Dhaka Mail Logo

মতামত

ইন্টারনেট বন্ধ ও জুলাই ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান

০১ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৫ পিএম

২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একটি মাস, যা শুধু একটি ছাত্র আন্দোলনের জন্য নয়, রাষ্ট্র, প্রযুক্তি এবং নাগরিক অধিকারের সম্পর্ককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। 

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে উদ্ভূত সংকটের মধ্যে সরকার দেশব্যাপী মোবাইল ইন্টারনেট এবং পরে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়। সরকারি ব্যাখ্যা ছিল—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং সহিংসতা মোকাবিলা। কিন্তু বাস্তবে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে দেশের প্রায় প্রতিটি নাগরিকের জীবনে।

আজ প্রশ্ন উঠছে, ইন্টারনেট বন্ধের সেই সিদ্ধান্ত কি সংকট কমিয়েছিল, নাকি জনঅসন্তোষকে আরও বিস্তৃত করেছিল?

আধুনিক রাষ্ট্রে ইন্টারনেট আর বিলাসপণ্য নয়; এটি বিদ্যুৎ, পানি কিংবা টেলিফোনের মতো একটি মৌলিক অবকাঠামো। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যাংকিং, ব্যবসা, গণমাধ্যম, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পরিবহন, সরকারি সেবা—সবকিছুই এখন ডিজিটাল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ইন্টারনেট বন্ধ মানে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ নয়; একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশকে স্থবির করে দেওয়া।

জুলাইয়ে ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ার পর লাখো মানুষ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা স্বজনদের খবর জানার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। হাসপাতাল, ব্যাংক, ই-কমার্স, রাইড-শেয়ারিং, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ফ্রিল্যান্সিং এবং সফটওয়্যার রফতানি খাত বড় ধরনের বিঘ্নের মুখে পড়ে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি ছিল এক বড় ধাক্কা।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক ছিল তথ্যপ্রবাহের বিচ্ছিন্নতা। সংকটের সময় মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য। কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় মানুষ সরকারি ঘোষণাও সহজে জানতে পারেনি, আবার স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাইয়ের সুযোগও সীমিত হয়ে যায়। যখন নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রবাহ বন্ধ হয়, তখন গুজব ও আতঙ্ক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই বাস্তবতা শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও দেখা গেছে।

আমি, বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে, সেই সময় প্রকাশ্যে ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলাম। কারণ, এটি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে নয়; দেশের প্রতিটি মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীকে শাস্তি দেওয়ার সামিল ছিল। একজন শিক্ষার্থী যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি একজন ব্যবসায়ী, একজন চিকিৎসক, একজন সাংবাদিক, একজন প্রবাসী পরিবারের সদস্য কিংবা একজন সাধারণ নাগরিকও একইভাবে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।

একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহে ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত জনমনে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। অনেক নাগরিক, যারা শুরুতে আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না, তারাও নিজেদের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হতে দেখে ক্ষুব্ধ হন। 

ফলে আন্দোলন নিয়ে জনআলোচনা আরও বিস্তৃত হয় এবং সংকটটি কেবল শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি নাগরিক অধিকার, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এবং রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্নে রূপ নেয়।

অবশ্যই ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে এটিও বলতে হবে যে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ছিল বহু কারণের সমন্বিত ফল। প্রাণহানি, সহিংসতা, রাজনৈতিক অচলাবস্থা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জনঅসন্তোষ এবং ইন্টারনেট বন্ধ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়েছে। তাই ইন্টারনেট বন্ধই একমাত্র কারণ ছিল—এমন দাবি করা যথাযথ হবে না। তবে এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই যে এই সিদ্ধান্ত জনমতের গতিপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছিল।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ইন্টারনেট বন্ধের নজির রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট বন্ধ রাখার ফলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়ে। জাতিসংঘের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বহুবার মত দিয়েছে যে, ইন্টারনেটে প্রবেশাধিকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

বাংলাদেশ গত এক যুগে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' গড়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়েছে। সরকারি সেবা ডিজিটাল হয়েছে, অনলাইন ব্যবসা বেড়েছে, তরুণরা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন তথ্যপ্রযুক্তি খাতে। সেই বাস্তবতায় ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত এই অগ্রযাত্রার সঙ্গে সাংঘর্ষিক একটি বার্তা বহন করে।

জুলাই ২০২৪-এর অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে একটি মৌলিক শিক্ষা রেখে গেছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি নাগরিকের যোগাযোগের অধিকার, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সংকটের সময় প্রযুক্তি বন্ধ করার পরিবর্তে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে স্বচ্ছ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করাই হতে পারে অধিক কার্যকর পথ।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের আস্থা অর্জনের প্রধান উপায় হলো উন্মুক্ত তথ্য, জবাবদিহি এবং কার্যকর যোগাযোগ। ইন্টারনেট বন্ধ করে সাময়িকভাবে যোগাযোগ সীমিত করা সম্ভব হলেও জনমতের প্রশ্নকে বন্ধ করা যায় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও উদ্বেগ, ক্ষোভ এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

জুলাই '২৪-এর ঘটনাপ্রবাহ আজ ইতিহাসের অংশ। সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে যে কোনো জাতীয় সংকটে ইন্টারনেট বন্ধকে প্রথম নয়, বরং একেবারে শেষ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ একটি দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো বন্ধ হয়ে গেলে শুধু একটি নেটওয়ার্ক নয়, থেমে যায় মানুষের জীবন, অর্থনীতি, শিক্ষা এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের স্বাভাবিক যোগাযোগও।

জুলাই '২৪ আমাদের শিখিয়েছে—ইন্টারনেট কেবল প্রযুক্তি নয়; এটি গণতন্ত্র, অর্থনীতি এবং নাগরিক অধিকারেরও একটি অপরিহার্য ভিত্তি। সেই ভিত্তিকে অকারণে দুর্বল করা কোনো আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে কল্যাণকর হতে পারে না।

লেখক, সভাপতি, বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন 

এমআর/এআরএম