০১ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৩১ পিএম
খবরের কাগজ খুললেই কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতা ওলটালে আজকাল যে খবরটি সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করে, তা হলো অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের জড়িয়ে পড়া নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মারামারি, আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে গ্যাং কালচার তৈরি, ছিনতাই কিংবা সহিংসতায় লিপ্ত হওয়া এখন নিয়মিত ঘটনা।
অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায়, কমবয়সি বা অপ্রাপ্তবয়স্কদের দ্বারা সংঘটিত এই ধরনের অপরাধমূলক আচরণকে বলা হয় ‘জুভেনাইল ডেলিনকুয়েন্সি’ বা কিশোর অপরাধ। অথচ একটি স্বাভাবিক বয়সে এই কোমলমতি শিশু-কিশোরদের হাতে থাকার কথা ছিল বই, খাতা, কলম কিংবা খেলার ব্যাট।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিশোর অপরাধ ও আলোচিত ‘ঐশী রহমান’ মামলা
বাংলাদেশের অপরাধবিজ্ঞানের ইতিহাসে কিশোর অপরাধ এবং আইনি দীর্ঘসূত্রতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা হলো ২০১৩ সালে ঐশী রহমানের দ্বারা সংঘটিত হত্যাকাণ্ডটি। পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও তার স্ত্রীকে নিজ বাসভবনে নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছিল তাদেরই অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যা ঐশীকে। এই ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি ছিল না, বরং এটি পুরো সমাজকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
আইনি বিতর্ক ও অপরাধবিজ্ঞান
ঐশী রহমানের মামলাটিতে অপরাধবিজ্ঞানের একটি বড় প্রশ্ন সামনে চলে আসে। তা হলো- অপরাধের সময় আসামির বয়স এবং তার মানসিক অবস্থা। দীর্ঘ আইনি লড়াই ও বয়স নির্ধারণের জটিলতার পর আদালত বিচার প্রক্রিয়া পরিচালনা করে। এই ধরনের কেসগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, অতিরিক্ত পারিবারিক অবহেলা, মানসিক অবসাদ এবং ভুল পন্থার সঙ্গে কিশোরদের সংযোগ কীভাবে তাদের চরম অপরাধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ
একটি শিশু জন্ম থেকেই অপরাধী হয়ে জন্মায় না। সমাজ এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি তাকে অপরাধের দিকে ধাবিত করে। আমাদের বর্তমান সমাজে কিশোর অপরাধের মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১. পারিবারিক বন্ধন ও নজরদারির অভাব: বর্তমান ব্যস্ত যান্ত্রিক জীবনে অনেক অভিভাবকই সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। পারিবারিক অশান্তি বা নজরদারির অভাবেই কিশোররা বিপথগামী হয়।
২. গ্যাং সংস্কৃতি ও নেতিবাচক প্রভাব: শহুরে জনপদ থেকে শুরু করে মফস্বলেও এখন ‘কিশোর গ্যাং’য়ের উপদ্রব বেড়েছে। সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া বা নিজেদের হিরো প্রমাণ করার অসুস্থ মানসিকতা তাদের অপরাধী করে তুলছে।
৩. প্রযুক্তির অপব্যবহার: কোনো রকম ফিল্টার বা বয়সসীমা ছাড়া ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহার এবং সহিংস ভিডিও গেমের আসক্তি তাদের মনে অপরাধপ্রবণতা তৈরি করছে।
উত্তরণের উপায়
কিশোর অপরাধ কেবল একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একক সমস্যা নয়, এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক সংকট। এই ব্যাধি রোধে কেবল সংশোধনাগার বা কঠোর শাস্তি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন:
# পরিবারে বাবা-মাকে সন্তানদের বন্ধু হতে হবে এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের যতœ নিতে হবে।
# শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক পড়ার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা ও কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
# কিশোরদের অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম কমিয়ে খেলাধুলা ও সৃজনশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে।
আগামীর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অপরাধের অন্ধকার জগৎ থেকে ফিরিয়ে এনে সঠিক পথে পরিচালিত করতে না পারলে একটি সুস্থ সমাজ গঠন করা অসম্ভব। তাই এখনই সম্মিলিতভাবে এই সামাজিক সংকটের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া জরুরি।
লেখক: শিক্ষার্থী, অপরাধবিদ্যা ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়