১৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৬ এএম
শুক্রবারের সকাল যেন সপ্তাহের কোলাহল থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখার সকাল। জুমার দিনের এই নরম আলোয় রাষ্ট্রের কথাও যেন অন্যভাবে ভাবতে ইচ্ছে করে—ক্ষমতা নয়, দায়িত্ব; পদ নয়, আমানত; রাজনীতি নয়, মানুষের কাছে তার ঋণ। গতকাল সেই ভাবনারই একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় খুলে গেল। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের পর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অভিষেক এখন কার্যত সময়ের অপেক্ষা। বিএনপির মহাসচিব এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দীর্ঘদিনের দায়িত্বও ইতোমধ্যে ছেড়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ এক অদ্ভুত রাজনৈতিক যাত্রার সমাপ্তি ও নতুন এক দায়িত্বের শুরু—দলের দুর্দিনের কাণ্ডারি এবার উঠছেন বঙ্গভবনে।
মির্জা ফখরুলের এই যাত্রার তাৎপর্য কেবল পদ পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নয়। স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামের এই মুক্তিযোদ্ধার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত তাঁর সহনশীলতা। বিরোধী রাজনীতির কঠিন সময়ে মামলা-হামলা, কারাবরণ ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতা—সবকিছুর ভেতর দিয়ে তিনি যে পরিশীলিত ও সংযত রাজনৈতিক ভাষা ধরে রেখেছেন, সেটিই আজ তাঁর সবচেয়ে বড় পুঁজি। দলীয় পরিচয়ের বাইরে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে; বিদেশি কূটনীতিক মহলেও তিনি একজন ভদ্র, সংলাপপ্রবণ ও পরিমিতিবোধসম্পন্ন রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। ফলে বঙ্গভবনে তাঁর যাওয়া কেবল বিএনপির জন্য একটি সম্মানের মুহূর্ত নয়; বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক বিভাজনের পর জাতীয় ঐকমত্য তৈরির একটি চমৎকার সম্ভাবনাও তৈরি করছে। একজন সাদা মনের আদর্শবান শিক্ষক যখন জাতির অভিভাবকের আসনে বসেন, তখন সংশয়ের চেয়ে প্রত্যাশাই বড় হয়ে ওঠে। সংকটের সময়ে রাষ্ট্রপতিকে কেবল সংবিধানের রক্ষক নয়, জাতিরও অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে হয়। মির্জা ফখরুলের সজ্জনতা, রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা সেই সর্বোচ্চ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে তাই বহুদিন পর এক ধরনের আশাবাদ তৈরি করেছে। মসনদ তাঁকে কতটা বদলাবে—এ প্রশ্নের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তিনি মসনদটিকে কতটা মানুষের আস্থার জায়গায় নিয়ে যেতে পারেন।
সুফিরা হয়তো বলতেন, মানুষের আসল পরীক্ষা ক্ষমতা পাওয়ার আগে নয়, ক্ষমতা পাওয়ার পরে। দুর্দিনে পাশে থাকা যেমন চরিত্রের পরীক্ষা, তেমনি সুদিনে সংযত থাকা তার চেয়েও বড় পরীক্ষা। মির্জা ফখরুলের সামনে এখন সেই দ্বিতীয় পরীক্ষা। দলীয় মহাসচিবের কণ্ঠে তাঁকে বহুবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কথা বলতে হয়েছে; রাষ্ট্রপতির কণ্ঠে তাঁকে বলতে হবে সমগ্র বাংলাদেশের কথা। সেখানে বিএনপি-জামায়াত, সরকার-বিরোধী দল, শহর-গ্রাম, ধনী-গরিব—কেউ আলাদা থাকবে না। রাষ্ট্রপতির আসনের সৌন্দর্যই হলো, সেখানে পৌঁছে দলীয় পতাকাটি নামিয়ে রাষ্ট্রের পতাকাটিকে সামনে আনতে হয়। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই উত্তরণ সফল হলে বঙ্গভবন কেবল একটি সাংবিধানিক ভবন থাকবে না, জাতীয় সমঝোতারও একটি প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সঙ্গে রাষ্ট্রের অর্থনীতির আকাশেও একটু আশার মেঘ দেখা যাচ্ছে। আগস্টের প্রথম ১২ দিনে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার—যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪২ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। এই প্রবাহ অব্যাহত থাকলে মাসিক প্রবাসী আয় নতুন রেকর্ডের কাছাকাছি যেতে পারে। অথচ একই সঙ্গে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে অনিয়ম ও লুটপাট নিয়ে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিংয়ের উদ্বেগও সামনে এসেছে। অর্থাৎ একদিকে প্রবাসীর ঘামে উপার্জিত ডলার দেশে ফিরছে, অন্যদিকে সেই অর্থ ব্যবস্থাপনার প্রতিষ্ঠানগুলো যদি দুর্বল থাকে, তবে নদী দিয়ে পানি এসে বাঁধের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার মতোই হবে। দেশের অর্থনীতির জন্য এখন শুধু ডলার দরকার নয়; দরকার ডলারকে নিরাপদ রাখার প্রতিষ্ঠান।
কিন্তু রাষ্ট্রের বড় স্বপ্নের পাশে নাগরিকের ছোট দুঃখগুলোও আজ দরজায় কড়া নাড়ছে। রাজধানীর রাস্তায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার প্রায় অঘোষিত রাজত্ব—অবৈধ চার্জিং ও লেনদেনের বিশাল অর্থনীতি, প্রতিদিনের চাঁদাবাজি, ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি—সব মিলিয়ে শহর যেন এমন এক ব্যবস্থার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, যার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কার, তা কেউ ঠিক জানে না। ব্যাটারিচালিত রিকশার চার্জিং ঘিরে অবৈধ বাণিজ্যের বিস্তার নিয়ে আগেও নানা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এসেছে।
একই সঙ্গে সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে দীর্ঘ সারি তৈরি হওয়া রাজধানীবাসীর আরেক দৈনন্দিন দুর্ভোগ। প্রশ্নটি তাই শুধু যানবাহনের নয়—নগর ব্যবস্থাপনার। রাষ্ট্র যদি বড় বড় নীতির কথা বলে, অথচ রাজধানীর একটি রাস্তা, একটি চার্জিং স্টেশন বা একটি ফিলিং স্টেশনের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের সক্ষমতার সংজ্ঞাটি খুবই বাস্তব এবং খুবই ছোট হয়ে যায়।
জ্বালানি সংকটের বাস্তবতাকে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগও। তাদের বিশ্লেষণে তাৎক্ষণিক সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি এলএনজি আমদানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারকে সমন্বিত কৌশলের অংশ করার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর ক্রমশ বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, অথচ দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে। সংকটের সময় শুধু ট্যাংকার এনে মোকাবিলা করা যায়; কিন্তু রাষ্ট্রের কাজ হলো পরের আগুনটি যাতে না লাগে, তার ব্যবস্থাও করা। জ্বালানি নিরাপত্তা তাই আজ অর্থনীতির বিষয় নয় শুধু—এটি জাতীয় নিরাপত্তা, শিল্প, কৃষি, পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের রান্নাঘরেরও প্রশ্ন।
স্বাস্থ্যখাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রাষ্ট্রের আরেকটি আয়না সামনে ধরে। পিপিআরসির গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপ করা সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মাত্র ২২ শতাংশে প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত ছিল; অর্থাৎ প্রায় ৭৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় ওষুধের পূর্ণ প্রাপ্যতা ছিল না। মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসার আশায় সরকারি হাসপাতালে যায়, কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শের পর যখন ওষুধের কাউন্টারে গিয়ে শোনে—‘নেই’—তখন রাষ্ট্রের কল্যাণের ধারণাটি তার কাছে খুব কঠিন এক বাস্তবতায় পরিণত হয়। আরও বিস্ময়কর, একই গবেষণায় সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানের বিপুল অর্থ অব্যবহৃত থাকার কথাও উঠে এসেছে। অর্থের অভাবের চেয়ে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা যদি বড় সমস্যা হয়, তবে চিকিৎসাব্যবস্থার অসুখটি অর্থনৈতিক নয়—প্রাতিষ্ঠানিক।
আরেকটি অস্বস্তিকর সংবাদ এসেছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদনে। আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট AQIS বাংলাদেশে সক্রিয় সেল, আর্থিক ও লজিস্টিক নেটওয়ার্ক বিস্তারের চেষ্টা করছে বলে সতর্ক করা হয়েছে। খবরটি আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য নয়; বরং রাষ্ট্রকে সতর্ক করার জন্য। একটি দেশ যখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, তখন তার প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই সঙ্গে উদার ও দৃঢ় হতে হয়—নাগরিক স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কিন্তু সন্ত্রাসের প্রতি শূন্য সহনশীল। অন্ধকারকে মোকাবিলা করতে আলো যেমন দরকার, তেমনি দরকার আলোর চারপাশে পাহারাও।
আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নটিও তাই নতুন করে সামনে আসে। সাম্প্রতিক সময়ে বিস্ফোরক উদ্ধার ও নাশকতার আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে মাঠপর্যায়ে পুলিশের নজরদারি এবং গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা জাতীয় দৈনিকগুলোর সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয়তে গুরুত্ব পেয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে একসঙ্গে দুটি কাজ করতে হয়—নিরীহ মানুষকে নিরাপদ রাখা এবং নাগরিক স্বাধীনতার সীমা অতিক্রম না করা। এই ভারসাম্যই আধুনিক রাষ্ট্রের আসল পরীক্ষা। ভয় দেখিয়ে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা যায় না; আবার নিরাপত্তাহীন স্বাধীনতাও শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা থাকে না।
আজকের সম্পাদকীয়ের কথাটি তাই একটিই—রাষ্ট্রকে অভিভাবক হতে হবে। বঙ্গভবনে একজন নতুন রাষ্ট্রপতি যাচ্ছেন, কিন্তু রাষ্ট্রের অভিভাবকত্ব কেবল একজন ব্যক্তির দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায়িত্ব। রাজধানীর রাস্তায় অরাজকতা, জ্বালানি সংকট, হাসপাতালে ওষুধের অভাব কিংবা নাশকতার আশঙ্কা—প্রতিটি সমস্যাই একই জায়গায় এসে মেলে: জবাবদিহি কোথায়? দায়িত্ব কার? ব্যবস্থা নেওয়ার পরও কেন আবার একই সমস্যা ফিরে আসে? রাষ্ট্রের শক্তি তার শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতায় যতটা নয়, তার নাগরিককে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন দেওয়ার সক্ষমতায় তার চেয়েও বেশি। নতুন রাষ্ট্রপতির সামনে তাই শুধু সংবিধান রক্ষার দায়িত্ব নয়; জাতীয় সমঝোতার একটি নৈতিক আবহ তৈরি করারও সুযোগ রয়েছে। হয়তো এটাই এই সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন—রাষ্ট্র যেন আবার মানুষের কাছে ‘আমার রাষ্ট্র’ বলে মনে হয়।
দূর পৃথিবীতেও যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা থামেনি। ইউক্রেনের ওডেসা অঞ্চলে রুশ ড্রোন হামলায় ৩৪০ যাত্রী নিয়ে চলা একটি যাত্রীবাহী ট্রেনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন বলে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে; হামলায় শিশুসহ যাত্রীদেরও আহত হওয়ার খবর এসেছে। যুদ্ধের মানচিত্রে রেললাইন হয়তো একটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু, কিন্তু ট্রেনের ভেতরে থাকে মানুষের ঘরে ফেরার গল্প। যুদ্ধ যখন সেই গল্পের ওপর আঘাত করে, তখন বিজয়-পরাজয়ের হিসাবের চেয়ে মানবতার ক্ষতটাই বড় হয়ে ওঠে।
আর পৃথিবীর অন্য প্রান্তে হরমুজ প্রণালী ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। প্রণালীটির নিয়ন্ত্রণ ও সেখানে জাহাজ চলাচল নিয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থান বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য দূরের যুদ্ধও তাই দূরের থাকে না—তার ছায়া পড়ে জ্বালানির দামে, পরিবহন ব্যয়ে, শিল্পের উৎপাদনে, শেষ পর্যন্ত পরিবারের বাজারের ব্যাগে।
জুমার এই সকালে তাই প্রার্থনাটি খুব সরল। ক্ষমতা যেন দায়িত্বে পরিণত হয়, রাজনীতি যেন সমঝোতার ভাষা শেখে, প্রতিষ্ঠান যেন মানুষের পাশে দাঁড়ায়। বঙ্গভবনের নতুন অধ্যায়টি যদি জাতীয় বিভাজনের ওপর একটি সেতু নির্মাণের সুযোগ হয়ে ওঠে, তবে সেটিই হবে এই সময়ের সবচেয়ে সুন্দর সংবাদ। কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য তার ভবনে নয়—তার মানুষের মনে। আর মানুষের মনে রাষ্ট্রের জন্য আস্থা জন্মায় তখনই, যখন তারা বুঝতে পারে—এই রাষ্ট্রের কেউ একজন অন্তত তাদের কথা শুনছে।
আজকের দিনটি হোক ক্ষমতার নয়—আমানতের; বিভেদের নয়—সমঝোতার; আর সংশয়ের নয়—আস্থার দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার দিন।
লেখক: সাবেক সচিব ও সিনিয়র ব্যুরোক্রেট বিশ্লেষক