Dhaka Mail Logo

মতামত

বেঁচে আছি এটাই মিরাকল...

০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৭ পিএম

জুলাই বিপ্লবের দিনগুলোতে আন্দোলনের মাঠে পুলিশ-আওয়ামী লীগের অন্যতম টার্গেট ছিল সাংবাদিক। চব্বিশের জুলাইয়ের দিনগুলোতে যেমন সাংবাদিকদের একটি অংশ সরকারের দালালিতে ব্যস্ত ছিল, ঠিক তার বিপরীতে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত একদল সাংবাদিক মাঠের সঠিক চিত্র দেশ ও বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে মাঠে ছিলেন। 

আন্দোলনের সময়ে মাঠে কাজ করা রিপোর্টার, ফটো সংবাদিক, ভিডিও জার্নালিস্ট, মোবাইল সাংবাদিকদের দেখেছি কিভাবে তারা মাঠের আসল চিত্র তুলে ধরতে উদগ্রীব ছিলেন। তাইতো আওয়ামী লীগ ও পুলিশের অন্যতম টার্গেট ছিল সাংবাদিকরা। 

ঘাতক পুলিশের গুলিতে আমরা হারিয়েছি অন্তত ছয়জন অকুতোভয় সাংবাদিককে। পুলিশের গুলি ও আওয়ামী লীগের হামলায় আহত হয়েছেন কয়েকশ সাংবাদিক। আমি ১৮ জুলাই মিরপুরে অস্রধারী যুবলীগ নেতার ছবি তুলতে গিয়ে তোপের মুখে পড়ে কোনোভাবে বেঁচে ফিরলেও ৪ আগস্ট মারধরের শিকার হই আওয়ামী লীগের গুন্ডাদের হাতে।

৪ আগস্ট, ২০২৪, রোববার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনে এদিন সকাল থেকেই সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের উপর আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা হামলা করে। সেদিন রাজধানীর শাহবাগ, যাত্রাবাড়ি, মিরপুর, উত্তরা, সায়েন্সল্যাব মোড়, ধানমন্ডি-২৭সহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ চলতে থাকে। 

সেদিন আমাকে অফিস থেকে ধানমন্ডি এলাকায় নিউজ সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাই বেলা ১১টার দিকে বের হয়ে একটি রিকশাযোগে শ্যামলী হয়ে ধানমন্ডির দিকে এগোতে থাকি। কিন্তু কিছুপথ এগোনোর পরেই দেখি গণভবন এলাকা ঘিরে রাখা হয়েছে এবং চারিদিকে কঠোর নিরাপত্তা বলয়। তাই হুমায়ুন রোড হয়ে মোহাম্মদপুরের ভেতর দিয়ে ধানমন্ডি-২৭ এর রাপা প্লাজার সামনের দিকে গিয়ে পৌঁছাই। সেখানে প্রথমে কোনো আন্দোলনকারী কিংবা আওয়ামী লীগের কাউকেই দেখতে পাইনি। 

পরে ১০ মিনিটের মতো অপেক্ষা করার পরে ১১ টা ৪৫-এর দিকে দেখতে পাই, সোবহানবাগের দিক থেকে আওয়ামী লীগের একটি মিছিল আমার দিকে আসছে। ৮০-১০০ জনের এ মিছিলে ৮-১০ জনকে আগ্নেয়াস্ত্র এবং ২০-৩০ জনকে দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোটা বহন করতে দেখি। মিছিলটি রাপা প্লাজার সামনে থেকে ১৬ নং রাস্তায় প্রবেশ করে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তখন সেখানে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। তারা রাস্তায় যাদের পেয়েছিল, তাদেরই ধরে মারধর করে। আশপাশের গলিতে আন্দোলনকারীরা বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করলে তাদের উপর গুলি ছোড়ে আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা।

সেদিন দুপুর ১২টার দিকে হঠাৎ লক্ষ্য করি, আওয়ামী লীগের অস্ত্রধারীরা একজন সাইকেল আরোহীকে ধাওয়া দিয়ে রাপা প্লাজার সামনে এনে তাকে ঘিরে ধরে মারধর শুরু করেছে। ভালো করে খেয়াল করে দেখি, যাকে মারধর করা হচ্ছে সে আমারই সহকর্মী মিরাজ। আমি বিষয়টি লক্ষ্য করার পরেই সেখানে দৌড়ে যাই এবং সাংবাদিক মিরাজকে যেন মারধর না করে এজন্য অনুরোধ জানাই। 

কিন্তু আওয়ামী লীগের গুন্ডারা কোনোভাবেই মিরাজকে ছাড়তে চাচ্ছিল না। তারা বারবার মিরাজের মোবাই লফোন চেক করতে চাচ্ছিল। কিন্তু আমি বিষয়টির প্রতিবাদ জানিয়ে যাচ্ছিলাম যে, সাংবাদিকের মোবাইল কেন চেক করবে? কারণ আমার জানা ছিল যে, মিরাজের ফেসবুক প্রোফাইল তখন লাল করা ছিল এবং কোনোভাবে ফোন চেক করলে তারা মিরাজকে হয়তো অক্ষত রাখবে না। তাই আমি পুরো ভিড় ঠেলে মারধরের মধ্যেই মিরাজকে কোনোভাবে বের করে দিই এবং সে দ্রুত তার সাইকেল নিয়ে চলে যায়। 

কিন্তু ওই মুহূর্তে আমি পড়ে যাই আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসীদের তোপের মুখে। তারা আমার উপর সদলবলে এসে হামলা শুরু করে। আমি সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে প্রেস কার্ড প্রদর্শন করলেও ‘কেন এখানে সংবাদ কাভার করতে এসেছি’ বলে তারা হকিস্টিক, রড, লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকে।

আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা প্রথম ধাপে আমাকে পেটানোর পরে আমি কোনোভাবে দৌড়ে এসে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা মোহাম্মদপুর/ধানমন্ডি এলাকার যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের কাছে গিয়ে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তাদের হাত থেকে সেইফ করার অনুরোধ করি, কিন্তু তারা আমাকে রাস্তা দিয়ে দৌড়ে পালাতে বলেন। 

তখন মাথায় আসে যে, যদি আমি দৌড় দিই, তাহলে আমাকে আবার আক্রমণ করার সুযোগ পাবে এবং পেছন থেকে গুলিও করতে পারে। তাই আমি মূল সড়কে নেমে রাস্তা পেরিয়ে ফুটপাতে উঠার আগেই আর একটি গ্রুপ এসে আমাকে বেধড়ক পেটাতে থাকে। ওরা আমার উপর বন্য হায়েনার মতো এলোপাতাড়ি মারধর করতে থাকে। রামদা, চাপাতি, লাঠি দিয়ে একের পর এক আঘাত করে আমাকে। 

এসময় ডিবিসি নিউজের বিকাশ দাদা আমাকে আগলে ধরে রক্ষা করার চেষ্টা করেন এবং আমি কোনোভাবে ফুটপাতে উঠে রেলিংয়ের ভেতরে চলে যাই। সেখানে তারা আমাকে রামদা দিয়ে বারবার কোপানোর চেষ্টা করে। কিন্তু রেলিংয়ের কারণে আমাকে হাতের নাগালে পাচ্ছিল না। 

এরপর তৃতীয় ধাপে যখন আমি রাস্তা পেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি, তখন আবার ৮-১০ জনের একটি হিংস্র হেলমেট বাহিনী আমাকে মারধর করতে থাকে। এক পর্যায়ে আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। আমার মাথায় বেশ কয়েকটি আঘাত করে তারা। আমার পকেট থেকে মোবাইল মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে কয়েকজন। ওদের মধ্য থেকে কয়েকজন আমাকে বলতেছিল, ‘সবার কাছে মেশিন (পিস্তল) আছে, দ্রুত পালা নয়তো এখানেই ফেলে দেব।’

তৃতীয় ধাপে আক্রমণের সময় আমি আর উঠে দাঁড়াতে পারছিলাম না। ওরা একের পর এক আঘাত করে যাচ্ছিল আমার পিঠে, মাথায়, হাতে। এর মধ্যে ওদের একজন আমার মাথায় রামদা দিয়ে কোপ দেয়। মুহূর্তের মধ্যে চারিদিক অন্ধকার দেখতে পাই আমি। এসময় বিকাশ দাদা এগিয়ে এসে আমাকে আবার আগলে মাথা কাপড় দিয়ে বেঁধে রিকশায় তুলে দেন। তখন কোনোভাবে রিকশাটি এক হাত দিয়ে ধরে এবং এক হাতে মাথার কাঁটা অংশ চেপে ধরে মগবাজারের ইনসাফ বারাকা হাসপাতালের সামনে যাই। 

আমার এই পরিস্থিতি দেখে হাসপাতালের নার্স ও গার্ডরা আমাকে ধরে জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়। অফিস থেকে হাসপাতালে ছুটে আসেন আমার চিফ রিপোর্টার নয়ন ভাই, সহকর্মী তন্ময় দাদা, বন্ধু ও সহকর্মী শিশির, বন্ধু নাইম কামালসহ অফিসের অ্যাডমিনের ভাইয়েরা। সেদিন মাথায় পাঁচটি সেলাই লাগে, ডান হাতে ফ্র্যাকচারের কারণে হাত ঝুলিয়ে রাখার পরামর্শ দেন ডাক্তার। সেদিন অসুস্থ শরীর নিয়েও বাসায় এসে ছটফট করছিলাম মাঠের চিত্র দেখে।

আফসোস হচ্ছিল যে, যদি আওয়ামী হায়েনারা আমাকে মেরে আহত না করতো, তাহলে অন্তত একটি স্পটের চিত্র দেশবাসীকে জানাতে পারতাম। বাসায় বসেই খোঁজ নিচ্ছিলাম ঢাকার অন্যতম হটস্পট যাত্রাবাড়ি, মিরপুর, উত্তরা, সায়েন্স ল্যাব, রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকার। 

সেদিন সরারাত ঘুমাতে পারিনি, চারিদিকে আওয়ামী বট বাহিনীর ছড়ানো গুজবের কারণে। তখন প্রতি মুহূর্তেই নতুন নতুন গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে আন্দোলনকে দমানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে ৪ আগস্ট রাতেই ঘোষণা দেওয়া হয় ‘লং মার্চ টু গণভবন’ কর্মসূচির।

লেখক: সাংবাদিক

বিইউ/এএইচ