Dhaka Mail Logo

মতামত

বাংলাদেশে আরবি চর্চা: খুলতে পারে বৈশ্বিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার

ঢাকা মেইল ডেস্ক

০১ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৮ পিএম

ভাষা শুধু শব্দের সমষ্টি নয়। একটি ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি, জ্ঞান, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। পৃথিবী যখন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তখন ভাষার গুরুত্বও নতুনভাবে বিবেচিত হচ্ছে। একসময় যে ভাষাকে শুধু একটি অঞ্চলের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে দেখা হতো, আজ সেটিই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৌশলগত সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতায় আরবি ভাষা চর্চার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। আরবি শুধু মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় ঐতিহ্যের ভাষা নয়; এটি আজ বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক ভাষা। বিশ্বের বিশাল জনগোষ্ঠীর ভাষা আরবি। জাতিসংঘের অন্যতম অফিসিয়াল ভাষা আরবি।

বিশেষত আরব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক উত্থান, ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব, জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে আরবি ভাষা আগামী দিনের বৈশ্বিক দক্ষতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে যাচ্ছে বলে অনেক বিশ্লেষক দৃঢ়তার সাথে তাদের মত ব্যক্ত করছেন।

আমাদের সমাজে আরবি ভাষাকে অনেক সময় শুধু ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। ফলে এর অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, গবেষণামূলক ও পেশাগত সম্ভাবনার বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়। আধুনিক বিশ্বে এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আমাদের স্বার্থেই ভীষণ প্রয়োজন।

আরবি ভাষার বৈশ্বিক অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভাষা। ৪২ কোটি মানুষ এ ভাষায় কথা বলেন। এটি জাতিসংঘের ৬টি সরকারি ভাষার অন্যতম একটি। বিশ্বের ২৫টি দেশের সরকারি ভাষা আরবি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম।

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এই অঞ্চলের সিদ্ধান্ত অনেক সময় বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে। ফলে আরবি ভাষা জানা মানে শুধু একটি ভাষা জানা নয়; বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অঞ্চলকে বোঝার সক্ষমতা অর্জন করা।

আজকের বিশ্বে যে দেশগুলো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে এগিয়ে যেতে চায়, তারা ভাষাগত দক্ষতাকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে। আরবি ভাষাও সেই কৌশলগত সম্পদের একটি অংশ।

অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টিতে এ ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্ব অর্থনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তেল ও গ্যাসের পাশাপাশি বর্তমানে অঞ্চলটি প্রযুক্তি, পর্যটন, অবকাঠামো, ব্যাংকিং, বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে।

সৌদি আরবের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে উত্থান এবং কাতারের বৈশ্বিক বিনিয়োগ সক্ষমতা—এসবই স্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করে যে, আরব বিশ্ব ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে।

এই বাস্তবতায় আরবি ভাষায় দক্ষতা কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। ব্যবসা প্রতিনিধি, অনুবাদক, গবেষক, কূটনীতিক, সাংবাদিক, পর্যটনকর্মী, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার কর্মী কিংবা দক্ষ অভিবাসী—বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরবি জানা মানুষের বাড়তি সুবিধা সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি কর্মরত। কিন্তু ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকেই নিজেদের পেশাগত উন্নতির সুযোগ থেকে পিছিয়ে থাকেন। আরবি ভাষায় দক্ষতা থাকলে তারা শুধু শ্রমিক নয়, বরং দক্ষ ও উচ্চমূল্যের কর্মী হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারেন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভাষা একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। কোনো দেশের মানুষের ভাষা না জানলে সেই সমাজের চিন্তা চেতনা, কৃষ্টি কালচার, সামাজিক মূল্যবোধ ও বাস্তবতা গভীরভাবে বোঝা কঠিন।

মধ্যপ্রাচ্য বর্তমান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অঞ্চল। জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য পথ, অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে এই অঞ্চল সরাসরি যুক্ত।

এসব দেশ আরব বিশ্বে নিযুক্ত একজন কূটনীতিক বা নীতিনির্ধারক যদি আরবিতে কথা বলতে পারেন, সে ভাষায় সরাসরি সংবাদ, বক্তব্য ও নথি পড়তে পারেন, তাহলে তার বিশ্লেষণ অন্যদের তুলনায় আরও গভীর, প্রভাবশালী ও বাস্তবভিত্তিক হয়। অনুবাদের ওপর নির্ভরতা কমে এবং সঠিক ও যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়।

বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতেও মধ্যপ্রাচ্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে আরবি জানা দক্ষ জনবল প্রয়োজন।

জ্ঞান ও সভ্যতার ভাষা হিসেবে আরাবির ঐতিহাসিক গুরুত্বও অনস্বীকার্য। বিশ্বের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে আরবি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম।

মধ্যযুগে আরবি ভাষায় চিকিৎসা, গণিত, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূগোলের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচিত হয়েছে। বিভিন্ন সভ্যতার জ্ঞান আরাবি অনুবাদের মাধ্যমে সংরক্ষিত ও বিস্তৃত হয়েছে।

আরও পড়ুন

এশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক মানচিত্রে বাংলাদেশ

আজও আরবি ভাষায় বিপুল সাহিত্য, গবেষণা ও ঐতিহাসিক দলিল রয়েছে। যারা মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস, সংস্কৃতি, রাজনীতি বা সমাজ নিয়ে গবেষণা করতে চান, তাদের জন্য আরবি ভাষা একটি অপরিহার্য দক্ষতা।

ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি আধুনিক দক্ষতার সাথে আরবি ভাষার সম্পর্ক উৎপ্রোত ভাবে জড়িত।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আরবি ভাষার সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক সুনিবিড়। কুরআন ও হাদিসের ভাষা হিসেবে মুসলমানদের কাছে আরবি বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। কিন্তু আরবিকে শুধু ধর্মীয় ভাষা হিসেবে দেখলে এর বহুমাত্রিক সম্ভাবনা উপেক্ষিত হয়।

একজন শিক্ষার্থী একই সঙ্গে আরবি ভাষার মাধ্যমে ধর্মীয় জ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আধুনিক পেশাগত দক্ষতা অর্জন করতে পারেন।

Arabic
মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে আরবি জানা শ্রমিকদের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান সময়ে প্রয়োজন এমন একটি আরবি বা শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে ভাষা শেখানো হবে বাস্তব জীবনের প্রয়োজনে। শুধু ব্যাকরণ মুখস্থ নয়; বরং কথোপকথন, অনুবাদ, ব্যবসায়িক যোগাযোগ, গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবহার শেখানো জরুরি।

প্রযুক্তির যুগে আরাবির বৈশ্বিক চাহিদা ও নতুন সম্ভাবনা ক্রমবর্ধমান। ডিজিটাল বিশ্বে ভাষার ব্যবহার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অনলাইন শিক্ষা, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বৈশ্বিক বাজারে স্থানীয় ভাষার গুরুত্ব বেড়েই চলেছে।

আরবি ভাষার ডিজিটাল বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। আরাবি কনটেন্ট তৈরি, অনুবাদ প্রযুক্তি, সফটওয়্যার স্থানীয়করণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

আরও পড়ুন

শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গঠনে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চার গুরুত্ব

বাংলাদেশের তরুণরা যদি আরবি ভাষার সঙ্গে প্রযুক্তিগত দক্ষতা যুক্ত করতে পারেন, তাহলে তারা নিশ্চিতভাবেই বৈশ্বিক কর্মবাজারে নতুন অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবেন।

আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে আরবি শিক্ষাব্যবস্থায় যুগোপযোগী পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশে আরবি শিক্ষার প্রচলন মোটামুটি থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা আধুনিক প্রয়োজনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আরবি ভাষাকে শুধু পরীক্ষার বিষয় না বানিয়ে কর্মজীবনের দক্ষতা হিসেবে গড়ে তোলা সময়ের অপরিহার্য দাবি।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আরবি ভাষার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়ন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি গবেষণাকে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা ভাষাটির বাস্তব ব্যবহার সম্পর্কে সম্যকধারণা লাভ করতে সক্ষম হবেন।

এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়, বর্তমান বিশ্বে ভাষা শেখা একটি বিনিয়োগ। যে ভাষা যত বেশি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে, তার মূল্য তত বেশি।

আরবি ভাষা আজ এমন এক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে এটি একই সঙ্গে ঐতিহ্য, জ্ঞান, অর্থনীতি ও কৌশলগত সম্ভাবনার ভাষা হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত।

বাংলাদেশ যদি আরবি ভাষায় দক্ষ একটি নতুন প্রজন্ম তৈরি করতে পারে, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করবে না; বরং বৈশ্বিক কর্মক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি করবে।

আরবি ভাষা তাই কেবল অতীতের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যম নয়; এটি ভবিষ্যতের সম্ভাবনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী