ঢাকা মেইল ডেস্ক
০৮ জুন ২০২৬, ০৭:২১ পিএম
আজ সকালে ইসলামী ব্যাংকে একটি শাখায় যেতে হয়েছিল। এই শাখাতে আমার অ্যাকাউন্ট আছে। একজন নারী কর্মকর্তার সাথে লেনদের সংক্রান্ত আলোচনার সময় আরও দুজন গ্রাহক এলেন। তারা তিন মাস মেয়াদি ফিক্সড ডিপোজিট ভাংতে চান। এই নারী কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলাম মানুষ কি জমানো টাকা তুলে নিচ্ছে? কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বললেন, হ্যাঁ, মানুষ তার টাকা চাইলে তো ফেরত দিতে হবে। প্রতিদিন এভাবে ১০- ১২ জন করে জমানো টাকা তুলে নিচ্ছেন। অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংক এখন রান আউটের পথে।
আজকে বিভিন্ন দৈনিকে খবর এসেছে, গত সোম থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চার কর্মদিবসে প্রায় দুই হাজার ৫৭০ কোটি টাকার মতো উত্তোলন করা হয়েছে। গতকাল রোববার প্রায় এক হাজার কোটি টাকার মতো উত্তোলন হয়েছে। এতে পাঁচ কর্মদিবসেই উত্তোলনের অঙ্ক প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা।
ব্যাংকটির এই পরিস্থিতি দেখে নির্বাচনের এক মাস আগের একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। একটি টেলিভিশনের টকশোতে সরকারের একজন কৌশলবিদ ও সরকারপন্থী এক সাংবাদিকের সাথে আলোচনা হচ্ছিল। হঠাৎ করে আলোচনা মোড় নিলো ইসলামী ব্যাংকের দিকে। তাদের মূল বক্তব্য হলো একটি ব্যাংকে কি এভাবে দলীয় লোক নিয়োগ দেওয়া যায়? আমি বলছিলাম, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চাইলে তাদের নিয়মনীতি মেনে যে কাউকে নিয়োগ দিতে পারে। তবে শুধু ইসলামী ব্যাংক কেন – সব প্রতিষ্ঠানে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া উচিত।
সাবেক বামপন্থী বিএনপি নীতি নির্ধারকের শরিয়া আইন এবং ইসলামী ব্যাংকিং নিয়েও আছে জোরালো আপত্তি তিনি মনে করেন আসলে ইসলামী ব্যাংকও সুদ নেয় তবে ভিন্নভাবে। যেহেতু ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে আমার তেমন কোনা জ্ঞান নেই। স্বাভাবিক ভাবে এই বির্তকে আমি যোগ দিইনি।
আজকে ইসলামী ব্যাংকের সমস্যার মূলে রয়েছে বিএনপির নীতি নির্ধারকদের বদ্ধমূল ধারণা- ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে জামায়াত লাভবান হচ্ছে। জামায়াতের অর্থনৈতিক শক্তি ধ্বংস করতে হলে ইসলামী ব্যাংকে তাদের সম্পৃক্ততা বন্ধ করতে হবে। এই নীতি নির্ধারকরা জানেই না জামায়াতের রাজনৈতিক অর্থের যোগান কীভাবে আসে। সেখানে ইসলামী ব্যাংক না থাকলেও তাদের তেমন কিছু আসে যায় না। কিন্তু এই নীতি নির্ধারকদের বদ্ধমূল ধারণা জামায়াতকে চালায় এই ব্যাংক। আবুল বারাকাতের চিন্তার দৌড়ের মধ্যে এদের দৌড় সীমিত।
আমার ধারণা, ইসলামী ব্যাংক রান আউট হওয়াতে বিএনপির উগ্র বামধারার নীতি নির্ধারকরা খুশি হবেন। ইসলামী ব্যাংকের পতনের মধ্যদিয়ে দেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের যে অপরা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল তা পুরোপুরিভাবে ধ্বংস হবে।
বিএনপির নীতি নির্ধারকদের বড় একটি অংশ এর প্রভাব নিয়ে মোটেও চিন্তিত নন। তারা সরলভাবে মনে করেন, টাকা তুললেও মানুষ কোনো না কোনো ব্যাংকে টাকা রাখবে। ফলে ইসলামী ব্যাংক রান আউট হলেও তাতে অর্থনীতির খুব বেশি ক্ষতি হবে না। মানুষ অন্য ব্যাংকে আমানত রাখবে।
