Dhaka Mail Logo

মতামত

চিকিৎসাসেবা ও ধর্মপ্রচার: বাণিজ্যিক হওয়া সমীচীন নয়

ঢাকা মেইল ডেস্ক

১৫ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪০ পিএম

সভ্যতার ইতিহাসে চিকিৎসা ও ধর্ম—উভয়ই মানবকল্যাণের জন্য নিবেদিত। একটি মানুষের শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করে, অন্যটি তার নৈতিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশের পথ দেখায়। তাই এই দুটি ক্ষেত্রের ভিত্তি হওয়া উচিত সেবা, মানবতা ও নৈতিকতা; অন্যায্য ও সীমাহীন মুনাফা অর্জন নয়।

চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। একজন রোগী যখন চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন, তখন তিনি কেবল ওষুধ বা অস্ত্রোপচার প্রত্যাশা করেন না; তিনি প্রত্যাশা করেন সততা, সহমর্মিতা, পেশাগত দক্ষতা এবং মানবিক আচরণ। একইভাবে ধর্মপ্রচারও কোনো পণ্য বিক্রির কার্যক্রম নয়; এটি সত্য, ন্যায়, নৈতিকতা ও মানবকল্যাণের আহ্বান। ফলে উভয় ক্ষেত্রেই মানুষের কল্যাণই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ বিবেচ্য বিষয়।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নবী-রাসূলগণ মানুষের কাছে সত্যের বাণী পৌঁছে দিতে গিয়ে কোনো পার্থিব পারিশ্রমিক দাবি করেননি। পবিত্র কুরআনে একাধিক নবীর ভাষায় এসেছে, “আমি এর জন্য তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না; আমার প্রতিদান তো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছেই।” (সূরা আশ-শু’আরা: ১০৯, ১২৭, ১৪৫, ১৬৪ ও ১৮০; সূরা ইয়াসীন: ২১)। এ থেকেই প্রতীয়মান হয় যে ধর্মপ্রচারের মূল ভিত্তি ছিল নিঃস্বার্থ মানবকল্যাণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।

একইভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রদূত ইবনে সিনা, আল-রাজি, আল-জাহরাবি প্রমুখ মনীষী চিকিৎসাকে মানবকল্যাণের এক মহান দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন। তাঁরা চিকিৎসাবিদ্যা, গবেষণা, শিক্ষা এবং জ্ঞানচর্চায় অসামান্য অবদান রেখে মানবসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁরা জীবিকা অর্জন করলেও চিকিৎসাকে কখনো অতি মুনাফার ব্যবসায় পরিণত করেননি; বরং রোগীর কল্যাণ, জ্ঞানের বিকাশ এবং মানবসেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁদের গৃহীত কর্মপন্থা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, চিকিৎসা একটি পেশা হওয়ার পাশাপাশি এটি একটি নৈতিক ও মানবিক দায়িত্বও বটে।

কিন্তু বর্তমান সময়ে চিকিৎসা ও ধর্ম—উভয় ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা একদিকে যেমন দুঃখজনক অপরদিকে তা উদ্বেগজনকও বটে। চিকিৎসার নামে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কমিশনভিত্তিক রোগী রেফার, অযৌক্তিক ওষুধ প্রয়োগ, অতিরিক্ত ফি এবং বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন যেমন রোগীকে বিভ্রান্ত করে, আস্থা নষ্ট করে, তেমনি ধর্মের নামে অলৌকিকতার ব্যবসা, ভয় বা লোভ দেখিয়ে অর্থ সংগ্রহ, ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জন এবং ধর্মকে ব্যবসায়িক পণ্যে পরিণত করাও সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে।

অবশ্যই হাসপাতাল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট  অস্বচ্ছল চিকিৎসক, আলিম, শিক্ষক, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় ও ন্যায্য বেতন ভাতা ও সুযোগ সুবিধা পাওয়ার অধিকারও রয়েছে। তবে ন্যায্য পারিশ্রমিক গ্রহণ এবং একটি সেবাকে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ন্যায্য পারিশ্রমিক একটি স্বীকৃত অধিকার; কিন্তু মানুষের অসহায়ত্ব, রোগ, অজ্ঞতা কিংবা ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন কোনো নৈতিক সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আরও পড়ুন

ফুলের তোড়া ও অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা কাম্য নয়

অতিবৃষ্টি: জলবায়ু পরিবর্তন, কার্বন অর্থায়ন ও আমাদের করণীয়

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই বিষয়টি আরও গুরুত্বের সাথে বিবেচনার দাবি রাখে।একদিকে চিকিৎসা ব্যয় বহু পরিবারের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠছে, অন্যদিকে ধর্মীয় আবেগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রবণতা চলতে থাকলে চিকিৎসা ব্যবস্থা ও ধর্মীয় কাজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকবে। যা হবে এ দেশ ও জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো চিকিৎসা খাতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসায় নৈতিকতার কঠোর বাস্তবায়ন, অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন বন্ধ করা এবং ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ধর্মের নামে প্রতারণা বা বাণিজ্যিক অপব্যবহার রোধেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

একটি সুস্থ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজে চিকিৎসা হবে বিজ্ঞাননির্ভর, মানবিক ও সেবামুখী; আর ধর্মপ্রচার হবে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সততা ও মানবকল্যাণের ভিত্তিতে। এই দুটি ক্ষেত্র যখন মানুষের আস্থা, নৈতিকতা ও কল্যাণকে ধারণ করে পরিচালিত হয়, তখন সমাজ শক্তিশালী হয়; আর যখন এগুলো সীমাহীন মুনাফার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তখন মানবিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষ আস্থার সংকটে নিপতিত হয়।

অতএব, চিকিৎসা সেবা ও ধর্মপ্রচার—উভয় ক্ষেত্রেই মানবকল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ন্যায্য পারিশ্রমিক ও আর্থিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সেবা ও বিশ্বাসকে ব্যবসায়িক পণ্যে পরিণত করা থেকে বিরত থাকাও সমান জরুরি। কারণ মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য এবং বিশ্বাস—এই তিনটি কখনোই কেবল বাজারের পণ্য হতে পারে না; এগুলো মানবমর্যাদার অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা রক্ষা করা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবারই দায়িত্ব।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্রচিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী