০৫ জুন ২০২৬, ১১:৫৯ এএম
আজ ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস। প্রতিবছরের মতো এবারও আমরা পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো—আমাদের চারপাশে এক নতুন ধরনের বিপদ নীরবে বিস্তার লাভ করছে, যার নাম ই-বর্জ্য (Electronic Waste)। ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে এই ই-বর্জ্য এখন একটি ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত সংকটে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, রাউটারসহ নানা ধরনের ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রযুক্তির এই বিস্তার নিঃসন্দেহে উন্নয়নের প্রতীক। তবে এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যবহৃত ও অচল ইলেকট্রনিক পণ্যের পরিমাণ, যা যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকায় পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ই-বর্জ্যের মধ্যে থাকা সীসা, পারদ, ক্যাডমিয়ামসহ নানা বিষাক্ত উপাদান মাটি, পানি ও বায়ুকে দূষিত করে। এসব উপাদান মানবদেহে প্রবেশ করলে ক্যানসার, স্নায়বিক সমস্যা, শিশুদের মেধাবিকাশে বাধাসহ নানা জটিল রোগ সৃষ্টি করতে পারে। অথচ বাংলাদেশে এখনো ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য শক্তিশালী ও কার্যকর নীতিমালা এবং বাস্তবায়ন কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
বর্তমানে দেশের অধিকাংশ ই-বর্জ্য অনানুষ্ঠানিক খাতে সংগ্রহ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হয়, যেখানে নিরাপত্তা মানদণ্ডের কোনো বালাই নেই। শিশু ও শ্রমিকেরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে এসব বর্জ্য ভেঙে মূল্যবান অংশ সংগ্রহ করছে, যা একদিকে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশকে করছে আরও বিপজ্জনক।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, সরকারকে একটি সমন্বিত ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়ন ও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, উৎপাদক ও আমদানিকারকদের ‘Extended Producer Responsibility (EPR)’ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা পণ্যের জীবনচক্র শেষে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তৃতীয়ত, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর রিসাইক্লিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
পাশাপাশি সাধারণ জনগণের মধ্যেও সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। আমরা অনেকেই পুরোনো মোবাইল বা ইলেকট্রনিক পণ্য যথেচ্ছভাবে ফেলে দিই, যা পরবর্তীতে পরিবেশ দূষণের কারণ হয়। তাই প্রত্যেক নাগরিককে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে এবং নির্ধারিত সংগ্রহব্যবস্থার মাধ্যমে ই-বর্জ্য জমা দিতে হবে।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকের অধিকার রক্ষা ও ডিজিটাল সেবার সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা মনে করি, একটি টেকসই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলে পরিবেশ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—প্রযুক্তির উন্নয়ন হবে, কিন্তু তা কখনোই পরিবেশের বিনিময়ে নয়। ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা একটি বিষাক্ত পৃথিবী উপহার দেব। তাই আসুন, সবাই মিলে সচেতন হই, উদ্যোগী হই এবং একটি নিরাপদ ও সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন
এমআর