১৬ জুন ২০২৬, ০৬:০০ এএম
১৬ জুন। দিনটি সংবাদপত্রের কালো দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে চারটি সংবাদপত্র রেখে বাকিগুলোর ডিক্লারেশন বাতিল করা হয়। পরের বছর থেকে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের দুটি সংগঠন ‘বিএফইউজে এবং ডিইউজে’ দিনটিকে কালো দিবস হিসেবে স্মরণীয় করে রাখে। কিন্তু একটা দিন কি সহসাই অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে পারে? সংবাদপত্রের আকাশে কালো মেঘ স্বাধীনতার পরপরই দানা বাঁধছিল।
আদতে মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশে পদার্পণের কিছুদিনের মধ্যেই সব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিমালিকানা উচ্ছেদ করে সেগুলোকে রাষ্ট্রায়ত্ত করে। সংবাদপত্রগুলোও এর বাইরে ছিল না। মূলত মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর পাকিস্তানি অনুপস্থিত মালিকানার প্রতিষ্ঠানগুলোকে এভাবে সরকারের হাতে নেওয়া হয়। তবে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির দোহাই দেওয়া হলেও এর সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক জাতীয়করণের মৌলিক পার্থক্য ছিল। সমাজতন্ত্রে বুর্জোয়া ব্যক্তিমালিকানাকে জাতীয়করণের মাধ্যমে শ্রমিক সমবায়ের হাতে অর্থাৎ যৌথ মালিকানায় আনা হয়।
কিন্তু বাংলাদেশে যা হলো, তা অভিনব। পাকিস্তানিদের পাশাপাশি বাংলাদেশি মালিকানার প্রতিষ্ঠানগুলোকেও জাতীয়করণের নামে কার্যত দলীয় লোকজনের কর্তৃত্বে আনা হয়। সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এর ব্যতিক্রম হয় না। যদিও এবিএম মূসা, তোয়াব খানের মতো সাংবাদিক প্রতিনিধিরা পাকিস্তানি মালিকানায় থাকা সংবাদমাধ্যমকে ওইসব প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক ও কর্মচারীদের মাধ্যমে পরিচালনার প্রস্তাব তুলেছিলেন; কিন্তু বাস্তবে তাতে অনুগত প্রশাসক বসানোর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের হাতেই নিয়ে আসা হয়। অর্থাৎ পাকিস্তানি বড় বুর্জোয়ার জায়গায় দেশীয় উঠতি বুর্জোয়াদের কবজায় চলে যায় এসব প্রতিষ্ঠান। এ ধরনের রাষ্ট্রায়ত্তকরণের ফলে এক অর্থে সব সাংবাদিকের চাকরি সরকারের মর্জির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সরকারের হয়ে তথ্য সচিবই সম্পাদক, ব্যবস্থাপক বা প্রশাসক নিয়োগ দিতেন— যদিও মর্যাদার দিক থেকে একজন সম্পাদক সচিবের অনেক উপরেই অবস্থান করেন।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের কিছুদিনের মধ্যেই বেশকটি সংবাদপত্রের সম্পাদককে তাদের পদ ছাড়তে বলা হয়। এই সম্পাদকদের অধিকাংশই স্বাধিকার আন্দোলনের কঠিন সমর্থক ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৪ মার্চ তারা যৌথভাবে ‘সময় ফুরাইয়া আসিতেছে’, ‘টাইম ইজ রানিং আউট’ শিরোনামে অভিন্ন সম্পাদকীয় প্রকাশ করেন। এর মূল বক্তব্য হলো— সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে নির্বাচিত দলের নেতা শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনা করে জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক। কিন্তু এটাও সত্য যে, তাদের কেউই ২৫ মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যাযজ্ঞ শুরুর পর খোলাখুলি মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন জানিয়ে উঠতে পারেননি। আবার তাদের গণহারে দালালও বলা যায় না। এ ধরনের আচরণের প্রতিবাদেই সাপ্তাহিক হলিডে পত্রিকার সম্পাদক লেখেন তার বিখ্যাত সম্পাদকীয়, ‘সিক্সটি ফাইভ মিলিয়ন রাজাকারস’। এতে তিনি ভারতে আশ্রয় নেওয়াদের বাদে যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের ভেতরে দিনাতিপাত করছিল, সেই সাড়ে ছয় কোটি মানুষকে কি আওয়ামী লীগ রাজাকার আখ্যা দেবে বলে হতাশা প্রকাশ করেন।
তবে একজনের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটেছিল। পাকিস্তান অবজারভার থেকে বাংলাদেশ অবজারভার হওয়া ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদক আবদুস সালাম এর পদ অটুট রইল। অনেকের আপত্তি সত্ত্বেও শেখ মুজিব তাকে বহাল রাখার নির্দেশ দিলেন (SM Ali, 1994, UPL)। অবশ্য অচিরেই তাকেও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সরকারের রোষানলে পড়তে হয়। ১৯৭২ সালের ১৫ মার্চ তিনি তার পত্রিকায় ‘দ্য সুপ্রিম টেস্ট’ নামে সম্পাদকীয় প্রকাশ করেন। সম্পাদকীয়টিতে বলা হয়, আওয়ামী লীগ জনগণের ভোটে বিপুলভাবে নির্বাচিত হলেও এই সরকারের অস্তিত্বের আইনি ভিত্তি নেই । কারণ, বর্তমানে কোনো সংবিধান কার্যকর নেই। এটি বরং একটি বিজয়ী বিপ্লবী সরকার। আবদুস সালাম প্রকারান্তরে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্থাপিত দাবি, অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব পক্ষকে নিয়ে একটি জাতীয় সরকারের পক্ষেই সওয়াল করেছিলেন। সম্পাদকীয়টির উপসংহারে যা লেখা হয়, এর বাংলা এরকম: তিনি (মুজিব) হয়তো জানেন না, তিনি কতটা শক্তিমান। কোনো বিশেষ গোষ্ঠী, চক্র বা স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর থেকে নয়, তার শক্তির উৎস জনগণ। একভাবে, তিনি এখন তার সেই বিরাটত্বের চূড়ান্ত পরীক্ষার মুখোমুখি।
ঘটনাটি প্রতীকীভাবে অসীম ক্ষমতাধর সরকারপ্রধান বনাম একজন পেশাদার সম্পাদকের দেশপ্রেমেরই ‘সুপ্রিম টেস্ট’ হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। সম্পাদকীয়টি প্রকাশিত হওয়ামাত্রই আবদুস সালাম চাকরি হারান। সাংবাদিক এবিএম মূসা আবদুস সালামের পক্ষে শেখ মুজিবুর রহমানকে ফোনে কল করলে মুজিব সম্পাদকীয়টি মূসা সাহেবকে পড়ে শোনান এবং আবদুস সালামের পদত্যাগের পক্ষেই অবস্থান নেন। পরদিন পত্রিকাটির প্রথম পৃষ্ঠায় আত্মরক্ষামূলক সাফাই প্ৰকাশ করা হয়। আবদুস সালামের চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত এসেছিল ক্যাবিনেট থেকে এবং শেখ মুজিব স্বয়ং মনে করেন যে মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে যোগসাজশ করেই এমন ধারার সম্পাদকীয় প্রকাশ করা হয়। ২০ বছর ধরে অবজারভারের প্রতি নিবেদিত থাকার পরও আবদুস সালামের সম্মানজনক প্রস্থানের কোনো ব্যবস্থা করা যায়নি বা কোনো প্রতিবাদও দৃশ্যমান হতে পারেনি।
সাংবাদিক কে জি মুস্তাফার বরাতে এখানে আরেকটি কথা উল্লেখ করা যায়। গোড়া থেকেই অবজারভারের সম্পাদক পদের জন্য প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার ঢাকাস্থ প্রতিনিধি জ্যোতি সেনের নাম ভারতীয় পক্ষ থেকে নির্ধারিত হয়েছিল। সে লক্ষ্যেই মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনি ভারতের সামরিক বিমানে ঢাকায় আসেন। রাজধানীর পূর্বাণী হোটেলে চা খেতে খেতে সাংবাদিক কে জি মুস্তাফা তাকে চ্যালেঞ্জ করে বসেন।
মুস্তাফা হুমকি দেন যে, ‘আপনি এ কী বলছেন? আর ইউ ডেড? আপনি যদি এক্ষুনি ফিরে না যান, তাহলে পিটুনির শিকার হবেন।’ এ ঘটনার তিনদিনের মধ্যে ভদ্রলোক ঢাকা ছাড়েন।
এর মধ্যেই ২৩ মে ১৯৭২-এ সাতক্ষীরার বাসস প্রতিনিধি ত্রাণকাজে দুর্নীতির সংবাদ করার দায়ে গ্রেফতার হন। মওলানা ভাসানী প্রকাশিত হক-কথা পত্রিকার সম্পাদক ইরফানুল বারী ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অসমতা নিয়ে সমালোচনা মুখর ছিলেন। সেই দায়ে তিনি গ্রেফতার হন ২০ জুন।
মুজিব সরকার ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক কথাই বরদাশত করত না। ইরফানুল বারী এবং হক-কথা দিয়ে মতপ্রকাশ দমনের মাত্র শুরু, শেষ নয়। ১৯৭২ এর ১২ এপ্রিল রুশ সংবাদমাধ্যম নভস্তি প্রেস এজেন্সিতে ভিক্টর বাংলাদেশে মাওবাদী তৎপরতার দায়ে সাপ্তাহিক গণশক্তি, হক-কথা, চরমপত্র এবং হলিডে পত্রিকা বন্ধের জন্য দাবি তোলেন। আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, যদি সরকার এসব পত্রিকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে জনগণই তাদের শাস্তি দেবে। কেননা, এই ষড়যন্ত্রকারীরা ‘আমাদের এবং আমাদের বন্ধুরাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ।’ (দৈনিক বাংলা, ৪ মে ১৯৭২)।
এর প্রতিবাদ করেন ডিইউজের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি গিয়াসউদ্দিন আহমেদ। ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই এই সাংবাদিক সংগঠনটির সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে তিনি এই হুমকিকে ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি হুমকি’ বলে নিন্দা জানান। সেই সভার প্রধান অতিথি ছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ মুজিবের জবাবের ভাষা ছিল এমন, ‘দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো সংবাদপত্র গজিয়েছে, সাংবাদিকতার নৈতিকতার কোনো পরোয়াই তারা করে না। সম্ভবত, সাংবাদিক সমাজের এটা একটা সমস্যা।’ (দ্য বাংলাদেশ অবজারভার, ১৭ জুলাই ১৯৭২)।
সাংবাদিক সমাজের প্রতিবাদ নিষ্ফল করে দিয়ে ১৯৭২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সাপ্তাহিক মুখপত্র ও স্পোকসম্যানের সম্পাদক ফয়জুর রহমানকে দেশদ্রোহিতার মামলায় গ্রেফতার করা হয়। ৭ সেপ্টেম্বর জ্বালিয়ে দেওয়া হয় দেশবাংলা পত্রিকার অফিস। পত্রিকাটির প্রকাশ সপ্তাহকাল বন্ধ থাকে। হক-কথা, মুখপত্র, স্পোকসম্যান, লাল পতাকা এবং বাংলার মুখের প্রকাশনা লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না বলে নোটিশ জারি করা হয়। ২২ সেপ্টেম্বর হক-কথা, মুখপত্র ও স্পোকসম্যানের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত জানায় সরকার। উল্লেখ্য, হক-কথার সম্পাদক ইরফানুল বারী আটক হওয়ার পর মওলানা ভাসানীর নামই ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে ছাপা হতো।
২.
সংসদে গুটিকয় যে সংসদ সদস্যরা এসব অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের বিরোধিতা করেন, তাদের মধ্যে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবং এমএন লারমার নাম অগ্রগণ্য। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত যেখানে সংবিধানের বন্ধুরাষ্ট্রের সমালোচনাকে আইন করে নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে বলেছেন, সেখানে সংবিধানের খসড়া রচয়িতা আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন দাঁড়িয়েছিলেন বন্ধুরাষ্ট্রপন্থার পক্ষে এবং মতপ্রকাশের বিপক্ষে। আমাদের মনে আছে, বিগত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে বন্ধুরাষ্ট্রের সমালোচনাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য করে আইন প্রণীত হয়েছিল এবং বেশ কজন লেখক-সাংবাদিক-ব্লগার এজন্য নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন।
আরও মর্মান্তিক ব্যাপার হলো, যে আইনের বলে সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ এবং সাংবাদিকদের দমন করা হচ্ছিল, তা প্রণয়ন করেছিলেন স্বৈরাচারী পাকিস্তানি শাসক আইয়ুব খান। আইয়ুব খানের প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট, ১৯৬০ তখনও বহাল ছিল। আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৭৩ সালে এ আইনের জায়গায় ‘মুদ্রণযন্ত্র ও প্রকাশনা অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৩’ নামের নতুন আইন নিয়ে আসে। এ আইনের ৪১ ধারার ২ উপধারায় বলা হয়, পূর্ববর্তী অর্ডিন্যান্সবলে সরকার যেসব কাজ করেছেন, সেগুলি যদি নতুন অর্ডিন্যান্সের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ না হয়, তাহলে সেগুলির সবই বৈধ। (বদরুদ্দীন উমর: রচনা সংগ্রহ-২, পৃ. ৬৪৬)
এসব যখন চলছিল, তখন গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে নিয়মিতভাবে বিষোদ্গার করে যেতেন আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রীরা। বাংলার বাণীর সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মণি এতদূর পর্যন্ত বলেন যে, ‘বিপ্লবের পরে প্রতিবিপ্লব আসবে। সুতরাং সাংবাদিকদের শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যেতে হবে।’
জাতীয় সংসদে শেখ মণি বিষয়ে আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি, চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদী পত্রিকার সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ অভিযোগ করেন, দেশের পত্রিকাগুলো বিজ্ঞাপন বৈষম্যের শিকার। তিনি জানান, শেখ মণির বাংলার বাণী পত্রিকা ১৯৭২ সালের মার্চ থেকে ১৯৭৩ সালের মে পর্যন্ত সর্বোচ্চ সরকারি বিজ্ঞাপন পায়।
শেখ মণি প্রায়ই দ্বিতীয় বিপ্লবের কথা বলতেন। বলতেন শুদ্ধি অভিযান চালানোর কথা। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল সরকার প্রতিষ্ঠা করে শেখ মুজিব সেই দ্বিতীয় বিপ্লবের ঘোষণা দিলেন এবং সেই দ্বিতীয় বিপ্লব সফল করার প্রয়োজনেই ওই বছরের ১৬ জুন যেসব পত্রিকা তখনও প্রকাশিত হতো, সেগুলোর মধ্যে চারটি বাদে বাকি সবকটি বন্ধ করে দিলেন।
এই চতুর্থ সংশোধনী ছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্র এবং এর জনগণের বিরুদ্ধে করা আদিপাপ। এর মাধ্যমে সদ্যস্বাধীন শিশুরাষ্ট্রটিকে একটি দল ও গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করা হয়। বীজ রচনা করা হয় দীর্ঘমেয়াদি অসন্তোষ ও অস্থিতিশীলতার, রক্তপাত ও রাষ্ট্রবিপর্যয়ের। এটিকে কোনো সাংবিধানিক দলিল না বলে বাংলাদেশের নব্য শাসকশ্রেণির দলটির ফ্যাসিবাদী মনস্তত্ত্বের ব্লুপ্রিন্টও বলা যায়।
বাহাত্তর সালেই বাংলাদেশের সাংবাদিকরা কৃষ্ণ ষোলো খ্যাত ১৬ জুনের আভাস পেয়ে গিয়েছিলেন। বছরের শেষ দিনে বাসসের প্রধান সম্পাদক ফয়েজ আহমদ চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। কারণ, তিনি শেখ মুজিবের জনসভায় করা একটি উক্তিকে সংবাদে স্থান দেওয়ার অপরাধে বাসসের একজন সাংবাদিককে বরখাস্ত করতে আপত্তি জানান। অথচ সেই একই বক্তব্য বাংলাদেশ বেতারেও প্রচারিত হয়েছিল। এতকিছু জানা সত্ত্বেও শেখ মুজিব স্বয়ং সংবাদটি প্রত্যাহার এবং সাংবাদিকের চাকরিচ্যুতির নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এর পরদিন, অর্থাৎ ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারিতে ভিয়েতনামে মার্কিন বোমাবর্ষণের প্রতিবাদে ছাত্র ইউনিয়নের মার্কিনবিরোধী কর্মসূচিতে গুলি চলে এবং দুজন ছাত্র নিহত হন। গুরুতর পরিস্থিতি বিবেচনা করে দৈনিক বাংলা সেদিন বিকালেই বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। বরাবরের মতো শেখ মুজিব ক্ষিপ্ত হন এবং সঙ্গে সঙ্গে সম্পাদনা পরিষদের চেয়ারম্যান হাসান হাফিজুর রহমান ও সম্পাদক তোয়াব খানকে পত্রিকার দায়িত্ব থেকে অপসারণ করে তথ্য মন্ত্রণালয়ে ওএসডি করে রাখা হয়। ছাত্রলীগের সভাপতি শহীদুল ইসলাম এ ঘটনায় মন্তব্য করেন, দৈনিক বাংলা থেকে দুজন পাকিস্তানি দালালকে অপসারণ করা হয়েছে। অথচ তারা দুজনই ছিলেন কঠোররকম স্বাধীনতাপন্থি। তোয়াব খান তো স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রেই কাজ করতেন। এভাবে যারাই তখন সরকারের বা শেখ মুজিবের বিন্দুমাত্র সমালোচনা করেছেন, তাদেরই কপালে ‘রাজাকারের’ তকমা জুটেছে। এমনকি ছাত্রলীগের সভাপতি এও বলেছেন যে, যেসব পত্রিকা ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘জাতির পিতা’ অভিধা ব্যবহার করবে না, তাদের জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলা হবে। (প্রেস আন্ডার মুজিব রেজিম, কাকলী প্রকাশন, ২০০২)
সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ এই দুই প্রথিতযশা সাংবাদিকদের ব্যাপারে তদবির করতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, তিনিই পত্রিকার মালিক এবং সাংবাদিকদের ইচ্ছামতো লেখার কোনো স্বাধীনতা নেই। দৈনিক বাংলাই সেই সময় প্রচারে শীর্ষে ছিল । এ ঘটনার পর পত্রিকাটি শুধু জনপ্রিয়তাই নয়, স্বাধীনতাও হারায়।
পরিহাস হলো, ছাত্র ইউনিয়নের যে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কর্মসূচির সংবাদ করার জন্য দৈনিক বাংলার এহেন পতন, সেই সংগঠনটিই ১৯৭২ সালের ২৬ জানুয়ারি দৈনিক বাংলা অফিস ঘেরাও করে। পত্রিকাটি সদ্যই ভারতে নির্বাসন-ফেরত মওলানা ভাসানীর একটি সাক্ষাৎকার ছাপে। সেখানে ভাসানী বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ কারণে ছাত্র ইউনিয়ন মিছিল নিয়ে গিয়ে সাক্ষাৎকারগ্রহীতা সাংবাদিকের চাকরিচ্যুতির দাবি তোলে।
৩.
বাকশালপূর্ব সময়ে সংবাদপত্রজগতের সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ছিল জাসদ সমর্থিত পত্রিকা গণকণ্ঠের ওপর নিপীড়ন। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ দেশে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। সরকার নিয়ন্ত্রিত অর্থাৎ৭২ সালের গোড়ায় জাতীয়কৃত পত্রিকাগুলো আওয়ামী লীগের পক্ষে ‘কেন আপনি আওয়ামী লীগকে ভোট দেবেন’- জাতীয় ভাষায় খোলাখুলি প্রচার চালায়। কিন্তু গণকণ্ঠ, সংবাদসহ দু-একটি পত্রিকা ভোট জালিয়াতি, কেন্দ্র দখলের কিছু খবর প্রকাশ করে।
নতুন সংসদের অধিবেশন বসার আগেই সরকার গণমাধ্যম বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। গণকণ্ঠ পত্রিকাটি ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবের প্রধান বিরোধী হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়। সম্পাদক হিসেবে ছাপা হতে থাকে কবি আল মাহমুদের নাম। এ ছাড়া এখানে বাংলাদেশ শিল্পী সংসদের কার্যক্রমও চলতে থাকে। এতে উপস্থিত থাকেন কবি শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দীন, শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুণ ও শিল্পীরা। ৭৩-এর নির্বাচনের পরপরই গুণসহ দেশের সেরা কবি-সাহিত্যিক গণকণ্ঠে সরকার থেকে অনুগত প্রকাশক বসানো হয়। সেই প্রকাশক যেখান থেকে পত্রিকাটি ছাপা হতো, সেই জনতা প্রিন্টিং প্রেসে গণকণ্ঠের এখতিয়ার রদ করে দেন- যেটা ছিল আদতে পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তি। গণকণ্ঠ ভবন থেকে সাংবাদিক ও কর্মচারীদেরও বের করে দেওয়া হয়। তখন পর্যন্ত অবশ্য এর লাইসেন্স বাতিল হয়নি।
গণকণ্ঠ যদিও জাসদের প্রচারপত্রে পরিণত হয়েছিল এবং অনেকক্ষেত্রে তা সাংবাদিকতার রীতিনীতিও লঙ্ঘন করত, তারপরও যে প্রক্রিয়ায় গণকণ্ঠের টুটি টিপে ধরা হয়, সেটা ছিল ঘোরতরভাবে অগণতান্ত্রিক। এমনকি এর সম্পাদক কবি আল মাহমুদ- যিনি তার সোনালী কাবিন কবিতামালার জন্য ততদিনে কবিমহলে সুপ্রতিষ্ঠিত- গ্রেফতার হন।
ডিইউজে ১৯৭৩ সালের ৩১ মার্চ গণকণ্ঠের সঙ্গে সংহতি জানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৭ জন শিক্ষক প্রতিবাদী বিবৃতি দেন। ১৫ দিন বন্ধ থাকার পর গণকণ্ঠ সিকান্দার আবু জাফরের সমকাল মুদ্রায়ণ থেকে আপাতত পত্রিকা ছাপার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়।
১১ আগস্ট পুলিশ সিলগালা করে দেয় চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দেশবাংলা পত্রিকা। এ ঘটনায় দুজন সাংবাদিক ও আটজন প্রেসকর্মীকে আটক করা হয়। পরে অন্যরা মুক্ত হলেও বার্তা-সম্পাদক মৃণাল চক্রবর্তীকে ছাড়া হয় না ।
সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ তার প্রেস আন্ডার মুজিব রেজিম গ্রন্থে মন্তব্য করেন, ‘১৯৭৩ সাল ছিল সংবাদপত্রজগতের জন্য সবচেয়ে ঘটনাবহুল বছর। এই বছরই জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ‘প্রিন্টিং প্রেসেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস অর্ডিন্যান্সে’র পক্ষে ভোট দেন। ...আইনটি ভাষাগত দিক থেকেও অনেকক্ষেত্রেই হুবহু সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের আইনকেই অনুসরণ করে।’ আইয়ুব ও মুজিবের করা এ আইনই ছিল সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধের প্রধানতম হাতিয়ার।
অকাতরে তরুণ বিপ্লবীদের ওপর রক্ষীবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ দেখে ক্ষুব্ধ সাংবাদিক নির্মল সেন ১৯৭৩ সালের ১৪ মার্চ রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত দৈনিক বাংলায় ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখে সরকারের জবাবদিহিতা দাবি করেন।
একই বছর এবং একই পত্রিকায় সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ ফারাক্কা বাঁধের কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলোর ওপর ‘এপার পদ্মা, ওপার গঙ্গা’ শিরোনামে দুই পর্বের একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন; কিন্তু সরকারের হস্তক্ষেপে দ্বিতীয় অংশটি আর প্রকাশিত হয়নি (গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন, ২০২৫)।
মাহফুজ উল্লাহ তার সুগবেষিত গ্রন্থে একটি ঘটনার উল্লেখ করেন, যা থেকে সংবাদমাধ্যম এবং সত্য প্রকাশের সঙ্গে শেখ মুজিবের সম্পর্কের একটা আদল ধরা পড়তে পারে। যিনি কিনা স্বাধীনতাপূর্বকালে সংবাদপত্র ও নাগরিক অধিকারের জন্য লড়াই করেছেন, জেল খেটেছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন; তিনি তার শাসনামলে তার বা তার দলের অথবা তার পরিবারের কোনো সদস্যের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়— এমন যেকোনো সংবাদের ক্ষেত্রে তীব্র অসহিষ্ণু হয়ে উঠতেন।
৪.
প্রিন্টিং প্রেসেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৩ সংসদে আলোচনার জন্য উত্থাপিত হওয়ার দুই সপ্তাহ আগের ঘটনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলের সামনে, রাত সাড়ে ১০টার দিকে চার যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। ডেইলি মর্নিং নিউজের নারীপাতা ফেমিনার সম্পাদক বিলকিস রহমান এই ঘটনা চাক্ষুষ করেন। তার স্বামী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. বি ওয়াজিউর রহমান। সে সুবাদে তারা ওই এলাকাতেই থাকতেন। ঘটনাটি বিলকিস রহমানের মনে তীব্র অভিঘাত ফেলে। তিনি মর্নিং নিউজ পত্রিকায় ‘ইন মেমরি অব আওয়ার মার্টায়ার্স’ শিরোনামে ১৯৭৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ছোট্ট একটি লেখা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি লেখেন: ‘বিলকিস রহমানের কলম বাংলাদেশের বর্তমান গণবিরোধী ফ্যাসিস্ট রেজিমের দোসরগিরি করতে রাজি নয়। আমাদের ঘরের দরজার সামনে আমাদের সন্তানদের বর্বরভাবে হত্যা করা হচ্ছে, অথচ বর্তমান সরকারের প্রতিটি অঙ্গ এমন ভাব করছে যে সবকিছু ঠিকঠাক আছে। গত বৃহস্পতিবারের এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড কারা করেছে তা কি আমরা জানতে পারি? আজ কোথায় প্রেসিডেন্ট আবু সাঈদ চৌধুরীর বিবেক? এসব এবং আরো অনেক রহস্যপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর আমাদের পেতে হবে... বাংলাদেশের বীর জনগণ জিন্দাবাদ।’
বিলকিস রহমান তার লেখার শেষে বলেন, ‘বাংলাদেশের বীর জনগণ তোমাদের ওপর জুলুমকারীদের ধ্বংস করো। শৃঙ্খল ছাড়া তোমাদের হারানোর কিছু নেই। বাংলাদেশের বীর জনগণ জিন্দাবাদ’ (অনুবাদ লেখকের)।
এই চার হত্যাকাণ্ডের খবর মর্নিং নিউজ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ৮ সেপ্টেম্বর। খবরে বলা হয়, ওই ঘটনায় বেঁচে যাওয়াদের একজন টিএন্ডটি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র ইদ্রিস জানায়, শুক্রবার সকালে সে নিহত আজাদের সঙ্গে শাহজাহানপুর কলোনিতে বসে গল্প করছিল। হঠাৎ টয়োটা জিপে করে আসা সশস্ত্র ব্যক্তিরা তাদের জোর করে গাড়িতে তোলে। বন্দুকধারীরা সঙ্গে সঙ্গে তাদের হাত-পা বেঁধে ফেলে। জিপটি এরপর আসে মতিঝিলের মধুমিতা সিনেমা হলের কাছে। সেখান থেকে বন্দুকের মুখে আরও তিনজনকে তোলা হয়। তাদেরও হাত-পা-মুখ বেঁধে ফেলা হয়। বন্দিদের নিয়ে জিপটি শহরের একটি অভিজাত এলাকার ফুটবল ক্লাবে আসে। সেখান থেকে তাদের ঘটনাস্থলে নিয়ে গুলি করা হয়। গুলি করার সময় দুষ্কৃতকারীরা তাদের চোখ বেঁধে ফেলে বলে জানায় বেঁচে যাওয়া ছেলেটি।
লেখাটি প্রকাশের দিনই বিলকিস রহমান তার চাকরিটি হারান। ১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত পত্রিকায় একটি ছোট্ট ক্ষমাপ্রার্থনা ছাপা হয়। তাতে বলা হয়: গতকাল আমাদের সাপ্তাহিক ফেমিনা পৃষ্ঠায় যা প্রকাশিত হয়েছে তার জন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থনা করি। এই ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মাহফুজ উল্লাহ লিখছেন, দুদিন পরে, সাদা পোশাকের পুলিশ মিজ রহমানকে তার বাড়ি থেকে দুপুরের খাবারের সময়ের আগে তুলে নিয়ে যায়। পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের দফতরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে নেওয়া হয় শেখ মুজিবের কাছে। মুজিব প্রথমে তাকে তিরস্কার করেন। তাতে কাজ না হওয়ায় বিদেশে অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে পাঠানোর কথা বলে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করেন। মিজ রহমান ছিলেন তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের আত্মীয়া। অবশেষে এই বলে মিজ রহমানকে নীরব করে দেওয়া হয় যে, ‘এসব বেকুবি বন্ধ করো। তোমার ভাগ্য ভালো যে স্বাধীনতার ২১ মাস পরেও তুমি জীবিত আছো।’
বিলকিস রহমানকে সেদিন রাত ৮টার দিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সম্ভবত ড. কামাল হোসেনের আত্মীয় বলে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। এ ঘটনাটিকে সংবাদ, সাংবাদিকতা, সাধারণ নাগরিকের প্রতি শেখ মুজিবের মহানুভবতা ও নিষ্ঠুরতার উদাহরণ হিসেবে পাঠ করা যায় ৷
১৯৭৪ সাল জুড়ে বাংলাদেশের সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে বিএফইউজের নেতৃবৃন্দ সরকার ও গণমাধ্যমের মধ্যে একটা সেতুবন্ধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। সেতুটি ভেঙে পড়ে যখন ১৯৭৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জাসদের মিছিলে গুলি চালানো হয়। এ ঘটনায় সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী ছয়জন প্রাণ হারান, বেসরকারি হিসাবে সংখ্যাটি ছিল ১২ জনের মতো এবং আহত শতাধিক। ঘটনার পরপরই রক্ষীবাহিনী জাসদের মুখপত্র গণকণ্ঠ পত্রিকার অফিস দখল করে এবং মধ্যরাতে সব পত্রিকা ও ছাপার উপকরণ বাজেয়াপ্ত করে। গণকণ্ঠ সম্পাদক আল মাহমুদ গ্রেফতার হন ১৯৭৪ সালের ১৮ মার্চ। ১৭ থেকে ৩১ মার্চ পত্রিকাটির মুদ্রণ বন্ধ থাকে।
এ ঘটনার প্রথম প্রতিবাদ সংঘটিত করে ডিইউজে, পরদিন ১৯ মার্চ। প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএফইউজের মহাসচিব গিয়াস কামাল চৌধুরী। এতে বক্তৃতা দেন জনপদ সম্পাদক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রেসিডেন্ট এনায়েতুল্লাহ খান। ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন আহমেদ, দ্য পিপলের নির্বাহী সম্পাদক আনোয়ার জাহিদ প্রমুখ।
৫.
গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণাত্মক এসব ঘটনাবলির ধারাবাহিকতায় সাংবাদিক সমাজ সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। ১৯৭৪ সালের ৫ জুন গঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয় সম্পাদক পরিষদ। এর সদস্যরা হলেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, এহতেশাম হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, নুরুল ইসলাম পাটোয়ারী এবং এনায়েতুল্লাহ খান। নজরকাড়া বিষয় হলো- বাংলার বাণীর সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মণিও এই পরিষদে ছিলেন, যিনি এর আগে নিজের পত্রিকায় হলিডে সম্পাদককে অসভ্য ভাষায় সমালোচনা করেন। এমনকি তার নোংরা আক্রমণ থেকে রেহাই পাননি এনায়েতুল্লাহ খানের স্ত্রীও। সম্পাদক পরিষদে আরও ছিলেন সাংবাদিক আলী আশরাফ, শহীদুল হক, শামসুল হুদা, গোলাম রসুল মালিক, জাওয়াদুল করিম ও আফতাবউদ্দীন আহমেদ।
পরিষদ আল মাহমুদের মুক্তি দাবি করে। তবে পরে এই পরিষদ আর গুছিয়ে উঠতে পারেনি। এর মধ্যে সংবাদপত্র দফতরে বোমা ও পটকা নিক্ষেপ করা হয়। পাশাপাশি সরকারের মধ্যে সরকারি মালিকানাধীন সংবাদপত্রের মালিকানার ধরন পরিবর্তনের চিন্তার কথাও শোনা যায়।
সরকার সংবাদপত্র প্রকাশ আরও কঠিন করে তুলতে নিউজপ্রিন্টের দাম বাড়িয়ে দেয়। সরকারই ছিল এর উৎপাদক ও বিক্রেতা। ১৯৭১ সালের আগে নিউজপ্রিন্টের দাম ছিল টনপ্রতি ১১৪০ টাকা। ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে তা করা হয় ২১৫০ টাকা। ১৯৭৪ সালের মার্চে তা আরও বাড়িয়ে করা হয় ৩২০০ টাকা প্রতি টন। বৃদ্ধির এই হার ছিল ৪৮ শতাংশ। এমনকি পাকিস্তান আমলের অর্ডিন্যান্স ব্যবহার করে খোলাবাজারে নিউজপ্রিন্ট বিক্রিও নিষিদ্ধ করা হয়। অথচ দৈনিক ইত্তেফাক জানায়, খুলনার নিউজপ্রিন্ট মিলে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার নিউজপ্রিন্ট অবিক্রীত পড়ে রয়েছে।
এসবের প্রতিক্রিয়ায় গঠিত হয় সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সংবাদপত্র পরিষদ (বিএসপি)। বিএফইউজে এসব নিপীড়নমূলক আদেশ বাতিলের দাবিতে দেশের প্রথম সাংবাদিক ও নাগরিক সম্মেলনের ঘোষণাও করে। কিন্তু এর আগেই দেশের শাসনব্যবস্থায়ও বড় পরিবর্তন আসে।
চুয়াত্তর সাল শেষ হয় প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদউল্লাহর জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণার মাধ্যমে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী কার্যকর হয় । শেখ মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হন। সবরকম ভিন্নমত স্তব্ধ করায় একদলীয় বাকশাল শাসন কায়েম হয়। দুদিন পর ২৭ জানুয়ারি পুলিশ গণকণ্ঠ অফিস দখল করে।
পরের ইতিহাস গুটিকয়েক বাদে একে একে সব সম্পাদকের বাকশালে যোগদানের ইতিহাস। পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, সাংবাদিকরা রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টার কোনো কমতি করেননি।
খেয়াল করার বিষয়, বাকশাল ঘোষণার সঙ্গে-সঙ্গেই কিন্তু সংবাদপত্রের ওপর নিষিদ্ধের কোপ পড়েনি। সংবাদপত্রগুলোর মালিকানার কী করা হবে, সাংবাদিক-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের ভেতর-বাইরে অনেক আলোচনা চলে। কিন্তু সাড়ে তিন মাস পর বাকশাল তার পুরোনো বন্দোবস্তেই ফিরে যায়। ১৯৭২ সালে যেভাবে জাতীয়করণের নামে পত্রিকাগুলোকে কুক্ষিগত করা হয়েছিল। এবারকার পরিণতি বরং আরও খারাপ। সরকার এবার নিষিদ্ধকরণের দিকে চলে যায়। ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন সরকার সংবাদপত্র ঘোষণা (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এক লহমায় নিষিদ্ধ হয়ে যায় ২৯টি দৈনিক এবং ১৩৮টি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র ও সাময়িকীর প্রকাশনা। কেবল দুটি ইংরেজি এবং দুটি বাংলা জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্র সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে রাখার অনুমতি দেওয়া হয়। এ চারটি সংবাদপত্রের মধ্যে দ্য বাংলাদেশ অবজারভার ও দৈনিক বাংলা আগে থেকেই সরকারি নিয়ন্ত্রণেই ছিল। অন্য দুটি সংবাদপত্র ছিল শেখ ফজলুল হক মণির মালিকানাধীন দ্য বাংলাদেশ টাইমস এবং প্রয়াত তফাজ্জল হোসেনের (মানিক মিয়া) উত্তরসূরিদের মালিকানাধীন দৈনিক ইত্তেফাক। বলা দরকার, ইত্তেফাকের মালিক পরিবারের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের পারিবারিক সম্পর্ক সুবিদিত ছিল। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউট (আইপিআই) তাদের ১৯৭৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলেছিল, ‘সরকারি দৈনিক পত্রিকা ছাড়া সব সংবাদপত্রের ওপর ১৬ জুনের স্থগিতাদেশ দেশের সংবাদপত্রের স্বাধীনতার শেষ চিহ্নের অবসান ঘটিয়েছে।’
৬.
জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হওয়ার আগেই গণমাধ্যমের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার শুরু হয়। বাকশালের শাসনব্যবস্থা বাতিল করে মোশতাক সরকার সংবাদপত্র ঘোষণা (সংশোধন) অধ্যাদেশ (১৯৭৫) বাতিল করে। এর ফলে নিষিদ্ধ সংবাদপত্রগুলো তাদের প্রকাশনা পুনরায় শুরু করার সুযোগ পায়। অনেক সাংবাদিকের জন্য এর অর্থ ছিল অনিশ্চয়তার অবসান এবং পেশায় প্রত্যাবর্তনের সুযোগ। জেনারেল জিয়াউর রহমান পরবর্তী সময়ে দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে দৈনিক বার্তা নামে সরকারি অর্থায়নে একটি নতুন সংবাদপত্র চালু করেন; সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের জন্য প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি) প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর দায়িত্ব দেন শেখ মুজিবের রোষানলে পড়া বাংলাদেশ অবজারভারের সম্পাদক আবদুস সালামকে।
জিয়াউর রহমান সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি সালিশ সংস্থা হিসেবে প্রেস কাউন্সিল গঠন করেন এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের জন্য একখণ্ড সরকারি জমি ইজারা করে দেন।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র ধ্বংসের আদিপাপ যদি হয়ে থাকে শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগের চতুর্থ সংশোধনী, তবে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বেলায় আদিপাপ ছিল ১৯৭৫ সালের ১৬ জুনের সংবাদপত্র ঘোষণা (সংশোধন) অধ্যাদেশ।
যদি বহুদলীয় গণতন্ত্র বিকশিত করতে হয় তবে বহুমত পথের সংবাদমাধ্যমের পথও সুগম রাখতে হবে। সংবাদপত্রের কৃষ্ণ ষোলোই পেরিয়ে অনেক পত্রিকাই আবার ফিরে এসেছে; কিন্তু শেখ ফজলুল হক মণির বাংলার বাণীর পক্ষে আর উঠে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি। উগ্র মতবাদিকতা, দলান্ধতা, আর সাংবাদিকতার সম্পর্ক আদা ও কাঁচকলার সম্পর্কের মতোই অস্বাস্থ্যকর।
সমাজ-রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদীকরণ একদিনে হয় না, তা ধাপে ধাপেই অগ্রসর হয়। বাঘের আগে আসে ফেউ, তেমনি যখনই দেখা যাবে কোনো শক্তি বা সরকার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীন বিকাশকে বাধা দিচ্ছে এবং তৈরি করছে সাংবাদিক নামধারী অনুগত ফেউ- ধরে নিতে হবে স্বৈরাচারী বাঘের আক্রমণ আসন্ন।