ঢাকা মেইল ডেস্ক
০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০১ পিএম
সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণাপত্র প্রত্যাহার, চৌর্যবৃত্তি ও অনিয়ম নিয়ে খবরের প্রেক্ষিতে নানা আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে। প্রথমেই বলে রাখি, গবেষণাপত্র বা রিসার্চ আর্টিকেল প্রত্যাহার সকল গবেষকের জন্যই খুবই বিব্রতকর। কোনো গবেষকই চান না তাঁর রিসার্চ আর্টিকেল কোনো জার্নালে প্রকাশের পর প্রত্যাহার হোক।
যৌথ গবেষণার অংশ হিসেবে আমি আন্তর্জাতিক একটি রিসার্চ কলাবোরেটর গ্রুপে যুক্ত হই ২০২১-২০২২ সালে। কনট্রিবিউটর রোলস ট্যাক্সোনমি (CRediT) অনুযায়ী আমি কনসেপচুয়াল ইনপুটসহ রিভিউ ও এডিটিং কাজে অংশ নিই। CRediT statement অনুযায়ী স্ব স্ব কনট্রিবিউটিং Authors গবেষণা কাজ, ডাটা অ্যানালাইসিস, ড্রাফটিং, এডিটিং ইত্যাদি সম্পন্ন করে গবেষণা প্রবন্ধ তৈরি করে। উক্ত আন্তর্জাতিক কোলাবোরেশনে দুটি গবেষণা প্রবন্ধ Hindawi কর্তৃক প্রকাশিত দুটি জার্নালের বিশেষ সংখ্যায় (Special Issue) Submit করা হয়। রিভিউ শেষে উক্ত আর্টিকেল দুটি ২০২২ সালে ও ২০২৩ সালে জার্নালের বিশেষ সংখ্যায় অনলাইন ভার্সনে প্রথমে প্রকাশিত হয়।
১) Comparative analysis of antioxidants activity of Indigenously produced Moringa Oleifera Seed extact শিরোনামের গবেষণা প্রবন্ধটি BioMed Research International Journal-এর বিশেষ সংখ্যা (Control of Infectious Diseases with Bio-inorganic Nanodrugs)-এ প্রকাশিত হয় এবং এটি প্রকাশের পরপরই Hindawi প্রত্যাহার করে। এ বিশেষ সংখ্যার গেস্ট এডিটর ছিলেন LS Kumaran (India)। উল্লেখ্য যে, উক্ত গেস্ট এডিটর কর্তৃক সম্পাদিত এই জার্নালের বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত সবগুলো গবেষণা প্রবন্ধ Hindawi প্রত্যাহার করে। প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে Hindawi কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না করে প্রত্যাহার হওয়া সকল গবেষণা প্রবন্ধের ক্ষেত্রে প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে নিচের বিষয়গুলো উল্লেখ করেছিল—
i) Discrepancies in scope
ii) Manipulated or compromised review
iii) Discrepancies in the description of the research reported
iv) Inappropriate citation, etc.
কোনো Authors গ্রুপ চৌর্যবৃত্তি বা অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে কোনো প্রবন্ধ প্রকাশ করলে সেটি মূল্যায়ন সাপেক্ষে প্রবন্ধ প্রকাশক/এডিটর প্রত্যাহার করতে পারে। কিন্তু এই বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত সবগুলো গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশক প্রত্যাহার করেছিল। এর দায় শুধু কি গবেষকদের? সবগুলো প্রবন্ধেই কি অনিয়ম/ডাটা ম্যানুপুলেশন হয়েছে? নিশ্চয়ই না। তাহলে হয় এডিটর জার্নালের যথাযথ রিভিউ প্রক্রিয়া ফলো করেনি অথবা কম্প্রোমাইজড রিভিউ করেছিল। যে কারণে উক্ত বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত সবগুলো গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশক Hindawi প্রত্যাহার করেছিল।
এখানে উল্লেখ্য যে, Hindawi ২০২৩ নাগাদ প্রায় ৮,০০০ প্রবন্ধ প্রত্যাহার করেছে, যা ২০২২ সালে ছিল ৫০০-এর মতো। এ কারণে Wiley প্রায় ৪০ মিলিয়ন রেভিনিউ লস করেছে। এসবের মূলে হলো Main Journal-এর এডিটোরিয়াল টিমের বাইরে কয়েকশ গেস্ট এডিটর দিয়ে শতাধিক বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল Hindawi। এসব গেস্ট এডিটর জার্নালের যথাযথ নিয়ম না মেনে রিভিউ সম্পাদনা করে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করায় কয়েকশ গেস্ট এডিটরকে Hindawi ব্ল্যাকলিস্টেড করেছে। ফলে তারা আর এডিটোরিয়াল ও প্রকাশনা কাজে অংশ নিতে পারবে না।
২) এবার আসি দ্বিতীয় গবেষণা প্রকাশনা প্রত্যাহারের বিষয়ে। CRediT statement ফলো করে এখানেও আমি একজন Co-Author। এ গবেষণা প্রবন্ধের শিরোনাম Biomolecule protective and photocatalytic potential of cellulose supported MoS2/GO nanocomposite। এটিও সকল কনট্রিবিউটিং Authors যথাযথ মেথড, ডাটা অ্যানালাইসিস, ড্রাফটিং, এডিটিং ইত্যাদি সম্পন্ন করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় Bioinorganic Chemistry and Applications Journal-এর বিশেষ সংখ্যা (Synthesis of Bioinorganic Nanomaterials and their Cytoxic and Photodynamic Therapy Assessments)-এ Submit করা হয়। এ বিশেষ সংখ্যার গেস্ট এডিটর ছিলেন R. Lakshmipathy (India)। আমাদের প্রবন্ধটি সহ এ বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত সবগুলো গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশক Hindawi একইভাবে প্রত্যাহার করেছিল এবং রিভিউ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে এ বিশেষ সংখ্যার এডিটরকে Hindawi ব্ল্যাকলিস্টেড করে। এখানেও একই প্রশ্ন, অনিয়ম বা চৌর্যবৃত্তি ঘটলে একটা-দুইটা গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশক প্রত্যাহার করতে পারে, তা না করে সবগুলো প্রবন্ধ প্রত্যাহার করল প্রকাশক! বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত সবগুলো প্রবন্ধের Authors কি অনিয়ম বা চৌর্যবৃত্তি করেছে? নিশ্চয়ই না। তাহলে সবগুলো গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশক প্রত্যাহার করেছিল কেন? সবগুলো প্রবন্ধ প্রত্যাহার হওয়ার পেছনে দায় কার? এডিটর কি এ দায় এড়াতে পারে?
৩) ফিরে আসি গবেষণার মানদণ্ড নিয়ে। উক্ত বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত দুটি গবেষণা প্রবন্ধের মেথোডলজি ও ডাটা নিয়ে Main Author (First Authors) ও অন্যান্য Co-Authors-এর মূল্যায়নে সঠিক ছিল। রিভিউ ও এডিট করার সময় কোনো discrepancies ছিল না। যথাযথ মানদণ্ড মেনেই গবেষণা কাজ করা হয়েছিল। যেহেতু গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশের পর প্রত্যাহার হয়েছিল, যা নিয়ে আমরা খুবই বিব্রত ছিলাম। গবেষক হিসেবে বিষয়টি আমাদের কাছে অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। যেহেতু প্রত্যাহার হয়েছে, সেহেতু এ বিব্রতকর অবস্থা অমান্য করার সুযোগ গবেষক হিসেবে আমার বা আমাদের ছিল না। এথিক্যাল মানদণ্ড বজায় রেখেই এ যাবত গবেষণা কাজ করেছি। নিজের ল্যাবের গবেষণা কাজ, দেশে ও বিদেশের সঙ্গে যৌথভাবে (Collaboration) চলমান সকল গবেষণা কাজ এথিক্যাল মানদণ্ড বজায় রেখে পরিচালনা করব—এ দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছি। গবেষণা প্রবন্ধ নিয়ে অনিচ্ছাকৃত ও বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার জন্য মার্জনা প্রার্থী। গবেষণা বিষয়ে যেকোনো পরামর্শ ও পজিটিভ সমালোচনা সানন্দে গ্রহণ করব।
পরিশেষে আবারও বলি, প্রকাশিত গবেষণা কাজ অথেনটিক ছিল। কোনো অনিয়ম বা ম্যানুপুলেশন ছিল না। শুধুমাত্র গেস্ট এডিটরদের (যারা প্রকাশক কর্তৃক ব্ল্যাকলিস্টেড হয়েছে) compromised রিভিউ প্রসেসের কারণে উক্ত দুটি গবেষণা প্রবন্ধসহ জার্নাল দুটির বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত সবগুলো প্রবন্ধ প্রকাশক Hindawi প্রত্যাহার করেছিল। গবেষণা কাজের মান বিবেচনায় উক্ত কোলাবোরেটিভ আর্টিকেল দুটি যেকোনো ভালো মানের স্কোপাস ইনডেক্স জার্নালে প্রকাশিত হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্য! প্রকাশিত হয়ে প্রত্যাহার হওয়ায় তা করার সুযোগ ছিল না। পরিশেষে আবারও বলছি, এ গবেষণা কাজ কোনো paper mill work-ও ছিল না। এ কাজে ইচ্ছাকৃত কোনো অনিয়ম বা ব্যত্যয় ছিল না। এ নিশ্চয়তাটুকু রইল।
লেখক: অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মজিদ, ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগ, ঢাবি।
এআর