images

মতামত

ইসলামী ব্যাংকের নেতৃত্বে চাই বিশেষায়িত জ্ঞান ও দক্ষতা

ঢাকা মেইল ডেস্ক

০৯ জুন ২০২৬, ০৩:৫৭ পিএম

বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং এখন আর কোনো প্রান্তিক বা পরীক্ষামূলক আর্থিক ব্যবস্থা নয়। দেশের ব্যাংকিং খাতের একটি বড় অংশ আজ ইসলামী ব্যাংকিং নীতির আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। কোটি কোটি আমানতকারী ও বিনিয়োগগ্রহীতার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এই খাত সরাসরি জড়িত। ফলে ইসলামী ব্যাংকগুলোর পরিচালনা, নীতি নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনার প্রশ্নটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি জনআস্থা, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং একটি বিশেষ ব্যাংকিং দর্শনের ভবিষ্যতের সঙ্গেও সম্পর্কিত। এ কারণেই ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনা নিয়োগের ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

একটি প্রচলিত ব্যাংক এবং একটি ইসলামী ব্যাংকের মধ্যে পার্থক্য শুধু নামের নয়; পার্থক্য রয়েছে তাদের মৌলিক দর্শন, ব্যবসায়িক কাঠামো এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিতে। ইসলামী ব্যাংকিং সুদভিত্তিক লেনদেনের পরিবর্তে অংশীদারত্ব, সম্পদনির্ভর অর্থায়ন এবং ঝুঁকি ভাগাভাগির নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ফলে এমন একটি ব্যবস্থার নেতৃত্বে যদি এমন ব্যক্তিরা থাকেন, যাদের ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মৌলিক ধারণা, শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়ন পদ্ধতি কিংবা সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির নীতিগত স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো দুর্বল হলে বা সেখানে পেশাগত যোগ্যতার পরিবর্তে অন্য বিবেচনা প্রাধান্য পেলে তার ফলাফল শেষ পর্যন্ত পুরো ব্যাংকিং খাতকেই ভোগ করতে হয়। রাজনৈতিক প্রভাব, গোষ্ঠীগত স্বার্থ কিংবা ব্যবসায়িক সুবিধার ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনেক ব্যাংককে সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইসলামী ব্যাংকগুলোও এ বাস্তবতার বাইরে নয়। বরং ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে সংকট আরও গভীর, কারণ এখানে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি শরিয়াহসম্মত কার্যক্রমের প্রতি মানুষের বিশ্বাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অনেক সময় দেখা যায়, ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বা উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের সাধারণ ব্যাংকিং বা করপোরেট ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতা থাকলেও ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কে জ্ঞান সীমিত। তারা হয়তো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার প্রশাসনিক দিকগুলো সামাল দিতে পারেন, কিন্তু ইসলামী অর্থায়নের জটিল কাঠামো, শরিয়াহ গভর্ন্যান্স, শরিয়াহ কমিটির ভূমিকা কিংবা আন্তর্জাতিক ইসলামী আর্থিক মানদণ্ডের গুরুত্ব যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেন না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে শরিয়াহ পরিপালনের বিষয়টি একটি আনুষ্ঠানিকতা বা কাগুজে প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সফল উদাহরণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিশেষায়িত জ্ঞানকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ কিংবা আন্তর্জাতিক ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা বলছে, পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় ইসলামী অর্থনীতি ও ব্যাংকিং সম্পর্কে দক্ষ ব্যক্তিদের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠানকে শুধু শরিয়াহসম্মত রাখে না, বরং ব্যবসায়িকভাবে আরও শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে। কারণ ইসলামী ব্যাংকিংয়ের নিজস্ব পণ্য, ঝুঁকি ও পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জগুলো বুঝতে বিশেষ জ্ঞানের প্রয়োজন হয়।

Bank2
ইসলামী ব্যাংক নিয়ে চলছে টানাপোড়েন। ছবি: সংগৃহীত

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসলামী ব্যাংকিং জ্ঞানকে অগ্রাধিকার দেওয়া মানে অন্য পেশাগত যোগ্যতাকে অস্বীকার করা নয়। বরং প্রয়োজন হলো দুই ধরনের দক্ষতার সমন্বয়। একজন পরিচালক বা প্রধান নির্বাহীর অবশ্যই ব্যাংকিং, অর্থনীতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং আর্থিক খাতের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তবে ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকিং ও শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়ন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণাও থাকতে হবে। এই সমন্বয় ছাড়া ইসলামী ব্যাংকের নেতৃত্ব পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।

বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও এই খাতের জন্য বিশেষায়িত মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এখনও অনেক ঘাটতি রয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের জন্য ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, পেশাগত সনদ এবং নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। কারণ একটি ইসলামী ব্যাংকের নেতৃত্ব কেবল শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ নয়, আমানতকারীদের বিশ্বাস এবং পুরো খাতের সুনামের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী ব্যাংকগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচনে পেশাগত যোগ্যতা, সততা এবং ইসলামী ব্যাংকিং জ্ঞানকে সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। ইসলামী ব্যাংক যদি তার স্বাতন্ত্র্য, বিশ্বাসযোগ্যতা ও জনআস্থা ধরে রাখতে চায়, তাহলে নেতৃত্বের প্রশ্নে আপস করার সুযোগ নেই।

ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত শক্তি তার মূলধন নয়, তার প্রতি মানুষের আস্থা। আর সেই আস্থা রক্ষা করার প্রথম শর্ত হলো এমন নেতৃত্ব নিশ্চিত করা, যারা ইসলামী ব্যাংকিংয়ের দর্শন, নীতি ও প্রয়োগ সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত এবং সে অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সক্ষম। তাই ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিয়োগে ইসলামী ব্যাংকিং জ্ঞানকে অগ্রাধিকার দেওয়া কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; বরং এটি একটি স্বাভাবিক, যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী দাবি। বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সুস্থ বিকাশ ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার স্বার্থেই এই বিষয়টিকে নীতিগতভাবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

লেখক: ইসলামি অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার; উপদেষ্টা, সেন্টার ফর ইসলামিক ইকোনমিকস, ঢাকা