Dhaka Mail Logo

মতামত

১৪ আগস্ট ১৯৮২: ফিরে দেখা জীবনের এক অবিস্মরণীয় দিন

ঢাকা মেইল ডেস্ক

১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫২ পিএম

আজ ১৪ আগস্ট ২০২৬। ক্যালেন্ডারের পাতায় চোখ রাখতেই মনে হলো, আমি যেন ফিরে গেছি ঠিক ৪৪ বছর আগের সেই দিনে—১৪ আগস্ট ১৯৮২। এই দিনেই আমি ১০ম বিএমএ লং কোর্সের একজন অফিসার ক্যাডেট হিসেবে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দিয়েছিলাম।

জীবনের কিছু দিন কেবল একটি তারিখ হয়ে থাকে। আবার কিছু দিন জীবনের গতিপথই বদলে দেয়। ১৪ আগস্ট ১৯৮২ আমার জীবনে তেমনই একটি দিন। চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই দিনের প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি শব্দ, এমনকি কিছু গন্ধও আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন। আর আজকের দিনটি যেন সেই পুরোনো স্মৃতির দরজাটা আবার খুলে দিয়েছে।

সেনাবাহিনীতে আসার গল্পটা ছিল অন্যরকম

প্রথম থেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশনড অফিসার হওয়ার কোনো পরিকল্পনা আমার ছিল না। ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর আমি বাইরে লেখাপড়া করছিলাম। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তখন অন্যরকম পরিকল্পনা ছিল।

হঠাৎ আমাদের পরিবারে নেমে এলো এক কঠিন বাস্তবতা—আমার আব্বার ক্যান্সার ধরা পড়ল। তাও আবার ফোর্থ স্টেজ।

পরিস্থিতি এক মুহূর্তে বদলে গেল। উপায়ান্তর না দেখে আমি ১০ম বিএমএ লং কোর্সে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেওয়ার জন্য আবেদন করলাম। ভাগ্যের কী অদ্ভুত পরিহাস—প্রথমবারের আবেদনেই আমি নির্বাচিত হয়ে গেলাম।

আজ এত বছর পর পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, জীবনের কিছু সিদ্ধান্ত আমরা নিজেরা নিই না; পরিস্থিতি আমাদের দিয়ে সেই সিদ্ধান্ত করিয়ে নেয়। আমার সেনাবাহিনীতে আসাটাও ছিল অনেকটা তেমনই।

কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার জীবনের সবচেয়ে আবেগময় একটি স্মৃতি।

বিএমএতে যোগ দেওয়ার মাত্র তিন মাস পরেই আমার আব্বা ক্যান্সারে মারা যান।

আজও সেই শূন্যতা অনুভব করি। কিন্তু সেই কষ্টের মধ্যেও আমার মনে একটি গভীর শান্তি আছে। আব্বা পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার আগে অন্তত দেখে যেতে পেরেছিলেন—তাঁর মেজো ছেলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশনড অফিসার হওয়ার জন্য বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এটাই আমার বড় শান্তি। এটাই আমার বড় আশ্বস্ততা।

খুলনা থেকে ঢাকা, তারপর চট্টগ্রাম

১৪ আগস্ট ১৯৮২-এর দিনটি ছিল অন্য দিনের মতোই একটি রৌদ্রোজ্জ্বল দিন।

প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে খুলনা থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলাম। ঢাকায় এসে উঠলাম আমার মামার বাসায়। সারাদিন কিছুটা ঘোরাফেরা করলাম।

পরদিন, অর্থাৎ ১৩ আগস্ট রাত সাড়ে দশটার দিকে, চট্টগ্রাম মেইলে করে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দিলাম।

রেলস্টেশনে আমাকে বিদায় দিতে এসেছিলেন আমার মামা ও মামী। মামা আজ আর বেঁচে নেই। তাই এই দিনটিতে তাঁকে আরও বেশি মনে পড়ে।

মামা আমাকে খুব স্নেহ করতেন, অনেক ভালোবাসতেন। মামীও আমাকে খুব ভালোবাসতেন, স্নেহ করতেন। জীবনের এই পর্যায়ে এসে বুঝতে পারি—এমন নিঃস্বার্থ, অকৃত্রিম ভালোবাসা পাওয়া সত্যিই বড় বিরল।

১৪ আগস্ট সকালে আমরা চট্টগ্রামে পৌঁছালাম।

ট্রেনে দেখলাম আমার মতো আরও অনেক তরুণকে। সবার সঙ্গে পরিচয় ছিল না, কিন্তু সবার গন্তব্য একই—বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি।

আমার দুই স্কুলমেট নকিব ও সোলায়মান অবশ্য আমার আগে, ৮ম বিএমএ লং কোর্সে যোগ দিয়েছিল। আর আমি যোগ দিচ্ছিলাম ১০ম বিএমএ লং কোর্সে।

চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে নেমে আমরা পাশের একটি হোটেলে একটি রুম নিলাম। কিছুক্ষণ আশেপাশে ঘোরাফেরা করে ঠিক দুপুর দুইটার আগেই আবার রেলস্টেশনে ফিরে এলাম। কারণ, বিএমএ থেকে আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য বাস আসার কথা ছিল।

অবশেষে সেই মুহূর্ত এলো।

বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির মনোগ্রাম খচিত সেনাবাহিনীর বাস এসে দাঁড়াল। পরিপাটি পোশাকে সুদর্শন কিছু স্টাফ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।

আমরা সবাই বাসে উঠে বসলাম।

মনের ভেতর তখন কী অনুভূতি হচ্ছিল, আজও ঠিক ভাষায় প্রকাশ করতে পারি না। অজানা ভবিষ্যৎ, নতুন জীবনের উত্তেজনা আর বাড়ি ছেড়ে আসার কষ্ট—সবকিছু মিলিয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতি।

পাহাড়ের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা পেরিয়ে বিকেল প্রায় পাঁচটার দিকে আমরা বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির গেটে পৌঁছালাম।

তখনও বুঝিনি, সামনে আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অথচ স্মরণীয় কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করছে।

‘লাগেজ মাথায় নিয়ে দৌড় শুরু করো!’

বাস থেকে নামতে বলা হলো।

কিছুক্ষণ পর নির্দেশ এলো— ‘লাগেজ মাথায় নিয়ে দৌড় শুরু করো!’

আমি হতভম্ব!

আমরা তো অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগ দিতে এসেছি। অথচ নিজের লাগেজ নিজেকেই মাথায় নিয়ে দৌড়াতে হবে!

চারপাশে তখন শুধু শাউটিং—

‘আসসালামু আলাইকুম স্যার বলো!’

আমি তখন কালো স্যুট, সাদা শার্ট, টাই ও কালো জুতা পরে আছি। মাথায় স্যুটকেস নিয়ে মেইন গেট থেকে প্রশাসনিক ভবনের দিকে দৌড়াতে শুরু করলাম।

সেই কালো স্যুটটি আব্বা অনেক কষ্ট করে, অনেক টাকা খরচ করে আমাকে বানিয়ে দিয়েছিলেন।

কে জানত, সেই স্যুট পরেই জীবনের প্রথম সামরিক দৌড় দিতে হবে!