কিন্তু সরকারের এর পরের ধাক্কা আসবে রেমিটেন্স প্রবাহের ওপর। যারা রেমিটেন্স পাঠান তারা দেখবেন যদি সুদি ব্যাংকে তাদের টাকা পাঠাতে হয় তাহলে হুন্ডিতে পাঠাতেও তাদের কোনো সমস্যা নেই। বরং বেশি টাকা পাওয়া যাবে। অতিরিক্ত টাকা দরকার হলে দান খয়ারত করবেন। এটি হবে দেশের জন্য দীর্ঘস্থায়ী মারাত্মক ক্ষতির কারণ। একইভাবে দেশের টেক্সটাইল, গার্মেন্টস ও জাহাজ শিল্পে ইসলামী ব্যাংকের যে বিশাল বিনিয়োগ ছিল সেগুলোর অনেকগুলো বাজে ঋণে পরিণত হবে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন দলের ভেতরে থাকা বামপন্থীরা সে দলগুলোর বিপর্যয়ের জন্য বড় কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিএনপি অতীতেও এই সমস্যায় পড়েছে। বামপন্থীরা যদি দেশের মানুষের পালস এতো ভালোই বুঝতেন তাহলে তারা বিএনপি-আওয়ামী লীগে যোগ না দিয়ে বাম দলের নামে রাজনীতিতে সফল হতেন। বিএনপির শক্তিশালী রাজনীনৈতিক অবস্থানের পেছনে যে ইসলামি মূল্যবোধের সম্পর্কের বিষয়টি আছে তা এই বামপন্থীরা কোনোভাবেই মানতে নারাজ। ইসলামী ব্যাংক ধ্বংস করেছে হাসিনার মাফিয়া এস আলম, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের কাছে এখন প্রতীয়মান হচ্ছে বিএনপি ইসলামী ব্যাংক ধ্বংসের মূল কারিগর। হাসিনা, রেহানা আর এস আলমের ভূমিকা চাপা পড়ে যাচ্ছে।
মানুষ কেন ইসলামী ব্যাংকে টাকা রাখে তার মনস্তাত্বিক কারণ বিএনপির এই আল্ট্রা সেক্যুলার কৌশলবিদরা বুঝতে পারেননি। ইসলামী ব্যাংকে টাকা রাখার পেছনে আমানতের নিশ্চয়তার পাশাপাশি সুদের প্রভাব থেকে দূরে থাকার জন্য মানুষ টাকা রাখে। আর এখানেই রয়েছে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগের বিষয়টি। ইসলামী ব্যাংকে চাকরির ক্ষেত্রে কিছু বিশেষায়িত জ্ঞানের দিকে লক্ষ্য রাখা হয়।
ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগের ক্ষেত্রে যে মৌলিক প্রশ্নগুলো করা হয় তাতে ইসলামী ব্যাংকিং সংশ্লিষ্ট কিছু প্রশ্ন থাকবেই। সুদ কিংবা ইসলামী অর্থব্যবস্থাসংক্রান্ত কোরআন-হাদিস থেকে নানা প্রশ্ন আছে। এ ক্ষেত্রে মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ড কিংবা জামায়াত বা শিবিরের ছেলেরা কিছুটা হলেও এগিয়ে থাকে। এছাড়া এই ব্যাংকের শুরুতে উদ্যোক্তাদের অনেকে জামায়াতের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট থাকায় তার প্রভাব থাকাটা তো স্বাভাবিক।
আমি জানি আব্দুল জলিলের মার্কেন্টাইল ব্যাংকে পলাতক এক আওয়ামী সাংবাদিকের স্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। আওয়ামী সাংবাদিকের স্ত্রী স্বামীর পরিচয়ের কারণে দ্রুত পদোন্নতি পেয়েছিলেন। বিএনপি নেতাদের ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানে এমন বহু ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যাবে।
শেষে বলতে চাই, ইসলামী ব্যাংকের ওপর আস্থা হারানোর কারণে মানুষ মনে করবে বিএনপি ইসলামী ব্যাংকিং চায় না। বিএনপি সুদমুক্ত ব্যাংকিংয়ের বিরোধী। এগুলো মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভের তৈরি করবে। সরকারের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে জমে ওঠা ক্ষোভ কিন্তু এক সময় বিস্ফোরণের কারণ হয়। শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়ার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির পরিচয় যদি আওয়ামী লীগের মতো ইসলামবিদ্বেষী দলের মতো মানুষ ভাবতে থাকে তাহলে এরচেয়ে দুঃখজনক বিষয় আর কিছু হবে না।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট