ঢাকা মেইল ডেস্ক
৩১ জুলাই ২০২৬, ০২:৩১ পিএম
মালয়েশিয়া থেকে পাঁচ হাজার এবং বাংলাদেশ থেকে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সম্মত হয়েছে বলে সম্প্রতি জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী। এই অগ্রগতিকে মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে মালয়েশিয়ার বিশেষত প্রধানমন্ত্রী দাতুক সিরি আনওয়ার ইব্রাহিমের শক্তিশালী কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিবাচক ফলাফল হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। আনোয়ার ইব্রাহিম এও বলেছেন, 'মিয়ানমারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের বিষয় সতর্ক কূটনীতির মাধ্যমে সমাধান করতে হয়।‘
রোহিঙ্গা সংকট কেবল একটি শরণার্থী সমস্যা নয়; এটি একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম জটিল মানবিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংকট। জাতিগত নিপীড়ন, রাষ্ট্রহীনতা, নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিতকরণ এবং ধারাবাহিক সহিংসতার ফলে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা নিজ দেশ থেকে বিতারিত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। নির্মম অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার এসব মানুষের সিংহভাগ আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশে।মানবিক মূল্যবোধ, প্রতিবেশীসুলভ দায়িত্ববোধ এবং আন্তর্জাতিক নৈতিকতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলাদেশ ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এই সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি আজও।
এমন প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ঘোষণা নতুন করে আশার আলো জ্বালিয়েছে- এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।যদি তার এই ঘোষণা বাস্তবায়িত হয়, তবে তা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো তাদের নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। কারণ অনির্দিষ্টকালের জন্য এত বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর দায়ভার বহন করা বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের পক্ষে এক গুরুতর চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ এই দায়িত্ব পালন করছে মানবিক কারণে; কিন্তু এই মানবিকতাকে স্থায়ী সমাধানের বিকল্প হিসেবে দেখা হলে তা হবে বাংলাদেশের প্রতি অবিচার।
বাস্তবতা হলো, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ, পরিবেশ এবং নিরাপত্তার ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে এবং সীমিত সরকারি সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব বাস্তবতা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক সহায়তা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। শুরুতে যে বৈশ্বিক সহমর্মিতা ও আর্থিক সহযোগিতা দেখা গিয়েছিল, বর্তমানে তা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। ফলে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণেও নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে হতাশা, বেকারত্ব এবং চরমপন্থার ঝুঁকি বাড়তে পারে, যার প্রভাব আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।
তাই তিন লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়ার সম্ভাব্য ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা তবে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, স্বাধীন চলাচল, ভূমির অধিকার এবং বৈষম্যহীন জীবনযাপন ইত্যাদি বিষয়গুলো ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাধান করে তাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ বাংলাদেশ নয়; বরং এর উৎপত্তি মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রনীতি। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের কার্যত নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়। এরপর কয়েক দশক ধরে তাদের চলাচল, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, বিবাহ এবং সম্পত্তির অধিকার পর্যন্ত নানা বিধিনিষেধের মধ্যে রাখা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সময়ে সামরিক অভিযান, সহিংসতা এবং জাতিগত নিপীড়নের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। অতএব এ সমস্যা সমাধানের মূল দায়িত্ব মায়ানমারের।
পূর্ণ নাগরিক মর্যাদা ও সকল নাগরিক সুযোগ সুবিধাসহ তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ, বিশেষ করে শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (UNHCR) এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM)-এর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া বৃহৎ পরিসরে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম পরিচালনা করা খুব সহজ হবে বলে মনে হয়না। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় স্বাধীন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক থাকা জরুরি, যাতে প্রত্যাবাসিত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতা বাস্তবে নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা যায়।
আসিয়ানের ভূমিকাও এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, সংলাপভিত্তিক আঞ্চলিক কূটনীতি ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। যদি মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং অন্যান্য আসিয়ান সদস্যরাষ্ট্র সমন্বিতভাবে মিয়ানমারের সাথে গঠনমূলক কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রাখে, তাহলে আরও বড় পরিসরে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের সম্ভাবনা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশকেও এখনই একটি সুস্পষ্ট কূটনৈতিক রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।প্রত্যাবাসনের আগে প্রত্যেক রোহিঙ্গার পরিচয় যাচাই, নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা, বসতভিটা পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সূচি নিশ্চিত করার দাবি আরও জোরালোভাবে উত্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ, ওআইসি, কমনওয়েলথ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে, যাতে এই সংকট আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে হারিয়ে না যায়।
মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কেবল একটি মানবিক কর্মসূচি নয়; এটি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই শান্তির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি বিষয়। তাই কোনো রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, বরং কার্যকর বাস্তবায়নই হবে সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড।
মিয়ানমারের সামরিক সরকার কিংবা ভবিষ্যতের যেকোনো সরকারকে বুঝতে হবে, কেবল আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর জন্য সীমিতসংখ্যক রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। তাদের এমন একটি রাজনৈতিক ও আইনি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে রোহিঙ্গারা নিজেদের মাতৃভূমির পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে সক্ষম হন।
বাংলাদেশকে একদিকে যেমন প্রত্যাবাসনের বিষয়টিকে স্বাগত জানাতে হবে, অন্যদিকে কোনো ধরনের তাড়াহুড়ো বা অপর্যাপ্ত নিশ্চয়তার ভিত্তিতে প্রত্যাবাসনে সম্মতি দেওয়া যাবে না। প্রত্যেক প্রত্যাবাসিত রোহিঙ্গার নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, বসতভিটা পুনরুদ্ধার, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে যাচাইযোগ্য হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশকে জাতিসংঘ, ওআইসি, আসিয়ান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য প্রভাবশালী অংশীদারদের নিয়ে একটি সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সমস্যা হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচার এবং সামগ্রিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বৈশ্বিক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরতে হবে। এতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সহজ হবে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সেই প্রক্রিয়াকে সুসংগঠিত, স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার মতো আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে, যাতে প্রত্যাবাসন একটি যৌথ আঞ্চলিক উদ্যোগে পরিণত হয়।
এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক আচরণ যেমন আন্তর্জাতিক আইনের দাবি, তেমনি আশ্রয়দানকারী বাংলাদেশের জনগণের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিবেচনায় থাকা উচিত। মানবিকতার দায় কেবল বাংলাদেশের একার নয়; এটি সমগ্র বিশ্বের যৌথ দায়িত্ব।
রোহিঙ্গারা যেন তাদের জন্মভূমিতে নিরাপদে ফিরে যেতে পারেন, বাংলাদেশ যেন দীর্ঘদিনের এই মানবিক ও অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্তি পায় এবং মিয়ানমার যেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারে—এই তিনটি লক্ষ্যই পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের একমাত্র পথ হলো স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে পর্যবেক্ষিত প্রত্যাবাসন। এখন দেখার বিষয়, কূটনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবতার মাটিতে কতটা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়।
লেখক: ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক এবং মানবাধিকার কর্মী