক্ষেত্রে যাহা লাভ করিয়াছে তাহাকে এক কথায় গভীর হতাশা ও বঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। গণমানুষের ভাগ্য উন্নয়নের পরিবর্তে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির আশ্রয় গ্রহণ করিয়া এবং একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাখিবার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষায় মাতিয়া উঠিয়া স্বাধীনতার সুফল হইতে জনগণকে নির্মমভাবে বঞ্চিত করা হইয়াছে।’ সম্পাদকীয়তে এসব প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সামরিক হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে ওঠার কথা উল্লেখ করা হয়। 

# শেখ হাসিনার মহাজোটের শরিক ও তার ক্যাবিনেটের সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন তখন ইউনাইটেড পিপলস পার্টির (ইউপিপি) যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হিসাবে পার্টির তৃতীয় প্রধান নেতা ছিলেন। এক বিবৃতিতে ইউপিপি বলেছিল—‘সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে গত সাড়ে তিন বছরের ঘৃণ্য ও গণধিকৃত মুজিবী রাজত্বের অবসান হয়েছে। লুট-দুর্নীতি, দুর্ভিক্ষ-অনাহার, চোরাচালান-পারমিটবাজি, স্বৈরাচার-পারিবারিক রাজত্ব কায়েম, জাতীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা ও অবমাননায় বিক্ষুব্ধ জনগণ প্রতি মুহূর্তে মুজিবের পতন কামনা করেছে। পরম ধৈর্য ও সাহসিকতা নিয়ে সংগঠিত হয়েছে মুজিবী শাসন ব্যবস্থাকে চিরতরে কবর দেওয়ার জন্য। মুজিবের অপসারণে জনগণ উল্লসিত। তার মৃত্যু কারও মনে সামান্যতম সমবেদনা বা দুঃখ জাগায়নি, জাগাতে পারে না। 

এদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের ইতিহাস জাতীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের লড়াইয়ের ইতিহাস। শেখ মুজিব ও তার সহচররা জনগণের সেই লড়াইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। গণতন্ত্রকে হত্যা করে কায়েম করেছে স্বৈরাচার ও পারিবারিক শাসন। মুজিব তার সিংহাসন থেকে হুকুম করেছে নির্বিচারে জনগণ ও গণতান্ত্রিক কর্মীদের হত্যা, গ্রেফতার, এমনকি সপরিবারে ধ্বংস করার জন্য। জেলে আটক হাজার হাজার রাজবন্দি, বিভিন্ন অঞ্চলে আবিষ্কৃত গণকবর এর প্রমাণ। (সূত্র: শাহ আহমদ রেজার যৌথ গ্রন্থ ‘২১ দফা থেকে ৫ দফা’, ১৯৮৭; পৃষ্ঠা ২৫৯-৬২) 

# আওয়ামী মহাজোটের নেতা হিসেবে একটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও হাসিনার ক্যাবিনটের সাবেক তথ্যমন্ত্রী বিশিষ্ট চাপাবাজ ‘কমরেড’ ইনু সম্পর্কে পিলে কাঁপানো কিছু তথ্য প্রকাশ করেছিল দৈনিক আমাদের সময়। ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর প্রকাশিত এক রিপোর্টে দৈনিকটি জানিয়েছিল—‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর হাসানুল হক ইনু শাহবাগস্থ বেতার ভবনে গিয়ে অভ্যুত্থানের নায়কদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রতি সর্বান্তকরণে সমর্থন জানিয়েছিলেন। তিনি একা যাননি, গিয়েছিলেন তার গুরু লে. কর্নেল (অব.) আবু তাহেরের সঙ্গে। তাহের তখন জাসদের গণবাহিনীর অধিনায়ক, আর ইনু ছিলেন গণবাহিনীর পলিটিক্যাল কমিশনার।’ জাসদের গণবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রচারিত লিফলেটে বলা হয়েছিল, ‘খুনি মুজিব খুন হয়েছে— অত্যাচারীর পতন অনিবার্য।’

# জাসদের প্রধান নেতা লে. কর্নেল তাহের বলেছিলেন, ‘ওরা বড় রকমের একটা ভুল করেছে। শেখ মুজিবকে কবর দিতে অ্যালাও করা ঠিক হয়নি। এখন তো সেখানে মাজার হবে। উচিত ছিল লাশটা বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়া।’

তবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত অন্য জায়গায়। একটি রাষ্ট্র যখন প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে ব্যক্তি ও দলের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে, তখন রাজনৈতিক সংকট একসময় রাষ্ট্রীয় সংকটে পরিণত হয়। আর সেই সংকটের সমাধান যদি গণতান্ত্রিক পথে না হয়, ইতিহাস প্রায়ই তার মূল্য নেয় রক্ত দিয়ে।

১৯২৬: সুকান্তের জন্ম

১৫ আগস্ট ১৯২৬ সালে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার উনশিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বিপ্লবী চেতনার কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। স্বল্পায়ু এই কবি বাংলা সাহিত্যে রেখে গেছেন দীর্ঘস্থায়ী ছাপ। ছাড়পত্র, পূর্বাভাস, মিঠেকড়া, অভিযান, ঘুম নেই, হরতাল— তাঁর রচনার মধ্য দিয়ে ক্ষুধা, শোষণ, সংগ্রাম ও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এক অনন্য কাব্যভাষা পেয়েছে।

সুকান্ত আমাদের মনে করিয়ে দেন— কবিতা শুধু ফুল, চাঁদ আর নদীর গল্প নয়; কখনো কখনো ক্ষুধার্ত মানুষের মুখও কবিতার সবচেয়ে বড় উপমা।

১৯২২: সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জন্ম

১৯২২ সালের ১৫ আগস্ট চট্টগ্রামের ষোলশহরে জন্মগ্রহণ করেন আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান শিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। লালসালু, চাঁদের অমাবস্যা, কাঁদো নদী কাঁদো, নয়নচারা, দুই তীর, একটি তুলসী গাছের আত্মকাহিনী, বহিপীর— তাঁর সাহিত্য বাংলা কথাসাহিত্যকে নতুন মনস্তাত্ত্বিক ও আধুনিক বোধ দিয়েছে।

একই দিনে জন্মেছিলেন সুকান্ত ও ওয়ালীউল্লাহ— একজন কবিতায় মানুষের ক্ষুধা ও সংগ্রামের ভাষা খুঁজেছেন, অন্যজন মানুষের মন, সমাজ ও বিশ্বাসের অন্ধকার অলিগলি আবিষ্কার করেছেন। ১৫ আগস্ট তাই বাংলা সাহিত্যের জন্যও একটি স্মরণীয় দিন।

১৯৪৭: উপমহাদেশের নতুন মানচিত্র

১৯৪৭ সালের আগস্টে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীনতার নতুন অধ্যায় শুরু হয়। প্রথমে ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং পরে ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতা এসেছিল, কিন্তু সঙ্গে এসেছিল বিভাজনের যন্ত্রণা, উদ্বাস্তু স্রোত, সাম্প্রদায়িক রক্তপাত এবং একটি নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। ইতিহাস কখনো কখনো একই হাতে স্বাধীনতার পতাকা এবং বিভেদের ক্ষত— দুটিই তুলে দেয়।

আর শেষে— আমার ঘরের ১৫ আগস্ট

ইতিহাসের এতসব বড় বড় ঘটনার মাঝেও ১৫ আগস্ট আমার কাছে সবচেয়ে আপন হয়ে ওঠে একটি ব্যক্তিগত কারণে। আজ আমার স্ত্রীরও জন্মদিন।

রাষ্ট্রের ইতিহাসে ১৫ আগস্ট যতই ভারী হোক, ঘরের ইতিহাসে আজকের দিনটি আমার কাছে ভালোবাসার। তাই ইতিহাসের সব উত্তাল অধ্যায় পেরিয়ে আজকের শেষে আমার একান্ত প্রার্থনা—
শুভ জন্মদিন, প্রিয়তমা। তোমার জীবন হোক শান্ত, সুন্দর ও আনন্দময়। ইতিহাস তার হিসাব নিয়ে থাক; আমাদের ঘরের ছোট্ট ইতিহাসটি যেন ভালোবাসায় লেখা থাকে।

লেখক: সাবেক সচিব ও সিনিয়র ব্যুরোক্রেট বিশ্লেষক