Dhaka Mail Logo

মতামত

কোটা থেকে গণঅভ্যুত্থান, তবু চাকরিতে বৈষম্য দূর করা কঠিন

ঢাকা মেইল ডেস্ক

৩১ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৭ পিএম

১৯৭১ সালের পর এদেশে অনেক গণআন্দোলন হয়েছে। বন্দুকের নলের সামনে আগে আবু সাঈদের মত কাউকে কখনও এমন বুক টান করে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। ‘ভাই পানি লাগবে কারও, পানি’ মুগ্ধের এ কথাটি এদেশের মানুষকে সারা জীবন কাঁদাবে। খাবার পানি আর বিস্কুট বিতরণের সময় একটি গুলি তার কপাল ভেদ করে কানের পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়, লুটিয়ে পড়ে রাস্তায়। জাতিসংঘের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের সময় ১৪০০ লোক নিহত হয়েছে। নিহতদের বেশির ভাগ ছাত্র, চাকরিপ্রত্যাশী, তরুণ ও শিশু-কিশোর। প্রতিটি মৃত্যই যেন এক একটা শোক গাঁথা।

আবু সাঈদ রংপুরের নীলগঞ্জ উপজেলার এক অজপারা গায়ের ছেলে। অর্থাভাবে দিনমজুরের ছেলের লেখাপড়া হওয়া দুঃসাধ্যই ছিল। টিউশনি করে নিজের পড়ার খরচ চালাতেন। আবু সাঈদ সারা বাংলাদেশের প্রতীক, গুটি কয়েক পরিবার ছাড়া প্রায় সবার অবস্থা আবু সাঈদের মত। এ দেশের লাখো শিক্ষার্থী কোনও না কোনও কষ্ট স্বীকার করে পড়াশুনা চালিয়ে যায়, একটি চাকরির আশায়, স্বপ্নের বাংলাদেশ গঠনের আশায়। স্বাধীনতার এত বছর পরও স্বচ্ছ ও প্রশ্নহীন নিয়োগ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারাটাই জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। চাকরির বাজারে আমাদের দেশে কয়েকটা প্রচলিত শব্দ আছে, যেমন ‘লাইনঘাট’, ‘সিস্টেম’,  ‘মামু খালুর’, সুপারিশ ও তদবির। যে কারণে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করে চাকরির জন্য এগুলোর সন্ধানে ব্যস্ত থাকে। সবচেয়ে বড় বৈষম্য কোটা প্রথা ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে কিছুটা সমাধান হলেও বৈষম্যের অন্যান্য বড় বড় উপাদানগুলো বিদ্যমান থাকায় চাকরির বাজারের  বৈষম্য দূর করা নিয়ে অনেকের মনে সংশয় আছে।

পরাধীনতা, সার্বিক পরিবেশ আর সিস্টেমের কারণে সুদূর অতীত কাল থেকে এ দেশের মানুষের চাকরি ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ আর উন্নয়ন খুব কমই কপালে জুটেছে। সেই সেন, সুলতানি, মোঘল যে আমল বলি না কেন; বাংলার শাসকরা তেমন কেউ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর  ছিল না। সেই সময়ের শাসক বা রাজাবর্গরা সাথে করেই উজির-নাজির, পাক-পেয়াদা, সৈন্যসামন্ত ও অন্যান্য জনবল নিয়ে আসত। অধিকাংশ চাকরি করে অর্থ উপার্জন করে এ দেশ থেকে চলে যেত। মুসলিম শাসকরা প্রায় ৫০০ বছর বাংলা শাসন করলেও বাংলার স্থানীয় নব্য মুসলিমদের তেমন কোনো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সুযোগ-সুবিধা ছিল না। নিভৃত পল্লীর অতি দরিদ্র নব্য মুসলিমরা তেমন কোনো চাকরি বা কর্মসংস্থানের বা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সুযোগ তাদের ধর্মের অনুসারী শাসকদের কাছ থেকে পেয়েছে, তার প্রমাণ খুবই কম মেলে। বিশ্বখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতার বিবরণ থেকে জানা যায়, যদি কেউ অতি উৎসাহী হয়ে মুসলিম শাসকদের সাথে দেখা করত তাহলে তাদের রাজদরবার হতে শুধু একটা আলখাল্লা পোশাক ধরিয়ে দেওয়া হতো।