প্রশাসনিক ভবনে গিয়ে দেখলাম সবাই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর আমার ডাক এলো। ভেতরে ঢুকলাম। তিনজন অফিসার পরিপাটি পোশাকে বসে আছেন।

আমার পরিচয় ও প্রয়োজনীয় তথ্য নেওয়ার পর আমাকে স্টাফের কাছে হস্তান্তর করা হলো। স্টাফ আমাকে বাইরে নিয়ে এসে সিনিয়র ক্যাডেটদের হাতে তুলে দিলেন।

তারপর শুরু হলো আমার আসল বিএমএ জীবন।

Gentleman Cadet Reception

প্রথমে লাগেজ নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে আমাদের থাকার জায়গায় যেতে হলো। লাগেজ রেখে আবার নিচে নামতে হলো।

তারপর দৌড়, পানিশমেন্ট, দিগবাজি—একটার পর একটা।

এরপর নিয়ে যাওয়া হলো বারবারশপে।

আমি কিছুই বুঝে ওঠার আগেই মাথার চুল উধাও!

আমার তখন বেশ ঝাঁকড়া চুল ছিল। আয়নার সামনে নিজেকে দেখে মনে হলো—এ কি আমি!

কিন্তু তখন কিছু বলার বা প্রতিবাদ করার কোনো সুযোগ নেই।

শুরু হলো GC—Gentleman Cadet Reception।

দৌড়াদৌড়ি, পানিশমেন্ট, দিগবাজি—সবকিছুর পর এলো সেই অধ্যায়, যেটা আজও আমার স্মৃতিতে সবচেয়ে জীবন্ত।

মিলিটারি একাডেমির ড্রেন দিয়ে ময়লা পানি প্রবাহিত হতো। সেই ড্রেনকে বলা হতো “আবে জমজম”।

আমাকে নির্দেশ দেওয়া হলো—

“Get down into the Abe Zamzam!”

আমি তখনও কালো স্যুট, সাদা শার্ট, টাই ও কালো জুতা পরে আছি। আব্বা অনেক কষ্ট করে যে স্যুটটি বানিয়ে দিয়েছিলেন, সেটিই তখন আমার গায়ে।

আমি একটু ইতস্তত করতেই উপর থেকে বজ্রকণ্ঠে নির্দেশ এলো—

“Bloody chap! I told you to get down!”

আর কোনো বিলম্ব করার সুযোগ নেই।

Shafiq2

নেমে গেলাম আবে জমজমে।

দুর্গন্ধযুক্ত পচা পানি, কাদামাটি—কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার স্যুট, শরীর, সবকিছু ভিজে একাকার।

তারপর শুরু হলো হামাগুড়ি, ক্রলিং, দিগবাজি—নানা ধরনের কসরত।

“এই শাহীন, উপরের দিকে তাকাও”

রাত প্রায় আটটার দিকে হঠাৎ একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর কানে এলো—

“এই শাহীন, উপরের দিকে তাকাও।”

তাকিয়ে দেখি—আমার স্কুলমেট, আমার পাড়ার বন্ধু নকিব, ডাকনাম কুটিন। সে তখন ৮ম বিএমএ লং কোর্সের সিনিয়র ক্যাডেট।

পরিচিত একজনকে দেখে বুকের ভেতর যেন একটু স্বস্তি এলো।

মনে হলো, যাক, অন্তত একজন আপন মানুষ তো আছে!

কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।

নকিব আমার চোখের সামনে একটি বৈদ্যুতিক বাল্ব খুলে ড্রেনের মধ্যে ছুড়ে দিল। আমার চোখের সামনেই বাল্বটি চুরমার হয়ে ভেঙে গেল।

তারপর নির্দেশ এলো—

“Front roll!”

আমি থমকে গেলাম। ভাঙা কাচের মধ্যে কীভাবে দিগবাজি দেব?

ঠিক তখনই আবার চিৎকার—

“Bloody chap! There is no friendship here. I told you to give front roll. Carry on!”

সেদিন বুঝলাম—এটা মিলিটারি একাডেমি। এখানে বন্ধুত্বের সংজ্ঞা আলাদা।

যে নকিব একসময় আমার স্কুলমেট ও পাড়ার বন্ধু ছিল, সে এখন আমার সিনিয়র ক্যাডেট। এখানে সে বন্ধু নয়—সে আমার সিনিয়র।

আমি আর কোনো কথা না বলে দিগবাজি দিতে শুরু করলাম। ভাঙা কাচের টুকরো পিঠে গেঁথে পিঠ রক্তাক্ত হয়ে গেল।

আর দোতলা থেকে আমার প্রিয় বন্ধু কুটিন দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য উপভোগ করছিল!

সেদিনই বুঝেছিলাম—

এখানে আমাকে নিজেকেই সামলাতে হবে। নিজের শক্তিতেই দাঁড়াতে হবে।

ডাইনিং হলে প্রথম ডিনার

রাত প্রায় দশটার দিকে হুইসেল বাজল—

“Take shower!”

আমাদের প্লাটুন ছিল প্লাটুন ১৬। আমরা প্রায় ২৫ জন নতুন ক্যাডেট।

তাড়াহুড়ো করে গোসল সারলাম। কিন্তু আবে জমজমের সেই গন্ধ যেন শরীর থেকে আর যাচ্ছেই না। সাবান দিয়েও হাত থেকে সেই গন্ধ পুরোপুরি দূর হলো না।

গোসল শেষে আবার সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, টাই ও কালো জুতা পরে ফল ইন।

তারপর সারিবদ্ধভাবে নিয়ে যাওয়া হলো ডাইনিং হলে।

প্রথমে ব্রিফিং—কীভাবে প্লেট ধরতে হবে, কীভাবে গ্লাস ধরতে হবে, কীভাবে চামচ ধরতে হবে, কোথায় চামচ রাখতে হবে, কীভাবে খেতে হবে।

অবশেষে ডিনার সার্ভ করা হলো।

আজ ৪৪ বছর পরও সেই রাতের মেনু স্পষ্ট মনে আছে—

ভাত, গরুর মাংস, একটি সবজি ও ডাল।

বেয়ারা দুই হাতে খাবারের ডিশ নিয়ে আসত। আমরা অল্প অল্প করে খাবার নিতাম।

হঠাৎ একজনের হাত থেকে চামচ পড়ে গেল।

টং!

সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ—

“All get up!”

আমরা সবাই উঠে দাঁড়ালাম।

বকাঝকা হলো—আমরা এখনো টেবিল ম্যানেজমেন্ট শিখিনি!

তারপর আবার বাইরে।

দৌড়। পানিশমেন্ট। দিগবাজি।

কিছুক্ষণ পর আবার ডাইনিং হলে ফিরিয়ে আনা হলো।

আবার খেতে শুরু করলাম।

এক-দুই চামচ মুখে দিয়েছি, আবার কারও কাছ থেকে একটি শব্দ হলো।

আবার—

“All get up!”

আবার বাইরে।

আবার পানিশমেন্ট।

এভাবে চলতে চলতে আমাদের আধা ঘণ্টার ডিনার টাইম শেষ হয়ে গেল। খাবার আর ঠিকমতো খাওয়াই হলো না। কোনোমতে একটু পানি মুখে দিয়ে বেরিয়ে এলাম।

রাত দেড়টা, সামনে ভোর সাড়ে চারটা

ডরমিটরিতে ফিরে স্লিপিং ড্রেস পরে আবার ফল ইন করতে হলো।

সেই সময় আমাদের সঙ্গে একজন সিনিয়র ক্যাডেট থাকতেন—ল্যান্স কর্পোরাল নাসিম, Jhenaidah ক্যাডেট কলেজের(JCC) l

তিনি এলেন, আমাদের সঙ্গে পরিচয় হলো।

আমরা তখন ক্লান্তিতে প্রায় ভেঙে পড়েছি। চোখে ঘুম, শরীর আর চলছে না।

কিন্তু তাঁর কথা যেন শেষই হয় না!

কথা বলতে বলতে রাত একটা, তারপর দেড়টা।

আমি বারবার বাড়ির কথা ভাবছিলাম। মা-বাবার কথা মনে পড়ছিল।

মনে হচ্ছিল—

কেন এখানে এলাম? আমি কি পারব?

কেউ কথা শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে পড়ছিল, আবার ধাক্কা খেয়ে জেগে উঠছিল।

অবশেষে রাত দেড়টার দিকে ফল ইন শেষ হলো।

তারপর শেষ নির্দেশ—

ভোর সাড়ে চারটায় হাফ প্যান্ট, সাদা শার্ট ও PT dress পরে আবার ফল ইন করতে হবে।

সামনে কী হবে, সেটা তখন আর ভাবার মতো শক্তি ছিল না।

বর্তমানটুকুকেই আঁকড়ে ধরলাম।

Shafiq3

লাশের মতো বিছানায় গিয়ে পড়লাম।

এই ছিল বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে আমার প্রথম দিন—১৪ আগস্ট ১৯৮২।

৪৪ বছর পর: একই দিনে, অন্য এক মিলনমেলা

আজ ৪৪ বছর পর এই দিনটি আবার এসেছে।

আর আশ্চর্যের বিষয়, আজকের ১৪ আগস্ট শুধু আমার একার স্মৃতির দিন নয়। আমার সেই সময়ের বন্ধু, সহপাঠী ও কোর্সমেটদের কাছেও এটি একটি বিশেষ দিন।

আজ সন্ধ্যায় আমার বন্ধুরা Jolshiri গলফ ক্লাব(JGC) রেস্টুরেন্টে একত্রিত হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই—পুরোনো সেই দিনটিকে স্মরণ করা, পুরোনো স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসা, একসঙ্গে গল্প করা, হাসাহাসি করা এবং আমাদের জীবনের সেই বিশেষ অধ্যায়টিকে আবার একটু ছুঁয়ে দেখা।

ভাবতেই ভালো লাগে—৪৪ বছর আগে আমরা ছিলাম একদল তরুণ, সামনে কী আছে জানতাম না। আজ আমরা জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি। কেউ দেশে, কেউ বিদেশে, অবসরে, কেউ জীবনের অন্য ব্যস্ততায়। কিন্তু ১৪ আগস্ট এলেই আমরা আবার সেই তরুণ ক্যাডেট হয়ে যাই।

পুরোনো গল্পের কোনো শেষ নেই।

কে প্রথম দিন কী করেছিল, কে কী পানিশমেন্ট খেয়েছিল, কে কীভাবে বকা খেয়েছিল, কে কী কাণ্ড করেছিল—এসব গল্প হয়তো আমরা শতবার বলেছি, তবুও আবার বলতে ইচ্ছে করে।

কারণ কিছু গল্প পুরোনো হয় না।

কিছু স্মৃতি বয়সের সঙ্গে আরও মধুর হয়ে ওঠে।

দুঃখের বিষয়, আজ আমি সেই আড্ডায় থাকতে পারছি না।

আজ আমার আগে থেকেই আরেকটি পারিবারিক অনুষ্ঠান নির্ধারিত রয়েছে—আমার বোনের নাতনির মুখেভাতের অনুষ্ঠান। পারিবারিক এই অনুষ্ঠানটি আগে থেকেই বুক করা ছিল। তাই আজ আমাকে বন্ধুদের আড্ডার পরিবর্তে পরিবারের এই আনন্দের অনুষ্ঠানে থাকতে হচ্ছে।

দুটি অনুষ্ঠান একই সময়ে, শুধু স্থান আলাদা।

অবশ্যই পরিবারের অনুষ্ঠানটিতে থাকাটা আমার দায়িত্ব এবং আনন্দের। কিন্তু মনটা যে আজ একটু জলশ্রী গলফ ক্লাবের দিকেও পড়ে থাকবে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।

আজ সন্ধ্যায় যখন আমার বন্ধুরা একসঙ্গে বসবে, তখন হয়তো আমিও দূরে কোথাও বসে তাদের কথা মনে করব।

