Dhaka Mail Logo

মতামত

প্রযুক্তিখাতে নারীর অগ্রগতি, প্রশিক্ষণের পরের হিসাব কোথায়?

১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৩৪ পিএম

বাংলাদেশের প্রযুক্তিখাতে নারীদের নিয়ে আলোচনা হলেই প্রশিক্ষণ, ফ্রিল্যান্সিং বা উদ্যোক্তা তৈরির কথা সামনে আসে। গত কয়েক বছরে হাজারো নারী এসব কর্মসূচির আওতায় এসেছেন। কিন্তু এখন প্রশ্নটা শুধু কতজন প্রশিক্ষণ পেলেন, প্রশিক্ষণের পর কতজন কাজ পেলেন, কতজন দুই বা পাঁচ বছর পরও এই পেশায় আছেন, কতজন পদোন্নতি পেলেন এবং কতজন নেতৃত্বে পৌঁছালেন- প্রকৃত অগ্রগতি বুঝতে এখন এই হিসাবগুলোই বেশি জরুরি।

২০২৬ সালে আইসিটি খাতে নারীর অংশগ্রহণ ২৫ শতাংশে নেওয়ার জাতীয় লক্ষ্য। প্রশিক্ষণ বাড়লেও চাকরিতে টিকে থাকা, পদোন্নতি, বেতন ও নেতৃত্বে নারীর অবস্থানের হালনাগাদ পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো স্পষ্ট নয়।

২০২৬ সালের লক্ষ্য ২৫ শতাংশ
২০২৩ সালের এসডিজি সম্মেলনে জাতিসংঘে দেওয়া বাংলাদেশের জাতীয় অঙ্গীকারে প্রযুক্তি স্টার্টআপ ও ই-কমার্সসহ আইসিটি খাতে নারীর অংশগ্রহণ ২০২৬ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। একই অঙ্গীকারে ২০৩২ সালের মধ্যে ৭৫ হাজার নারীকে আইসিটি-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণের কথাও বলা হয়েছে।

পুরোনো হিসাব যা বলেছিল
প্রযুক্তিখাতে নারীর অবস্থান নিয়ে সবচেয়ে নির্দিষ্ট প্রকাশ্য পুরোনো তথ্যগুলোর একটি BASIS-এর ২০১৭ সালের হিসাব। বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে সেই তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, তখন দেশের আইটি খাতে ২০ হাজার ১২৮ নারী কাজ করতেন, যা মোট আইটি কর্মীর ১৯.৬ শতাংশ। শুরুর পর্যায়ের পদে নারীর অংশ ছিল ২৩.৩ শতাংশ, মাঝামাঝি পর্যায়ে ১৮.৫ শতাংশ এবং শীর্ষ পদে ১৪.৪ শতাংশ। অর্থাৎ পদমর্যাদা বাড়ার সঙ্গে নারীর প্রতিনিধিত্ব কমছিল। তবে এগুলো ২০১৭ সালের তথ্য; ২০২৬ সালের বর্তমান হার নয়।

প্রশিক্ষণের সুযোগ বেড়েছে
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের Her Power Project-এর সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৩০ উপজেলায় মোট ২৫ হাজার ১২৫ নারীকে পাঁচ মাসের প্রযুক্তি প্রশিক্ষণের লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে ১০ হাজার ৪০০ জনকে আইটি সেবা প্রদানকারী, ১০ হাজার ৪০০ জনকে ফ্রিল্যান্সার, ৩ হাজার ২৫০ জনকে ই-কমার্স পেশাজীবী এবং ১ হাজার ৭৫ জনকে কল সেন্টার এজেন্ট হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশিক্ষণের পর এক মাসের মেন্টরশিপের ব্যবস্থাও প্রকল্পে রাখা হয়েছে।

সনদের পর কী হচ্ছে?
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—প্রশিক্ষণের পর কতজন নিয়মিত আয় করছেন বা চাকরিতে যাচ্ছেন। BASIS-এর ASSET কর্মসূচিতে ফলাফল মাপার একটি নজির রয়েছে। এটি নারী-নির্দিষ্ট কর্মসূচি নয়, তবে নতুন প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের ৫৫ শতাংশকে প্রশিক্ষণ ও সনদ শেষ হওয়ার তিন মাসের মধ্যে কর্মসংস্থানে আনার লক্ষ্য রয়েছে এবং অন্তত তিন মাস চাকরিতে টিকে থাকার বিষয়টিও মাপা হবে। নারীদের প্রযুক্তি প্রশিক্ষণেও একইভাবে ছয় মাস, এক বছর ও দুই বছর পরের ফল প্রকাশ করা গেলে প্রকৃত প্রভাব বোঝা সহজ হবে।

প্রযুক্তিতে ঢোকার আগেও ব্যবধান
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ICT Access and Use by Households and Individuals Survey 2024-25-এর তথ্য অনুযায়ী, পুরুষদের নিজস্ব মোবাইল ফোনের মালিকানার হার ছিল ৭০ শতাংশ, নারীদের ৫৮.৯ শতাংশ। ইন্টারনেট ব্যবহারে পুরুষদের হার ৫৬.৬ শতাংশ, নারীদের ৫০.২ শতাংশ। এটি প্রযুক্তিখাতের কর্মসংস্থানের হার নয়; ব্যক্তিপর্যায়ের প্রযুক্তি ব্যবহারের চিত্র। তবে নিজস্ব ডিভাইস ও ইন্টারনেট ছাড়া অনলাইন শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং, চাকরির আবেদন বা ডিজিটাল ব্যবসায় নিয়মিত যুক্ত হওয়া কঠিন।

নিরাপদ কর্মক্ষেত্রে নতুন আইনি কাঠামো
২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল কার্যকর বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন কর্মস্থলে সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধে মালিক ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব আরও স্পষ্ট করেছে। সংশোধিত আইনে অভিযোগ তদন্তে পাঁচ সদস্যের অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটির কথা বলা হয়েছে। কমিটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ নারী প্রতিনিধি, একজন নারী প্রধান এবং জেন্ডার ও যৌন নির্যাতন নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান থেকে দুজন সদস্য রাখার বিধান রয়েছে। এই বিধান না মানলে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের ব্যবস্থাও আছে।

শিশুযত্ন ও পারিবারিক দায়িত্ব
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের Women’s Economic Empowerment in Bangladesh প্রতিবেদনে ২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপ বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, শ্রমশক্তির বাইরে থাকা নারীদের ৬৫ শতাংশ ঘরের কাজ ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে কাজ খুঁজছিলেন না। বাংলাদেশ শ্রম আইনের ৯৪ ধারায় শ্রম আইনের আওতাধীন কোনো প্রতিষ্ঠানে সাধারণত ৪০ বা তার বেশি নারী শ্রমিক থাকলে ছয় বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য উপযুক্ত কক্ষের ব্যবস্থা রাখতে বলা হয়েছে।

সুবিধা এখনো সীমিত
একই বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদনে World Bank Enterprise Survey 2022-এর তথ্য অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক বেসরকারি খাতের সেবা প্রতিষ্ঠানের মাত্র ২ শতাংশ এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানের ৯ শতাংশ কর্মীদের জন্য কর্মস্থলে শিশুযত্ন বা এ বাবদ অর্থসহায়তা দেয়। ছয় বছর বা তার কম বয়সী সন্তান আছে এমন মজুরিভিত্তিক নারী কর্মীদের মধ্যে নিয়োগকর্তার শিশুযত্ন সুবিধা পান সেবা খাতে ৬ শতাংশ এবং শিল্প খাতে ৭ শতাংশ। এগুলো প্রযুক্তিখাতের আলাদা তথ্য নয়, তবে নারী কর্মী ধরে রাখতে শিশুযত্ন কেন গুরুত্বপূর্ণ-তা স্পষ্ট করে।

বেতনের আলাদা হিসাব দরকার
বাংলাদেশের প্রযুক্তিখাতের জন্য সাম্প্রতিক, নির্ভরযোগ্য নারী-পুরুষ বেতন ব্যবধানের তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া কঠিন। জাতীয় শ্রমবাজার নিয়ে বিশ্বব্যাংকের একই প্রতিবেদনে দেখা যায়, কর্মরত নারীর গড় মাসিক আয় প্রায় ৯ হাজার টাকা, যা পুরুষের তুলনায় ৪১ শতাংশ কম। কর্মঘণ্টার পার্থক্য হিসাব করার পরও ব্যবধান ২৬ শতাংশ। শিল্প খাতে ঘণ্টাপ্রতি আয়েও নারীরা প্রায় ৩৮ শতাংশ পিছিয়ে। এগুলো প্রযুক্তিখাতের তথ্য নয়; তাই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা, একই ধরনের পদ ও অভিজ্ঞতা ধরে বেতন বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

এখন দরকার ফলাফলের প্রকাশ্য হিসাব
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে Gender and Skills Taskforce-এর National Steering Committee ‘Gender and Skills Action Plan 2025–2027’ অনুমোদন করে। ILO-এর তথ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনাটি ছয়টি মূল স্তম্ভ ও ৩৩টি সূচকের ওপর তৈরি। এতে অনিরাপদ ও বৈষম্যমূলক কর্মপরিবেশ, প্রযুক্তিগত কাজে নারীর সীমিত সুযোগ এবং উন্নত শ্রমবাজারের তথ্যের প্রয়োজনকে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রযুক্তিখাতে নারীর অগ্রগতি তাই শুধু প্রশিক্ষণের সংখ্যায় মাপা যাবে না। একটি সহজ ও নিয়মিত প্রকাশ্য হিসাব দরকার-কতজন নারী নিয়োগ পাচ্ছেন, দুই বা পাঁচ বছর পর কতজন চাকরিতে আছেন, কতজন পদোন্নতি পাচ্ছেন, নেতৃত্বে কতজন, মাতৃত্বকালীন ছুটির পর কতজন ফিরছেন এবং একই ধরনের কাজে নারী-পুরুষের বেতনে পার্থক্য কত। শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একটাই: কতজন নারী প্রযুক্তিখাতে ঢুকলেন, কতজন টিকে থাকলেন এবং কতজন সামনে এগিয়ে নেতৃত্বে পৌঁছালেন?

লেখক: রিয়াদ হাসনাইন, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও সরকারি খাতের সংস্কারবিষয়ক নীতি বিশ্লেষক।

এমআই