Dhaka Mail Logo

মতামত

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দানকৃত অর্থ আত্মসাৎ মেনে নেওয়া যায় না

১৭ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৯ এএম

হযরত শাহজালাল (রহ.) ছিলেন বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে মহান, তেজস্বী ও দয়ালু একজন আউলিয়া—যার নামে আজও সিলেটের মাটি আলোকিত। ছোটবেলায় হযরত শাহজালাল ও শাহপরান (রহ.)-এর জীবনী পড়েছি। তাদের অলৌকিক জীবন ও কর্ম ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

হযরত শাহজালাল (রহ.) ছিলেন লম্বা, পাতলা, ফর্সা বর্ণের; বার্ধক্য সত্ত্বেও তার চেহারায় ছিল এক অপরূপ দীপ্তি। তিনি গুহায় বাস করতেন, কোনো ধন-সম্পদ সংগ্রহ করেননি—শুধু একটি ছাগল পালন করতেন দুধের জন্য। তার সমগ্র জীবন ছিল পুরোপুরি সাধনময়, সাদাসিধে ও নির্মল। নিজের জন্য কোনো সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কখনো কামনা করেননি, কিন্তু অন্যের দুঃখে নিজেকে ভুলে যেতেন। নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের পাশে সবসময় দাঁড়াতেন; তার অসীম ভালোবাসা ও দয়ার প্রভাবে শত শত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছেন—কাউকে কখনো জোর করেননি।
 
ইয়েমেন থেকে হাজার মাইল পথ পায়ে হেঁটে তিনি এসেছেন সিলেটে। আল্লাহর পথে কোনো ভয়, কোনো কষ্ট তাকে কখনো টলাতে পারেনি। তার সাথে ছিলেন আরও ৩৬০ জন আউলিয়া; তাদের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি এখানে শান্তি ও ধর্মের আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন।
 
হযরত শাহপরান (রহ.) ছিলেন হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মামাতো ভাগ্নে—তার বোনের সন্তান। তারা ছিলেন একে অপরের আত্মিক গুরু এবং সবচেয়ে বিশ্বস্ত অনুচরও। মামা-ভাগ্নের এই গভীর ভক্তি ও অদম্য তেজ একই স্রোতে প্রবাহিত হয়েছে সিলেটের পবিত্র মাটিতে।
 
একবার হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতে যাওয়ার স্মৃতি এখনও আমার মনে একেবারে স্পষ্ট। সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক থেকেই আমি জুতা খুলে হাতে তুলে নিয়েছিলাম। মনে তখন ভয় ও শ্রদ্ধা মিশে ছিল—কোনোভাবে বেয়াদবি হয়ে যায় কি? কোনো অনুচিত কাজ করে বিপদে পড়ি নাকি? পূর্ণ অজু করে বারবার দরুদ শরীফ পাঠ করতে করতে ভক্তি ও শ্রদ্ধায় ভরে মাজার জিয়ারত করেছি। জিয়ারত শেষে পিছন দিকে হেঁটে ধীরে ধীরে মাজার এলাকা থেকে নেমে মূল রাস্তায় এসে জুতা পরেছিলাম। সবার কাছে শুনেছি হযরত শাহপরান (রহ.) ছিলেন অত্যন্ত তেজস্বী এক আউলিয়া—এই ভয়টাও কাজ করছিল মনের কোণে।
 
কিন্তু কিছু ঘটনা আমাকে বারবার বিচলিত করে। এই পবিত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দানকৃত অর্থ আত্মসাৎ করার যে কলঙ্কিত ঘটনা ঘটছে, তা কখনোই মেনে নিতে পারি না। এই মাজারের তথাকথিত ‘খাদেম’ নামধারী কিছু অসাধু লোক কীভাবে এখানে আসা ভক্তদের দান-অর্থ, মানতের টাকা নিজেরা ভোগ করে নেয়? সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা-ভক্তি দিয়ে সংগ্রহ হওয়া এই সম্পদ যেখানে মাজারের রক্ষণাবেক্ষণ, দরিদ্রদের সাহায্য ও ধর্মীয় কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় হওয়ার কথা, সেখানে কীভাবে তা তাদের নিজেদের পকেটে চলে যায়—এই হিসাব আমি কখনোই মেলাতে পারি না। তাদের এই কাজ শুধু লুটতরাজই নয়, লক্ষ লক্ষ ভক্ত মানুষের গভীর বিশ্বাসের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতাও বটে।

মাজারের দান-অর্থ কোথায় ও কার কাছে থাকা বিধানসম্মত—এ বিষয়ে সবার সচেতন হওয়া জরুরি। কখনোই এই টাকা কারো ব্যক্তিগত কাছে বা বাড়িতে রাখা যাবে না। সমস্ত দান-অর্থ সরকারি বা তফসিলি ব্যাংকের যৌথ নামের অ্যাকাউন্টে জমা রাখতে হবে। দানবাক্স বা ‘ডেগে’ দীর্ঘসময় নগদ টাকা রাখা যাবে না; নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে তা গণনা করে সরাসরি ব্যাংকে জমা দিতে হবে। কোনো একক ব্যক্তি—এমনকি দীর্ঘদিনের খাদেমেরও—এর একক নিয়ন্ত্রণে থাকা বৈধ নয়। সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকবে একটি স্বচ্ছ মাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির হাতে, যেখানে সদস্য থাকবেন:
 
- স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি (জেলা প্রশাসক বা সহকারী কমিশনার)
- ওয়াকফ প্রশাসনের প্রতিনিধি (যদি মাজারটি ওয়াকফ সম্পত্তি হয়)
- স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, যোগ্য ধর্মীয় নেতা ও মাজারের সংশ্লিষ্ট স্বচ্ছ প্রতিনিধি
 
এবং এই অ্যাকাউন্ট থেকে কোনো একজনের একক স্বাক্ষরে কখনোই টাকা তোলা যাবে না—অন্তত দুই বা তিনজনের যৌথ স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক।
 
মাজারের এই টাকা কেবল কিছু নির্দিষ্ট কাজেই ব্যয় করা যায়:
 
- মাজার, সংলগ্ন মসজিদ ও প্রাঙ্গণের রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার ও পরিচ্ছন্নতা
- দরিদ্র, অসহায় ও রোগীদের মাঝে খাদ্য, বস্ত্র ও চিকিৎসা সহায়তা প্রদান
- লঙ্গরখানা পরিচালনা এবং দেশ-বিদেশ থেকে আসা জিয়ারতকারীদের সঠিক সেবা প্রদান
- ধর্মীয় শিক্ষা প্রসার ও সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা
 
এছাড়া অন্য কোনো কাজে বা কারো ব্যক্তিগত স্বার্থে এই টাকা ব্যয় করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও গুনাহের কাজ। মাজারের সম্পদ আত্মসাৎ করা ধর্মীয় এবং সামাজিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই অত্যন্ত নিন্দনীয়। এই অর্থ সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা, ভক্তি ও পবিত্র উদ্দেশ্য নিয়ে দেওয়া হয়—যার একমাত্র লক্ষ্য মাজারের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা এবং দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ানো। এই টাকা আত্মসাৎ করা মানে হাজারো মানুষের বিশ্বাস ভঙ্গ করা এবং পবিত্র এই প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করা।
 
আসুন, আমরা সবাই সচেতন হই—আমাদের শ্রদ্ধেয় পীর-আউলিয়াদের পবিত্র স্মৃতি ও তাদের মাজারকে অসাধু লোকের কবল থেকে রক্ষা করি। তাদের দেখানো পথে নিজেরা সাধারণ জীবন যাপন করুন এবং অন্যের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়াই—এটাই হবে তাদের প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা।

ফ্রিল্যান্সিং জার্নালিস্ট, ওয়ার্কিং ফর ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস, ইউনাইটেড কিংডম 

এআরএম