মনে পড়বে সেই ১৪ আগস্ট ১৯৮২।

মনে পড়বে নকিবকে, সোলায়মানকে, আমাদের সেই তরুণ দিনগুলোকে।

মনে পড়বে বিএমএর সেই প্রথম সন্ধ্যা, আবে জমজম, দিগবাজি, ডাইনিং হল, “All get up!”, আর রাত দেড়টায় ক্লান্ত শরীরে বিছানায় পড়ে যাওয়া।

হয়তো বন্ধুরা গল্প করতে করতে আমার কথাও বলবে।

হয়তো কেউ বলবে—

“Shafiq/শাহীন থাকলে গল্পটা আরও জমত!”

সত্যি বলতে কী, আজকের সেই আড্ডাটা আমি খুব মিস করব।

অনেক পুরোনো স্মৃতি, অনেক পুরোনো গল্প, অনেক হারিয়ে যাওয়া মুখ, অনেক হাসি—এসব একসঙ্গে বসে ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ অন্যরকম।

আজ আমি পরিবারের অনুষ্ঠানে থাকব, কিন্তু মনটা কিছুটা পড়ে থাকবে আমার সেই পুরোনো বন্ধুদের কাছে।

কারণ জীবন আমাদের অনেক দূরে নিয়ে গেলেও কিছু বন্ধুত্ব, কিছু স্মৃতি আর কিছু দিন আমাদের ভেতরে চিরকাল একই জায়গায় থেকে যায়।

শেষ কথা

আজ ১৪ আগস্ট ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে পেছনে তাকালে মনে হয়—১৪ আগস্ট ১৯৮২ কোনো সাধারণ তারিখ ছিল না।

সেদিন আমার জীবনের একটি দরজা খুলেছিল।

সেই দরজা দিয়ে ঢুকেছিল এক তরুণ, যে জানত না সামনে কী আছে।

আর সেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল একজন সৈনিক—যে শিখেছিল কীভাবে কষ্ট সহ্য করতে হয়, কীভাবে নিজের ওপর ভরসা করতে হয়, কীভাবে পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়াতে হয় এবং কীভাবে জীবনের কঠিনতম মুহূর্তেও সামনে এগিয়ে যেতে হয়।

সেদিনের সেই তরুণ জানত না যে ৪৪ বছর পরও তার বন্ধুরা সেই দিনটি স্মরণ করে একসঙ্গে বসবে।

সে জানত না যে জীবনের এতগুলো বছর পরও সেই দিনটির গল্প বলতে তার এত আনন্দ হবে।

সে জানত না, সেই দিনের স্মৃতিই একদিন এত মূল্যবান হয়ে উঠবে।

আজ শুধু মনে হয়—

সময় চলে যায়, মানুষ বদলে যায়, জীবন বদলে যায়; কিন্তু কিছু দিন কখনো পুরোনো হয় না।

১৪ আগস্ট ১৯৮২ তেমনই একটি দিন।

আমার জীবনের একটি দিন,

আমার সৈনিক জীবনের শুরু,

আমার বাবার স্বপ্নের একটি অংশ,

আমার বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হাজারো স্মৃতির উৎস,

আর আজ—আমাদের সবার ফিরে দেখার একটি উপলক্ষ।

আজ আমি বন্ধুদের সঙ্গে থাকতে পারছি না। কিন্তু দূর থেকেই আমার সব বন্ধু ও ১০ম বিএমএ লং কোর্সের সকল সহযাত্রীকে জানাই—

শুভ ১৪ আগস্ট।

আমাদের সেই তারুণ্যের দিনগুলোর জন্য,

আমাদের বন্ধুত্বের জন্য,

আমাদের হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষগুলোর জন্য,

আর সেই অমলিন স্মৃতিগুলোর জন্য—

Cheers to the memories that time could never erase.

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা