Dhaka Mail Logo

মতামত

ক্ষমতাবান মানুষের নৈতিক স্খলনে প্রাতিষ্ঠানিক দায় কতটুকু

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৪৭ পিএম

পত্রিকার পাতা উল্টালেই আজকাল একধরনের অস্বস্তি জেগে ওঠে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর কিংবা বেসরকারি অফিস—সব জায়গা থেকেই যেন একই রকম খবর ভেসে আসছে। ক্ষমতাবান মানুষের নৈতিক স্খলনের খবর, চরিত্রহননের খবর, অধীনস্থ মানুষকে হেনস্তা করার খবর। গত ৩১ জুলাই প্রথম আলোর অনলাইনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পড়ে মনটা ভারী হয়ে উঠেছিল। মেসেঞ্জারে এক ছাত্রীকে অশালীন বার্তা পাঠানোর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রভাবশালী অধ্যাপককে শেষ পর্যন্ত চাকরি হারাতে হয়েছে। খবরটা পড়ে মনে হলো, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। বরং এটা আমাদের প্রশাসনিক আর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর গভীরে অনেক দিন ধরে বাসা বেঁধে থাকা এক পুরোনো রোগেরই সর্বশেষ লক্ষণ।

এই রোগটা আসলে কী? সহজ করে বললে, যাঁর হাতে ক্ষমতা বেশি আর যিনি চেয়ারে বসে আছেন, তাঁর সঙ্গে অধীনস্থ মানুষটির মধ্যে যে বিশাল ফারাক থাকে, সেই ফারাকটাই কখনো কখনো অস্ত্র হয়ে ওঠে। ক্ষমতাবান মানুষটি জানেন, তাঁর কথার ওপর কথা বলার সাহস কারও নেই। আর যে শিক্ষার্থী বা অধস্তন কর্মীর ওপর দিয়ে এই হেনস্তা যায়, তিনি জানেন, প্রতিবাদ করলে ক্ষতিটা তাঁরই বেশি হবে—পরীক্ষার ফল খারাপ হতে পারে, চাকরি চলে যেতে পারে, সামাজিক ভাবমূর্তি নষ্ট হতে পারে। এই অসম সম্পর্কের ফাঁক গলেই জন্ম নেয় নিপীড়ন। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ লর্ড অ্যাকটনের একটা কথা এই প্রসঙ্গে বারবার মনে পড়ে—ক্ষমতা মানুষকে কলুষিত করে, আর অবাধ ক্ষমতা মানুষকে সম্পূর্ণভাবে কলুষিত করে ফেলে। কথাটা দেড় শ বছরের পুরোনো হলেও যেন আজকের বাংলাদেশের জন্যই লেখা।

আরও ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই ধরনের অপরাধীরা প্রায় সময়ই পার পেয়ে যান। একবার পার পেয়ে গেলে দ্বিতীয়বার একই কাজ করতে তাঁদের হৃদয় কাঁপে না। কারণ দৃষ্টান্তমূলক বিচার বা শাস্তি হয় না, বড়জোর সাময়িক বদলি বা লোকদেখানো একটা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, যার প্রতিবেদন অনেক সময় প্রকাশ্যেও আসে না। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই অপরাধীদের ক্রমশ বেপরোয়া করে তোলে। যে প্রতিষ্ঠানে অপরাধ করে পার পাওয়া যায়, সেই প্রতিষ্ঠান নিজের অজান্তেই অপরাধের প্রশ্রয়দাতা হয়ে ওঠে, আর এই প্রশ্রয়ের মূল্য শেষ পর্যন্ত চোকাতে হয় দুর্বল ওই মানুষটিকেই।

প্রশ্ন হলো, অপরাধ বা স্খলনের এই দায় কি শুধু ব্যক্তির? নাকি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থারও কিছু দায় আছে? নরওয়েজীয় সমাজবিজ্ঞানী ইওহান গালটুং একটা কথা বলেছিলেন, যা এখানে প্রাসঙ্গিক। তিনি দেখিয়েছিলেন, সহিংসতা শুধু একজন মানুষ আরেকজনকে সরাসরি আঘাত করলেই ঘটে না; কখনো কখনো ব্যবস্থার নিয়মকানুন আর প্রতিষ্ঠানের গঠনপ্রণালিই দুর্বল মানুষটাকে আরও দুর্বল করে রাখে, আর সুবিধাভোগীকে আড়াল করে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় কথাটা হাড়ে হাড়ে সত্য। একজন ক্ষমতাবান শিক্ষক বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা মানেই ভুক্তভোগীর জন্য একরকম যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়া—লোকলজ্জা, তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা, প্রতিষ্ঠানের সম্মানহানির দোহাই দিয়ে পুরো ঘটনা চাপা দেওয়ার চেষ্টা। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো একবার লিখেছিলেন, ক্ষমতাবান মানুষেরা নিজেদের অপরাধ ঢাকতে প্রায়ই নতুন এক গল্প বানিয়ে ফেলেন। এখানেও ঠিক তা-ই ঘটে—অভিযুক্তকে বাঁচাতে আর উল্টো ভুক্তভোগীকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে কত রকম গল্প যে তৈরি হয়, তার ইয়ত্তা নেই।

এই যে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক, যেখানে আস্থা আর শ্রদ্ধাই সবচেয়ে বড় ভিত্তি, সেই সম্পর্কটাই যখন এভাবে কলুষিত হয়, তখন ক্ষতিটা শুধু একজন ছাত্রীর হয় না, ক্ষতিটা হয় গোটা শিক্ষাব্যবস্থার। যে শিক্ষক আলো দেখানোর কথা, তিনিই যখন অন্ধকারের কারণ হয়ে ওঠেন, তখন পরের প্রজন্মের কাছে বিশ্বাসযোগ্য থাকার নৈতিক অধিকারটাই আমরা হারিয়ে ফেলি। একটা মেয়ে যখন প্রথমবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখে, তখন তার মনে একধরনের স্বপ্ন থাকে—শিক্ষকের কাছ থেকে জ্ঞান নেবে, নিজেকে গড়ে তুলবে। সেই স্বপ্নের জায়গাটাই যখন ভয়ের জায়গা হয়ে ওঠে, তখন শুধু একটা মানুষ নয়, একটা গোটা প্রজন্মের আস্থা ভেঙে পড়ে।

এই সংকট শুধু আমাদের দেশের একার নয়। উন্নয়নশীল অনেক দেশেই কর্মস্থল আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার এই অপব্যবহার একটা গভীর সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় দেখা যায়। তবে পার্থক্যটা তৈরি হয় জবাবদিহিতে। যেসব দেশে অভিযোগ করার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, যেখানে ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখার নিশ্চয়তা আছে, আর যেখানে অভিযুক্তের পদ যত বড়ই হোক, তদন্ত থেকে তিনি রেহাই পান না—সেসব জায়গায় ধীরে ধীরে হলেও মানুষ মুখ খোলার সাহস পায়। আমাদের দেশে এই আস্থাটুকু এখনো তৈরি হয়নি, আর সেটাই সবচেয়ে বড় ঘাটতি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০২৫ সালের জাতীয় খানা জরিপ বলছে, দেশে সেবা নিতে গিয়ে অন্তত একটি খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন—এমন খানার হার প্রায় ৫৪ শতাংশ, আর ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন প্রায় ৩৩ শতাংশ খানা। নারী সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে দুর্নীতির শিকার হওয়ার হার প্রায় ৪৭ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান সরাসরি যৌন হয়রানির চিত্র না দিলেও একটা কথা স্পষ্ট করে দেয়—প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিহীনতা কতটা সর্বব্যাপী, আর এই একই সংস্কৃতির মধ্যেই ক্ষমতাবানদের হাতে নারীর সম্মান বিপন্ন হওয়ার ঘটনাও ঘটে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি নিয়ে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) এক গবেষণায় দেখা গেছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৭ শতাংশ, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোতে ৭৬ শতাংশ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৬ শতাংশ এবং মেডিকেল কলেজে ৫৪ শতাংশ ছাত্রী কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

আইন কিন্তু একেবারে নেই, তা নয়। ২০০৯ সালে হাইকোর্টের একটা গুরুত্বপূর্ণ রায় আছে, যেখানে বলা হয়েছে, প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত পাঁচ সদস্যের একটা স্বাধীন কমিটি থাকতেই হবে, যার নেতৃত্বে থাকবেন একজন নারী। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে এই আইনি কাঠামোকে আরও শক্ত করতে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬ চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে, যেখানে ডিজিটাল মাধ্যমে হয়রানির শাস্তির পরিধিও বাড়ানো হয়েছে। কাগজে-কলমে এসব আইন বেশ শক্তপোক্ত শোনায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানেই এই কমিটির কথা কেউ জানেনই না। কমিটিতে কারা আছেন, অভিযোগ করলে গোপনীয়তা রক্ষা হবে কি না, পরে প্রতিহিংসার শিকার হলে কী সুরক্ষা মিলবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর অনেক প্রতিষ্ঠানেই নেই। ফলে কমিটি থেকে যায় শুধু কাগজে, বাস্তবে কখনো কার্যকর হয় না।

আর এই তথ্যের অভাব, এই অনিশ্চয়তাই আসলে ভুক্তভোগীকে সবচেয়ে বেশি একা করে দেয়। যিনি অভিযোগ করতে চান, তিনি জানেন না দরজাটা ঠিক কোথায়, ভেতরে গেলে সুরক্ষা মিলবে কি না, নাকি উল্টো নিজেকেই দোষী প্রতিপন্ন হতে হবে। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে চুপ করে থাকাটাই তখন নিরাপদ মনে হয়। অথচ চুপ থাকা মানেই পরের শিকারের জন্য পথ খুলে রাখা।

এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকাটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনাটাই যদি সংবাদমাধ্যমে না আসত, হয়তো সেই অধ্যাপক এখনো একই ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে থাকতেন। প্রতিটি প্রকাশিত প্রতিবেদন, প্রতিটি সাহসী সাংবাদিকতা আসলে একেকজন ভুক্তভোগীর হয়ে কথা বলার একটা সুযোগ তৈরি করে দেয়। কিন্তু শুধু সংবাদ প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ হয় না—প্রয়োজন সেই প্রতিবেদনের পেছনে প্রতিষ্ঠানের, প্রশাসনের আর গোটা সমাজের সচেতন পদক্ষেপ।

এতক্ষণের আলোচনা থেকে একটা কথা স্পষ্ট হওয়া দরকার। ব্যক্তির নৈতিক স্খলন অস্বীকার করার সুযোগ নেই—লালসা, চরিত্রহীনতা, ক্ষমতার নেশা, শেষ পর্যন্ত এগুলো একজন মানুষেরই সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তটা অপরাধে রূপ নেওয়ার সুযোগ পায় কোথায়? প্রতিষ্ঠানের ফাঁকফোকরেই। কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থা থাকলে, তদন্তে গড়িমসি না হলে, অভিযুক্তের পদমর্যাদা তদন্তকে প্রভাবিত করতে না পারলে—একই মানুষ হয়তো দ্বিতীয়বার এগোনোর সাহস পেতেন না। তাই এই সংকটে দায়ের বড় অংশটা শেষ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিকই। ব্যক্তি অপরাধ করে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক গাফিলতি সেই অপরাধকে সম্ভব করে তোলে, আর বারবার সম্ভব করে তোলে বলেই একই ঘটনা ঘুরেফিরে আসে। এই ফারাকটা বোঝা জরুরি, কারণ একজন অধ্যাপককে বরখাস্ত করলেই সংকটের সমাধান হয়ে যায় না—যতক্ষণ কাঠামোটা না বদলাচ্ছে, ততক্ষণ একই গল্প অন্য কোনো ক্লাসরুমে, অন্য কোনো দপ্তরে আবার লেখা হবে।

তাহলে সমাধান কোথায়? সাময়িক বদলি বা বরখাস্তের মতো দায়সারা শাস্তি দিয়ে এই রোগ সারবে না। দরকার রাজনৈতিক আর প্রশাসনিক সদিচ্ছা, যাতে আইনের প্রয়োগ হয় কঠোরভাবে, কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের হয়রানি প্রতিরোধ কমিটিকে কাগজের বন্দিদশা থেকে বের করে সত্যিকারের স্বাধীন আর জবাবদিহিমূলক করে তুলতে হবে, দরকার হলে বাইরে থেকে জেন্ডার বিশেষজ্ঞ এনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। আর সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো, প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি মানুষকে জানিয়ে দেওয়া যে অভিযোগ করলে তিনি একা পড়বেন না, তাঁর পাশে দাঁড়ানোর একটা বাস্তব ব্যবস্থা আছে।

পদের জোর দেখিয়ে অপরাধ করে পার পাওয়ার এই সংস্কৃতি এখনই ভাঙা দরকার। কারণ প্রতিটি নীরবতা আসলে পরের অপরাধের জন্য একটুখানি জায়গা করে দেয়। যে প্রতিষ্ঠান আজ চুপ করে থাকে, আগামীকাল সেই প্রতিষ্ঠানকেই আরেকজন ভুক্তভোগীর মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। সমাজ যদি সত্যিই বদলাতে চায়, সেই বদল শুরু করতে হবে এই নীরবতা ভাঙা দিয়েই, আজ থেকেই।

লেখক: মাহাবুবা আখতার, প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, পটুয়াখালী সরকারি কলেজ, পটুয়াখালী।

এআর/