ইংরেজ আমলের প্রথম দিকে চাকরির অবস্থা প্রায় আগের মতো অর্থাৎ সব চাকরি ইংরেজদের ছিল। তবে, পরবর্তী সময়ে কৌশলগত কারণে স্থানীয়দের কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়। তবে এ ক্ষেত্রে ইংরেজরা চরম বৈষম্যমূলক নীতি অনুসরণ করে। প্রশাসনে নিজেদের অনুগত ব্যক্তিদের তারা অগ্রাধিকার দিত।  জমিদারি প্রথার মাধ্যমে স্থানীয় প্রভাবশালী পরিবারগুলো ক্ষমতা ও সুবিধা পেত।  ইংরেজ আমলে মুসলিম ও তফসিল হিন্দু চাকরিজীবী খুঁজে পাওয়া বেশ দুষ্কর ছিল। সংখ্যায় মুসলমানরা ছিল বাংলার সংখ্যাগুরু কিন্তু তারপরেও পশ্চিমবাংলা তো বটেই খোদ পূর্ব বাংলাতেও স্কুল-কলেজ-অফিস-আদালতে মাত্র ৫ থেকে ১০% কর্মকর্তা/শিক্ষার্থী মুসলিম ছিল।  এদেশের দরিদ্র মুসলিমদের চাকরির অবস্থা যখন একেবারে তলানিতে ঠেকে ছিল, তখন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের উদ্যোগে ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে সম্পাদিত হয়েছিল বেঙ্গল প্যাক্ট। পিছিয়ে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য জনসংখ্যার ভিত্তিতে চাকরি প্রাপ্তির কিছু শর্ত চুক্তিতে উল্লেখ করেন। তবে ১৯২৫ সালে চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যু ফলে চুক্তিটি আর বাস্তবায়িত হয়নি। সামাজিক পরিবেশ আর সিস্টেমের কারণে পাকিস্তান আমলে চাকরি চলে যায় পাকিস্তানিদের বিশেষ করে পাঞ্জাবিদের হাতে। আশা করা হয়েছিল, স্বাধীনতার পর এদেশে কোনো বৈষম্যের ঝামেলা থাকবেনা কিন্তু  সেটা আর বাস্তবে পরিণত হয়নি।

চাকরিতে বড় বৈষম্য সৃষ্টি করে ছিল কোটা প্রথা

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেখা যায়, সমাজের অনগ্রসর অংশের মানুষের জন্য কিছু কোটা থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে তরুণদের চাকরি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বৈষম্য সৃষ্টি করে ছিল অযৌক্তিক কিছু কোটা। বিশেষ করে স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরেও ৩০ % মুক্তিযোদ্ধা কোটা। এর সাথে অন্যান্য কোটা যুক্ত হয়ে সরকারি চাকরির ৫০% এর বেশি বরাদ্দ ছিল বিশেষ মানুষদের জন্য। কোটার বাইরের চাকরি গুলোর পিছনে সক্রিয় থাকত আঞ্চলিকতা, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ, তদবির, ঘুষ, তোষামোদ, সিন্ডিকেট, প্রশ্ন ফাঁস, দুর্নীতি, পক্ষপাতিত্ব আর সুপারিশ। যে কারণে এ দেশের সাধারণ মানুষের সরকারি চাকরি প্রাপ্তির সুযোগ এক প্রকার বন্ধ হয়ে গিয়ে ছিল।

Kota
চব্বিশে কোটাবিরোধী আন্দোলন। ছবি: সংগৃহীত

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কোন ভাবে অসম্মান করার সুযোগ নেই কেননা তাদের আত্নত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি  একটি স্বাধীন ভূখণ্ড ‘বাংলাদেশ’।  পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধের মত যুদ্ধে যারা অংশ গ্রহণ করে বিজয়ী হওয়ার পর তাদেরকে আত্তীকরণ বা রাষ্ট্রের কাজে লাগানো হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সক্ষমতা না থাকার পরও ১৯৭১ সালের পর অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে আত্তীকরণ বা রাষ্ট্রের কাজে লাগানো হয়। তাছাড়া সরকারিতে চাকরিতে ৩০ শতাংশ কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়।  বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে মারা গেছেন আর বাকিরা বৃদ্ধ হয়ে গেছেন, চাকরির বয়স নেই। যে কারণে তাদের সন্তানদের এক সময় এই সুবিধার আওতায় আনা হলে বিষয়টি নিয়ে তেমন প্রশ্ন ওঠেনি। তবে নতুন করে  নাতি-নাতনি, পুতা-পুতনি ও  বংশধরদের কোটা সুবিধার আনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধা কোটা শেষ পর্যন্ত দলীয়করণের ও স্বজনপ্রীতির আখড়ায় পরিণত হয়ে ছিল। স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময়ের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে একটা স্বচ্ছ মুক্তিযোদ্ধার তালিকা না দিতে পারা। মুক্তিযোদ্ধার তালিকা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতি-দুর্নীতির খবর গণমাধ্যমে কম আসেনি। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেও অনেকে এই তালিকায় ঢুকে পড়েছে, আবার অনেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেও ওই তালিকায় নাম লেখাতে পারেনি। একাধিক সরকার একাধিকবার মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রণয়ন করলেও তা নিয়ে বিতর্কের অবসান হয়নি। সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে তালিকাও বদল হয়েছে। একেক সময়ে তৈরি করা হয়েছে একেক রকমের মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা। অনেক মুক্তিযোদ্ধা অমুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন, আবার অনেক অমুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেছেন মুক্তিযোদ্ধা। এ নিয়ে রয়েছে হাজার হাজার মামলা।

২০২৩ সালের হিসাব  অনুযায়ী, গেজেটভুক্ত মোট বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দুই লাখ ৩৮ হাজার ৮৪১ জন। তখন দেশে জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৯৮ হাজার ৫৪১ জন। দেশের মোট সরকারি চাকরির ৩০ ভাগ যদি ঐ পরবারগুলো পরিবার পায় তবে  দেশের ১৮ কোটি মানুষের পরিবারের জন্য শতকারা কত ভাগ অবশিষ্ট থাকে সেটা দেখার বিষয় ছিল।  

বিষয়টি আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অবমাননাকরও ছিল বটে। তারা কোনো কিছু প্রাপ্তির আশায় নয় বরং দেশের জন্য, দেশের মানুষকে ভালোবেসে, বৈষম্যহীন সমাজ উপহার দেওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটই নেননি। অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা, তাদের পরিবার ও সন্তানেরা এই কোটার বিরুদ্ধে কথা বলছেন যেটা বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে। তাছাড়া কোটার কারণে সরকারি অফিস-আদালতে কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়ে সরকারি কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হয় বলে অনেক অভিযোগও অনেক সময় এসে ছিল। শেষ পর্যন্ত কোটা বিরোধী আন্দোলন ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানে রুপ নেয় ও কোটা প্রথার বিলুপ্তি ঘটে। 

স্বজনপ্রীতি ও আঞ্চলিকতা

বাংলাদেশের প্রায় ৯৮/৯৯ ভাগ মানুষ একই জনগোষ্ঠীর অর্থাৎ বাংলার মানুষ বা বাঙালি, আর জাতীয়তায় সবাই বাংলাদেশি। একই রক্ত, একই রকম চেহারা, একই ভাষাসংস্কৃতি, একই উৎপাদন ব্যবস্থা, জীবনপ্রণালী, খাদ্য-খাবার, পোশাক-পরিচ্ছদ, একই আকাশ নিচে একই আবহাওয়ায় বসবাস, সব কিছু একই। তবে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের স্বজনপ্রীতি ও আঞ্চলিকতার মত কিছু নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য এ দেশের অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।  উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, চাকরিপ্রাপ্তি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিশেষ জেলা, বিশেষ অঞ্চল, বিশেষ দল, বিশেষ আদর্শ, প্রভাবশালীর এলাকা অনেক বেশি প্রধান্য পায়। অনেক নিয়োগের ক্ষেত্রে এলাকা বা জেলা ভিত্তিক সুনির্দিষ্ট আসন থাকা থাকলেও তা একেবারে উপেক্ষা করা নতুন কিছু নয়। কোনো নিয়ম-নীতি, সাবজেক্ট, নিরপেক্ষভাবে যাচাই-বাছাই, পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতার তোয়াক্কা করা হয় না। এটাই এ দেশের মানুষের অতীত অভিজ্ঞতা  যে সব এলাকায় মন্ত্রী বা গুরুত্বপূর্ণ পদের লোক থাকে, সে সব এলাকায় বেশি উন্নয়ন হয়, সে সব এলাকার লোক বেশি চাকরি-বাকরি ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকে।

শুধু সরকারি নয় বেসরকারি খাতেও স্বজনপ্রীতি ও আঞ্চলিকতা মহামারি আকার ধারণ করতে দেখা যায়। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপ বাংলাদেশের ব্যাংক খাত থেকে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা অবৈধভাবে ঋণ নেয়। শুধু ঋণ নয়, এস আলম গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ নেয় দেশের কয়েকটি ব্যাংকও। ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মনীতি উপেক্ষা করে কয়েক হাজার কর্মকর্তা–কর্মচারী নিয়োগ দেয়  যার প্রায় সবাই ছিল এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের নিজ উপজেলার।

এদেশে ‘সাপ-লুডুর নীতি’ অনুসরণ করে জ্যেষ্ঠদের ডিঙ্গিয়ে ও যোগ্যতা বিবেচনা না সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি দেওয়া নতুন কিছু নয়। দেখা গেছে, ঢাকা মহানগর পুলিশের অধিকাংশ থানার ওসি ও ইনস্পেক্টরের বাড়ি একটি বিশেষ এলাকার ও বিশেষ রাজনৈতিক দলের সাবেক কর্মী।

স্বজনপ্রীতি ও আঞ্চলিকতার সবচেয়ে খারাপ দিক, যারা এই সুবিধা পায় তারাও আবার তাদের আত্মীয়-স্বজন, অঞ্চল বা আদর্শের লোক নিয়ে হাজির করে। এটা গাণিতিক হারে বাড়তে থাকে এবং এই কারণে দেখা যায় দেশের অনেক এলাকা দিন দিন অনেক পিছিয়ে পড়ছে।

তদবির ও সুপারিশ প্রথা

চাকরিতে বৈষম্য দূর করার অন্যতম বড় বাধা হলো সুপারিশ প্রথা। মন্ত্রী, এমপি, জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালীরা চাকরির জন্য কাউকে সুপারিশ করাকে ফ্যাশন ও দায়িত্ব মনে করে। দেখা যায় যোগ্যতা, দক্ষতা ও মেধার পরিবর্তে সুপারিশের পিছনে থাকে রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত ও আত্মীয়তার সম্পর্ক,  আর্থিক বা অন্য কিছু প্রাপ্তি। এতে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হয়।

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ করে পুলিশ প্রশাসনে নিয়োগের ক্ষেত্রে হাতে গোনা কয়েকটি জেলার আধিক্য ছিল বেশি। আবার বাদবাকি জেলা গুলো থেকে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রেও আবার মন্ত্রী, স্থানীয় এমপি ও জনপ্রতিনিধিদের সুপারিশ বাধ্যতামূলক ছিল- এমনও অভিযোগ রয়েছে। এই সুপারিশ প্রথার ধারা অব্যাহত আছে বলে অনেকের অভিযোগ।

দলীয়করণ

বাংলাদেশে এটাই চিরাচরিত প্রথা, যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, প্রতিষ্ঠানগুলো স্বচ্ছ না করে সব জায়গায় নিজেদের লোক বসানোর কাজটি করেছে।  আমাদের দেশে বেশ কিছু বড় রাজনৈতিক পরিবার আছে যাদের দেশে কর্মী, সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীর অভাব নেই, যে কোন স্থানের ২/৪ জন লোকের মধ্যে তাদের দলের লোক পাওয়া যায়। এমন অবস্থায় নিয়োগ স্বচ্ছ না করে যখন দলীয়করণের নামে কিছু লোকদের নিয়োগ দেওয়া হয় তখন মুলত দেশের জনগণ বা তাদের সাধারণ কর্মী-সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরাই বঞ্চিত হয়। আমাদের দেশে সরকারগুলো যে কারণে জনপ্রিয়তা হারিয়েছে তার মধ্যে অন্যতম কারণ দলীয়করণ ও তাদের নিয়োগ দেওয়া লোকদের লাগামহীন অপকর্ম। অথচ লক্ষণীয় যে, অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরিবর্তে প্রায় সব সরকারই ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার স্বপ্নে দলীয়করণের  চর্চা আরও বেশি বাড়িয়ে দেয়। 

Kotha2
আজও নিশ্চিত হয়নি মেধার যথাযথ মূল্যায়ন। ছবি: সংগৃহীত

স্বচ্ছ ও প্রশ্নহীন প্রতিষ্ঠানের অভাব

চাকরি সীমিত, সবাই পাবে এমন হতে পারে না। তবে এমন একটা স্বচ্ছ ও প্রশ্নহীন প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থার প্রয়োজন যার ওপর তরুণরা আস্থা স্থাপন করতে পারবে। পড়াশোনা বা যোগ্যতা থাকলে চাকরি হবে, তা না হলে নয়, এমনটাই জাতির জন্য কল্যাণকর। যারা সরকারি চাকরি পায়না তারা অন্য চাকরি বা কাজ করে দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কেননা সব কাজের মূল্য ও মর্যাদা আছে।

দুর্নীতি ও প্রশ্নপত্র ফাঁস

চাকরির বাজারে গড়ে উঠে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের চক্রসহ নানা ধরনের সিন্ডিকেট। সবচেয়ে লোভনীয় বিষয় নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস করা। পিএসসির সাবেক এক চেয়ারম্যানের গাড়িচালক আবেদ আলীসহ অন্যান্য কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে এক সময় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়ে ছিল। কোনো সময়ে কোনোভাবেই এসব চক্র বা সিন্ডিকেটের সদস্যদের দমন করা যায়নি। এদের নেপথ্যে থাকে প্রভাবশালীরা ও তাদের ঘনিষ্ঠজন। যারা ঘোষিত আর অঘোষিত নিয়ন্ত্রক হয়ে শত শত কোটি টাকা কামিয়ে নেয়। প্রশ্নপত্র ফাঁস বা সিন্ডিকেট কোটা ব্যবস্থার চেয়ে আরও খারাপ। কোটার কারণে হয়ত উল্লেখযোগ্য অংশ চাকরি বেহাত হয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস বা সিন্ডিকেটের কারণে শতভাগ চাকরি মেধাহীনদের হাতে চলে যেতে পারে। কোটার মাধ্যমে চাকরি পাওয়া ব্যক্তি অনেক সময় হয়ত দুর্নীতি বা অপকর্ম নাও করতে পারে কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস বা সিন্ডিকেট বা দুর্নীতির মাধ্যমে চাকরি পাওয়া ব্যক্তিরা দুর্নীতি আর অপকর্মে ডুবে থাকবে এটাই স্বাভাবিক।

সমতার অভাব

আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে সর্ব ক্ষেত্রে সমতা সৃষ্টি করতে না পারলে চাকরির বাজারে বৈষম্যহীন ব্যবস্থা আনা খুবই দুষ্কর। অনেক কিছু আইনে, নিয়মে বা কাগজে থাকে কিন্তু বাস্তবে তার দেখা মেলে না। মেধা নিয়ে কেউ জন্মগ্রহণ করে না। মেধা তৈরি হয়। মেধাবী হওয়ার ও চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা করার সবাই যেন সমান সুযোগ পায় সেটাও বিবেচনার বিষয়। এদেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ এখনো দারিদ্র সীমার নিচে বাস করে। অনেকের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থাকে না, অনেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ না করেই ঝরে পড়ে। অনেকে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারে না, আর পারলেও উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায় না। লক্ষ কোটির বাজেটে অনেকের জন্য শিক্ষার জন্য বরাদ্দ থাকে জিরো টাকা। তাদের কাছে কোটা আর মেধা সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন বিষয়।

অসন্তোষ থেকে গণআন্দোলন

দেশে চাকরির বাজারের অবস্থা খুবই করুণ। দেশে হুহু করে বেড়ে চলেছে শিক্ষিত বেকার। বিষয়ভিত্তিক জবমার্কেট নেই। অন্ধগলির এই সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে ছুটতে হতাশায় উচ্চশিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম। যে কারণে চাকরির বাজার অনেক  প্রতিযোগিতামুলুক। একটা পদের বিপরীতে শত শত প্রার্থী। প্রতিযোগিতায় কেউ কারও ছাড় দেয় না।

আবার দেশে সুযোগ না থাকার কারণে মেধাবীদের অনেকে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। আমরা যদি এদেশের মেধাবীদের ধরে রাখতে না পারি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ যে অন্ধকার তাতে কোন সন্দেহ নেই। আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন এত উন্নত! কারণ তারা শুধু নিজেদের মেধাবীদের ও সম্পদ ধরে রাখেনি; তারা এমন ব্যবস্থা করেছে যেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মেধাবীদের সেখানে যেতে হয়।

তরুণরাই দেশের ভবিষ্যৎ অতএব তাদের মনে যেন কোন ধরনের অবিশ্বাস ও অসন্তোষের দানা না বাঁধে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। শুধু কোটা নয় চাকরিতে বৈষম্যে সৃষ্টির অন্যান্য বড় বড় উপাদানগুলো দূর করা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের ছাত্র ও নতুন প্রজন্মের আন্দোলন থেকে অনেক শিক্ষা নেওয়ার বিষয় আছে। অবিশ্বাস, অসন্তোষ, লুকোচুরি, অবহেলা ও অবমুল্যায়নের মত বিষয় থেকে তরুণরা যে কোন সময়ে আন্দোলনে নামতে পারে, অতি দ্রত সময়ে ঘটনার মোড় ভিন্ন দিকে যেতে পারে। বিক্ষোভের প্রবল আঘাতে হয়ত কোন এক সময় সব কিছু তাসের ঘরের মত সব ভেস্তে যেতে পারে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী