images

মতামত

হাসপাতাল চিকিৎসা কেন্দ্র, মৃত্যু ঠেকানোর নিশ্চয়তাকারী নয়

০২ জুন ২০২৬, ০৪:১৬ পিএম

হাসপাতাল নিয়ে জনসাধারণের মাঝে এক ধরনের প্রত্যাশা রয়েছে, যা বাস্তবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন তাদের প্রত্যেকেই প্রত্যাশা করেন, স্বল্পতম সময়ে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করে হাসপাতাল ত্যাগ করতে পারবেন। 

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আরোগ্য লাভের প্রক্রিয়া কারও কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘ হয়। সব রোগী সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করেন না, আংশিক আরোগ্য ও আংশিক অসুস্থতা নিয়েও হাসপাতাল ত্যাগ করেন। সমস্ত প্রত্যাশার বিপরীতে কিছু রোগী মারা যান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। 

কেউ না চাইলেও এটাই বাস্তবতা, যেটি মানতে পারেন না অনেকেই। ফলাফল হিসেবে যেসব সেবা প্রদানকারী অক্লান্ত পরিশ্রম করে চেষ্টা করেছেন সুস্থ করার, তাদের উপরেই চড়াও হন রোগীর আত্মীয়-স্বজন। ভাঙচুর করেন হাসপাতালের স্থাপনা। তারা ভুলে যান, হাসপাতাল চিকিৎসা দেয়, চেষ্টা করে আরোগ্যের, কিন্তু মৃত্যু ঠেকানোর নিশ্চয়তা দিতে পারে না।

হাসপাতালে আগত বিশেষত: জরুরি বিভাগে আগত রোগী ও তার স্বজনেরা মনে করেন, ডাক্তার দেখালেই রোগী ভালো হয়ে যাবেন। তাই তারা দ্রুততম সময়ে ডাক্তারকে প্রত্যাশা করেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ডাক্তার দেবদূত নন এবং এই রোগী ছাড়াও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন (জরুরি বিভাগে আগত একাধিক রোগীর ক্ষেত্রসহ) অন্য রোগীদেরও তার দেখভালের দায়িত্ব রয়েছে। 

ফলে ডাক্তার আসতে দেরি হলে অথবা ডাক্তার দেখার আগে প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষাদি (শ্বাস-প্রশ্বাস মাপা, পালস মাপা, রক্তচাপ মাপা ইত্যাদি) অন্য স্বাস্থ্যকর্মী (নার্সসহ) করলেও রোগীরা ক্ষুব্ধ হন। সেই ক্ষুব্ধতা অনেক সময়েই সেবা প্রদানকারী ডাক্তারসহ অন্যান্য কর্মীদের শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করা থেকে হাসপাতাল ভাঙচুর পর্যন্ত গড়ায় ।

হাসপাতাল এবং ডাক্তার, নার্সসহ অন্যান্য কর্মীরা রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্যই নিয়োজিত। সেই সেবাদানকারীদের লাঞ্ছিত করে কিংবা সেবা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে ক্ষতি সবচেয়ে বেশি সেবা প্রত্যাশীদের। ভাঙচুরের ফলে হাসপাতাল বন্ধ হলে কর্তৃপক্ষের আর্থিক ক্ষতি হয়। বন্ধ হাসপাতালের সেবাদানকারী ডাক্তার, নার্সসহ অন্যরা অন্যত্র নিয়োজিত হয়ে যান। কিন্তু হাসপাতালের অবর্তমানে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন সেবাপ্রত্যাশীরা, যার ফলাফল অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুও হতে পারে।

ঢাকার মগবাজারাস্থ আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৭ মে ভোরে ছয়টি নবজাতকের মৃত্যুতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অথচ এই হাসপাতালটি দীর্ঘদিনের নিরলাস প্রচেষ্টায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের সাধ্যের মধ্যে মানসম্মত সেবা, বিশেষত: প্রসূতি, নবজাতক ও শিশুদের সেবাদানের নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠেছে। 

আদ-দ্বীন হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৭০ জন প্রসূতি বাচ্চা প্রসব করেন। এই হাসপাতালে রয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ শতাধিক শষ্যা বিশিষ্ট নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র, যা অত্যাধুনিক ও আন্তর্জাতিক সেবা প্রদানের জন্য স্বীকৃত। 

ফলে হাসপাতালটি প্রতিদিন গড়ে ১৪০ জন নবজাতককে চিকিৎসা দিয়ে আসছে। এই সাফল্যকে ম্লান করে দেওয়ার প্রচেষ্টা লক্ষিত হচ্ছে ছয় নবজাতকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। যেকোনো মৃত্যুই অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক। এর জন্য সরকারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছেন। তদন্তের ফলাফল পাওয়া যায়নি। 

এদিকে মৃত্যুর কারণ এখনো জানা যায়নি। কাউকে এখনো দায়ী করা হয়নি। কিন্তু হাসপাতালে প্রতিদিনের চিকিৎসাসেবাকে ব্যাহত করা হচ্ছে, যা অন্যান্য সেবা প্রত্যাশীদের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করছে। 

লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন