Dhaka Mail Logo

মতামত

বাংলাদেশের ১৪ জার্নাল: অবস্থার উন্নতি নাকি অবনতি?

২৩ জুন ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম

আন্তর্জাতিক গবেষণা-র‍্যাঙ্কিং প্ল্যাটফর্ম SCImago Journal & Country Rank–এ বাংলাদেশি প্রকাশনা-দেশ হিসেবে বর্তমানে ১৪টি জার্নাল তালিকাভুক্ত। কিন্তু এই উপস্থিতি যেমন গবেষণা-পরিসরের আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতার একটি ইতিবাচক লক্ষণ, তেমনি কোয়ার্টাইল ও SJR স্কোর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—বাংলাদেশি জার্নালগুলোর বড় অংশ এখনও Q4 বা নিম্ন উদ্ধৃতি-প্রভাবের স্তরে আটকে আছে। SCImago নিজেই SJR-কে জার্নাল ও দেশভিত্তিক বৈজ্ঞানিক যোগাযোগ, কোয়ার্টাইল ও সায়েন্টোমেট্রিক সূচক বিশ্লেষণের উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বর্ণনা করে।

সাম্প্রতিক তালিকায় সবচেয়ে উপরের অবস্থানে রয়েছে Journal of Advanced Veterinary and Animal Research। SCImago-র বাংলাদেশ পেজে জার্নালটির SJR স্কোর ০.৪৬২ এবং Q2 কোয়ার্টাইল দেখা যাচ্ছে। এটি বর্তমানে বাংলাদেশি জার্নালগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দৃশ্যমান অবস্থান তৈরি করেছে। একই তালিকায় Journal of Advanced Biotechnology and Experimental Therapeutics এবং AIUB Journal of Science and Engineering যুগপথভাবে Q3 স্তরে আছে। তবে বাকি অধিকাংশ জার্নাল Q4-তে অবস্থান করছে, যা আন্তর্জাতিক উদ্ধৃতি-প্রভাব ও গবেষণা দৃশ্যমানতার সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে।

বর্তমান ১৪টি জার্নালের তালিকায় কোনো Q1 জার্নাল নেই। একটি জার্নাল Q2, দুটি Q3 এবং বাকি সকল জার্নাল Q4-তে আছে। তালিকায় Bangladesh Journal of Medical Science, Journal of Medicine (Bangladesh), Bangladesh Journal of Botany, Bangladesh Journal of Pharmacology, Bangladesh Medical Research Council Bulletin, Bangabandhu Sheikh Mujib Medical University Journal, Bangladesh Journal of Obstetrics and Gynecology, Bangladesh Journal of Infectious Diseases, Journal of Statistical Research এবং University of Asia Pacific Journal of Law and Policy—এসব জার্নালের অবস্থানও নিম্ন-মধ্য বা নিম্ন কোয়ার্টাইলের মধ্যে দেখা যায়।

তবে সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে ছবি পুরোপুরি হতাশাজনক নয়। ২০১৭ সালের Scopus/SCImago-ভিত্তিক তালিকায় বাংলাদেশ থেকে ১৭টি জার্নাল ও একটি কনফারেন্স প্রসিডিংস তালিকাভুক্ত ছিল। তখন Journal of Health, Population and Nutrition Q1-এ এবং Journal of Naval Architecture and Marine Engineering Q2-এ ছিল। একই তালিকায় Bangladesh Journal of Pharmacology–এর SJR ছিল ০.৪৬৬, Journal of Advanced Veterinary and Animal Research–এর SJR ছিল ০.২৪৮, আর Bangladesh Journal of Medical Science–এর SJR ছিল ০.১৬৭।

অর্থাৎ ২০১৭ সালে বাংলাদেশি তালিকায় অন্তত একটি Q1 জার্নাল ছিল, কিন্তু বর্তমান তালিকায় Q1 নেই। সংখ্যার দিক থেকেও ১৭ থেকে ১৪-তে নেমে আসা একটি সতর্ক সংকেত। তবে একই সময়ে কিছু জার্নালের উন্নতিও স্পষ্ট। যেমন Journal of Advanced Veterinary and Animal Research ২০২০ সালে SJR ০.২৭৫ ও Q3 অবস্থান থেকে সাম্প্রতিক তালিকায় Q2 অবস্থানে উঠেছে।

আরেকটি উদাহরণ Bangladesh Journal of Medical Science। Resurchify-তে প্রকাশিত SCImago-ভিত্তিক বছরভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, জার্নালটির SJR ২০১৪ সালে ০.১৭৫, ২০২০ সালে ০.২৫৫, ২০২৩ সালে ০.২৫২ এবং ২০২৪ সালে ০.২৭৮—অর্থাৎ ধীরগতির হলেও একটি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়।

অন্যদিকে Bangladesh Journal of Pharmacology–এর ক্ষেত্রে চিত্রটি উল্টো। একই ধরনের বছরভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী জার্নালটির SJR ২০১৭ সালে ০.৪৬৬ এবং ২০২০ সালে ০.৩৮৫ হলেও ২০২৪ সালে তা ০.২৪৮-এ নেমেছে। অর্থাৎ কিছু পুরোনো প্রতিষ্ঠিত জার্নাল citation influence ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই র‍্যাঙ্কিং সরাসরি “গবেষণার মান” মাপার একমাত্র উপায় নয়; বরং এটি জার্নালের উদ্ধৃতি-প্রভাব, আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা, বিষয়ভিত্তিক অবস্থান ও Scopus-ভিত্তিক ডেটা ব্যবস্থার একটি সূচক। SCImago-র র‍্যাঙ্কিং ডেটা Scopus ডেটাবেসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

বাংলাদেশের গবেষণা-প্রকাশনা ব্যবস্থার জন্য তাই বার্তাটি পুরোপুরি আশাব্যাঞ্জক নয়। আন্তর্জাতিক তালিকায় উপস্থিতি আছে, কিছু জার্নাল এগোচ্ছে, কিন্তু উচ্চ-প্রভাবশালী Q1 অবস্থান শূন্য এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জার্নাল Q4-তে থাকা এখনও বড় দুর্বলতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, জার্নালের মানোন্নয়নে কেবল প্রকাশনার সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়; দরকার শক্তিশালী পিয়ার-রিভিউ, আন্তর্জাতিক সম্পাদকীয় বোর্ড, গবেষণার মৌলিকতা, নিয়মিত প্রকাশনা, নৈতিক প্রকাশনা-নীতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং উচ্চমানের citation network তৈরি। তাই যথাযথ ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা নিয়ে এই সেক্টরের উন্নয়নে কাজ করা জরুরি।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, বায়োস্ট্যাটিস্টিক বিভাগ, জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম)