১০ জুন ২০২৬, ১১:১৪ পিএম
দেশের মানুষ উদয়াস্ত পরিশ্রম করে। দেশের বাইরে শ্রম দিয়ে দেশে টাকা পাঠানোর জন্য, দেশে অনেক কষ্টে সঞ্চিত অর্থ নিরাপদ কোনো ব্যাংকে গচ্ছিত রাখার ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংক একটি নির্ভরযোগ্য ঠিকানা হিসেবে আস্থা অর্জন করেছিল। গ্রাহক সেবা দেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সেরা ব্যাংক হিসেবে বিবেচিত হতো এটি।
দেশের মালিক দাবিদার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ; দলীয় লোকেদের দিয়ে ‘ফার্মার্স ব্যাংক’-এর মতো বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান খুলে ‘ইসলামী ব্যাংক’-এর মতো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারাকাত যেহেতু গবেষণা করে দেখিয়েছিলেন; ইসলামী ব্যাংকের লাভের কিছু অর্থ মৌলবাদী জঙ্গিদের দেওয়া হয়; আওয়ামী লীগ তাই ভেবেছিল, ফার্মার্স ব্যাংকের মতো অসাম্প্রদায়িক চেতনার ব্যাংক লাভের কিছু অর্থ যৌগবাদী সন্ত্রাসীদের দিতে পারবে।
কিন্তু ফার্মার্স ব্যাংকের স্তম্ভ ধরে নাড়াচাড়া করে অসাম্প্রদায়িক চেতনার লোকেরা ব্যাংকটি পারিবারিকভাবে খেয়ে নেয়। এরকম অন্যান্য অসাম্প্রদায়িক চেতনার আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের অর্থ ডাকাতি করে পিকে হালদার হয়ে যায়।
অসাম্প্রদায়িক চেতনা যেহেতু ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়তে পারছে না; তখন ফর্মুলা ১৯৭২ সাল প্রয়োগ করা ছাড়া আওয়ামী লীগের সামনে আর কোনো উপায় ছিল না। ১৯৭২ সালে অবাঙালি ও হিন্দুদের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করে যেভাবে সম্পূর্ণ নতুন একটি বুর্জোয়া শ্রেণি তৈরি করা হয়েছিল; তেমন কিছু করার লক্ষ্যে ‘জামায়াত’-এর আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল করো; এমন অসাম্প্রদায়িক সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়।
রংপুরের চরের কিংবা গোপালগঞ্জের বাথানের গরিব ছেলেদের নকশি ফতুয়া পরিয়ে; শেরাটন হোটেলের ঠান্ডা গোশত খাইয়ে চুল্লি গরম করা শুরু হয়। গোয়েন্দা সংস্থার দেশপ্রেমিক লোকদের দিয়ে নামের সঙ্গে ইসলাম থাকা ব্যাংক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করে এস আলম জন্ম নিলেন হাসিনাপাকের রহমতে। গ্রাহক সেবায় শীর্ষ অবস্থানে থাকা ইসলামি ব্যাংক খেয়ে যৌগবাদী সন্ত্রাসীদের ডিজাইনার টিশার্ট-রোলেক্স ঘড়ি পরিয়ে ওয়েস্টিনে পেস্ট্রি ও পাপিয়ার আসরে মাতোয়ারা হয় অসাম্প্রদায়িক চেতনা।
জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে হাসিনার ফ্যাসিজম তার দিল্লি প্রভুর কাছে পালিয়ে গেলে; ইসলামী ব্যাংকটিকে অতীতে যারা প্রফেশনালি চালিয়েছিল; তাদের ব্যবস্থাপনার অধীনে দেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগের নেতা মহীউদ্দীন খান আলমগীরের ফার্মার্স ব্যাংক; বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের ঢাকা ব্যাংক অবশ্যই থাকতে পারে। যেহেতু নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ঠিক করা হয়েছিল; পালা করে দুটি রাজনৈতিক দল দেশ-জনগণ-অর্থনীতির অতীন্দ্রিয় পিং পং সেবা করবে। মহীউদ্দীন খান আলমগীর ফ্যামিলি ডিনারে ব্যাংক খেয়ে ফেললে; মির্জা আব্বাসের ব্যাংক টিম টিম করে আলো দিতে থাকলে; তখন থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার; ইসলামী ব্যাংকের গৌরি সেন।
বিএনপি ক্ষমতায় এসেই ইসলামী ব্যাংক গড়ার মহান প্রত্যয় নিয়ে সংসদে নেমে যায়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সংশ্লিষ্ট লোকের ব্যাংক থাকতে পারবে। কিন্তু জামায়াত সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যাংক থাকতে পারবে না। এমনকি ইসলামী ব্যাংক পেশাদার ব্যাংক বলে সেখানে গ্রাহক হওয়া লোকেদের জামায়াত ডেকে দিলেই কেল্লাফতে; সজনে চচ্চড়ি সমাজ সে পুলকে হেসে একটু খেলনা আভিজাত্যের উত্তরীয় পরে নিতে পারে।
আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, সিপিবি যেকোনো দলের সংশ্লিষ্ট লোকেরা যদি প্রফেশনালি একটা ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করতে পারে; সেটা দেশের অর্থনীতির জন্য উপকারী। বেড়ালটা সাদা নাকি কালো; তা জেনে আমার কাজ কী! সে ইঁদুর মারতে পারে কি না, সেটা দেখা প্রয়োজন।
কিন্তু আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সংশ্লিষ্ট লোকেরা যেহেতু সফল ও পেশাদার আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়তে পারেন না বলে স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫ বছরে প্রমাণিত হয়েছে; তাই বসন্তের কোকিল নিজে বাসা তৈরি না করে পরিশ্রমী কাকের বাসায় ডিম পেড়ে বাচ্চা ফুটিয়ে নেবে।
মুশকিলটা হচ্ছে বুমারস-জেন এক্স-মিলেনিয়াল কতিপয়; ওপর চালাকি করে চালিয়ে নেওয়া পুরনো বস্তাপচা ব্যবস্থা-চিন্তাগুলো; পটিয়ার আঞ্চলিক সুরে চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করছে জেনজি ও জেন আলফার ওপর। ফলে সংসদের জাস্টিফিকেশনমূলক বক্তব্যগুলো স্ট্যান্ড আপ কমেডির মতো কৌতুক পরিবেশন করছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে পর্যন্ত এই কৌতুকগুলো খুব সিরিয়াস আলাপ হিসেবে পরিবেশিত হতো। ৫ আগস্টের পর নতুন প্রজন্মের নতুন ব্যবস্থার আলোড়ন তৈরি হবার পর; পুরনো ব্যবস্থার কচকচানি; দেশ লুন্ঠনের ফন্দি ফিকির হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারের ঢং-টিই চোখে পড়ে। ২০০৯ সালে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-সাংসদেরা যেমন নব্য জমিদারের ঢঙে বিএনপিকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কথা বলতো; ২০২৬ সালে রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে বিএনপি একই ঢঙ্গে কথা বলছে জামায়াতের সঙ্গে। আওয়ামী লীগের ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যে যেমন ভাটিয়ালি রস উপচে পড়তো; বিএনপির সালাউদ্দিন আহমেদের বক্তব্যে তেমনি ভাওয়াইয়া রস উপচে পড়ছে।
বিএনপির ক্ষমতা গ্রহণের অল্প কিছুকাল অতিবাহিত হয়েছে। ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় দুধের মাছিও জড়ো হয়েছে কিছু। জীবনে যোগ্যতা ও পরিশ্রম দিয়ে ‘মাসলোর হায়ারার্কি অফ নিড’ পূরণ করতে পারে না যারা; তাদের জন্য ক্ষমতার ‘পা পূজা’ই মোক্ষলাভের একমাত্র পথ। পাওয়ার করিডোরে অন্ধ আনুগত্য আর স্থূল ভাঁড়ামি দিয়ে এরা টেকা-টুকার ধান্দায় ঘুরছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এদের জাস্টিফিকেশন কলা দেখে বোঝার উপায় নেই; আওয়ামী লীগ আমলের দেজাভু কি না!
দেশের সাধারণ মানুষ ইজম ফিজমের নিকুচি করে। তারা জানে জামায়াতে ইসলাম মানে ইসলাম নয়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল মানে জাতীয়তাবাদ নয়, গেরুয়া প্রগতিশীলতা মানে প্রগতিশীলতা নয়। নির্ভরযোগ্য ব্যাংক কেউ গড়তে পারলে; মানুষ সেখানে রেমিট্যান্স পাঠাবে, উন্নত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেউ গড়লে; মানুষ সেখানে সন্তানকে পড়তে পাঠাবে; প্রফেশনাল হাসপাতাল গড়লে, মানুষ সেখানে স্বাস্থ্যসেবা নিতে যাবে। ভালো পণ্য কেউ উৎপাদন করলে, মানুষ তা কিনবে।
যার সার্ভিস ভালো; জনগণ তার সার্ভিস নেবে। এই সোজা হিসাবটা না কষে ৫৫ বছর ধরে ভাটের কেত্তন আর একঘেয়ে সারিন্দা বাজিয়ে পুরনো রাজনৈতিক দলগুলো দেশবাসীকে এতো বিরক্ত করেছে যে; নতুন করে তাদেরকে বিরক্ত করার আর কোনো মানে হয় না।
লেখক: মাসকাওয়াথ আহসান, এডিটর ইন চিফ, ই-সাউথএশিয়া