ঢাকা মেইল ডেস্ক
০৬ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৭ পিএম
ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রতি মানুষের গভীর আস্থা ও ভালোবাসা তৈরি হয়েছে যে মৌলিক বিশ্বাসের ওপর, তা হলো এটি শুধু সুদবিহীন ব্যাংকিং নয়; বরং ন্যায়, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনকল্যাণমূলক একটি আর্থিক ব্যবস্থা। ইসলামি ব্যাংকে যারা আমানত রাখেন তারা কেবল আর্থিক সুবিধার জন্য নয়, ধর্মীয় ও নৈতিক বিবেচনা থেকেও এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেছে নেন। ফলে ইসলামি ব্যাংকে যদি বড় ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারি, অর্থ আত্মসাৎ বা অর্থপাচারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের নৈতিক ভিত্তিও।
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে কয়েকটি ইসলামি ব্যাংককে ঘিরে অর্থায়নে অনিয়ম, করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতা এবং অর্থপাচারের অভিযোগ জনপরিসরে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থা, নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ এবং আদালতের কার্যক্রমে এসব অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হলেও শরিয়াহ বোর্ডের দায়িত্ব নিয়ে তুলনামূলকভাবে আলোচনা হয়েছে বেশ কম।
জনমনে এ প্রশ্ন ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে, ইসলামি ব্যাংকগুলোর শরিয়াহ বোর্ড কি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক উপদেষ্টা পরিষদ, নাকি ব্যাংকের কার্যক্রম দেখার জন্য প্রতিষ্ঠানটির নৈতিক ও শরিয়াহসম্মত দায় দায়িত্বও আছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই ইসলামি ব্যাংকিংয়ের মৌলিক দর্শন সম্পর্কে ধারণা লাভ করা প্রয়োজন।
ইসলামি অর্থনীতিতে সুদের অস্তিত্ব থাকতে পারবে না, তবে কেবল রিবা বা সুদমুক্ত হলেই তা ইসলামি অর্থনীতি হয়ে যায় না। কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে গড়ে ওঠা ইসলামি অর্থব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, অন্যায় ও প্রতারণা প্রতিরোধ, আমানতের নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জনকল্যাণ নিশ্চিত করা। ইসলামি আইনশাস্ত্রে মাকাসিদুশ শরিয়াহ বা শরিয়াহর উদ্দেশ্যের অন্যতম দিক হলো মানুষের সম্পদের সুরক্ষা। ফলে যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে সংগঠিতভাবে আমানতকারীদের অর্থ আত্মসাৎ বা পাচার হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি আর্থিক অপরাধ নয়; ইসলামি নৈতিকতারও গুরুতর লঙ্ঘন।
এ কারণেই ইসলামি ব্যাংকগুলোতে শরিয়াহ বোর্ডের আবশ্যকতা। তাদের মূল কাজ হলো ব্যাংকের বিনিয়োগপদ্ধতি ও কার্যক্রম শরিয়াহর নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পর্যালোচনা করা এবং এ বিষয়ে স্বাধীন মতামত প্রদান করা।
এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যদি বছরের পর বছর বিপুল অঙ্কের অর্থ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে কেন্দ্রীভূত হয়, ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থায়ন হয়, যথাযথ জামানত ছাড়াই বিনিয়োগ প্রদান করা হয়, কিংবা পরে অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে আমার বিবেচনায় শরিয়াহ বোর্ড এসবের পুরো দায় এড়াতে পারে না।
এ কথা সত্য, বর্তমান বাস্তবতায় শরিয়াহ বোর্ড দৈনন্দিন ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে না। তারা বিনিয়োগ অনুমোদন, অর্থ স্থানান্তর বা হিসাব পরিচালনার নির্বাহী ক্ষমতা রাখে না। এসব দায়িত্ব পরিচালনা পর্ষদ, ম্যানেজমেন্ট , ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগ, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা এবং নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের। তাই কোনো নির্দিষ্ট অর্থপাচারের ঘটনায় শরিয়াহ বোর্ডকে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সরাসরি দায়ী করা যায় না।
কিন্তু নৈতিক ও পেশাগত প্রশ্ন এখানেই শেষ হয়ে যায় না। ইসলামি ব্যাংকিংয়ে শরিয়াহ বোর্ড কেবল একটি ‘ফতোয়া বোর্ড’ নয়। তাদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে ব্যাংকের কার্যক্রম শরিয়াহর উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা। কোনো ব্যাংকিং কার্য্যক্রম কাগজে-কলমে শরিয়াহসম্মত হলেও বাস্তবে প্রতারণা, জালিয়াতি বা অন্যায়ের হাতিয়ার হয়ে উঠলে সে ক্ষেত্রে শরিয়াহ বোর্ডের সচেতনতা, প্রতিক্রিয়া ও ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু চুক্তির ভাষা নয়, লেনদেনের উদ্দেশ্যও গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) ব্যবসায় সততা, বিশ্বস্ততা এবং প্রতারণামুক্ত লেনদেনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে আমানত যথাযথভাবে আদায় এবং মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ না করার নির্দেশ সুস্পষ্ট। ফলে কোনো ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যদি দীর্ঘদিন ধরে সুস্পষ্ট সুশাসনের ঘাটতি থাকে, তাহলে শরিয়াহ তদারকি ব্যবস্থাও আত্মসমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও শরিয়াহ গভর্ন্যান্স এখন ইসলামি ব্যাংকিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। বর্তমানে শুধু শরিয়াহসম্মত চুক্তি অনুমোদন করাই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয় না; বরং সেই চুক্তি বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হচ্ছে, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কেমন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর এবং শরিয়াহ লঙ্ঘনের সম্ভাবনা কোথায়—এসব বিষয়ও গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে শরিয়াহ বোর্ডের সদস্যরা একই সঙ্গে একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। কোথাও কোথাও তাদের জন্য পর্যাপ্ত গবেষণা সহায়তা, স্বাধীন শরিয়াহ অডিট বা প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা হয় না। ফলে তারা ম্যানেজমেন্টের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এতে স্বাধীন তদারকি ব্যাহত হয়।
এখানে আরেকটি বিষয় বিবেচ্য। শরিয়াহ বোর্ডের সদস্যদের অধিকাংশই ইসলামি আইন ও ফিকহে উচ্চতর জ্ঞানসম্পন্ন হলেও জটিল আর্থিক প্রকৌশল (Financial Engineearing), ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, শরিয়ার আলোকে সফটওয়্যার বানানো এবং তা নিয়মিত মনিটরিং, ফরেনসিক অডিট বা অর্থপাচার শনাক্তকরণে বিশেষায়িত জ্ঞান সবসময় থাকে না। অথচ আধুনিক ব্যাংকিংয়ে শরিয়াহ বোঝার পাশাপাশি আর্থিক বাস্তবতা বোঝাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্য নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কতটা কার্যকর ছিল, সেটি মূল্যায়নের। যদি শরিয়াহ বোর্ডের হাতে পর্যাপ্ত তথ্য, স্বাধীনতা ও দক্ষতা না থাকে, তাহলে সেই কাঠামো সংস্কার করা প্রয়োজন। আর যদি এসব সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা যথাযথ ভূমিকা পালন না করে, তাহলে জবাবদিহিতার প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠবে।
বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংকিং খাত দেশের আর্থিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই খাতের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করতে হলে শুধু আর্থিক পুনর্গঠন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শরিয়াহ গভর্ন্যান্সেরও সংস্কার। কারণ ইসলামি ব্যাংকিংয়ের শক্তি কেবল সুদমুক্ত লেনদেনে নয়; এর আসল শক্তি বিশ্বাস, স্বচ্ছতা ও নৈতিকতায়।
এই বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য শরিয়াহ বোর্ডকে আরও স্বাধীন, দক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সময়ের দাবি।
লেখক: ইসলামি অর্থনীতিবিদ, শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ ও সমাজচিন্তক