ঢাকা মেইল ডেস্ক
০২ জুন ২০২৬, ০৩:৫৬ পিএম
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা সংকট ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। খেলাপি ঋণের বিস্তার, করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি, রাজনৈতিক প্রভাব, মালিকানা নিয়ে বিতর্ক এবং নিয়ন্ত্রণ দুর্বলতা—সব মিলিয়ে আর্থিক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এই বাস্তবতায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নতুন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে- একটি ব্যাংককে কি আমরা তার আর্থিক কর্মদক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করব, নাকি রাজনৈতিক ও আদর্শিক পরিচয়ের আলোকে বিচার করব?
যেকোনো ব্যাংকের মূল শক্তি হলো আমানতকারীর আস্থা। সেই আস্থা গড়ে ওঠে দীর্ঘ সময় ধরে, কিন্তু ভেঙে পড়তে সময় লাগে না। গড়া কঠিন ও সময়সাপেক্ষ, ভাঙা সহজ ও ত্বরিৎ। দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি হিসেবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি লাখো আমানতকারী, প্রবাসী বাংলাদেশি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। ফলে এ ব্যাংককে ঘিরে যেকোনো অস্থিরতা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়, বরং সামগ্রিক আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আলোচনা প্রায়ই অর্থনীতি ও ব্যাংকিংয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিতর্কে রূপ নেয়। অথচ একটি ব্যাংকের সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণের মানদণ্ড হওয়া উচিত তার মূলধন সক্ষমতা, সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা, আমানতকারীর নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা অনুসরণের সক্ষমতা। কোনো প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে ‘ইসলামি’ শব্দ যুক্ত থাকলেই তাকে সন্দেহের চোখে দেখা যেমন যুক্তিসঙ্গত নয়, তেমনি সেই পরিচয়ের কারণে তাকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়াও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিকাশ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আর্থিক সেবা গ্রহণের আগ্রহ, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়ন এবং বিকল্প ব্যাংকিং ব্যবস্থার চাহিদা থেকেই এই খাতের সম্প্রসারণ ঘটেছে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছে। রেমিট্যান্স আহরণ, গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচি এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণে প্রতিষ্ঠানটির অবদান দেশের আর্থিক ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, ইসলামি ব্যাংকিং খাত নানা সময়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, মালিকানা পরিবর্তন, দুর্বল তদারকি এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেসব অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি ও সুশাসনের সংকট নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তার অধিকাংশই ইসলামি ব্যাংকিংয়ের মৌলিক দর্শনের কারণে নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের ফল।
এ কারণেই এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ইসলামি ব্যাংকিংকে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় না বানিয়ে একটি আর্থিক খাত হিসেবে দেখা। প্রয়োজন শক্তিশালী আইনগত কাঠামো, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক তদারকি, স্বচ্ছ মালিকানা ব্যবস্থা, কার্যকর শরিয়াহ গভর্ন্যান্স এবং আমানতকারীর স্বার্থ সুরক্ষার নিশ্চয়তা। ইসলামী ব্যাংক হোক বা প্রচলিত ব্যাংক—সবার জন্য একইভাবে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা ভীষণ জরুরি।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা অপরিহার্য। সেই লক্ষ্য অর্জনে কোনো ব্যাংককে রাজনৈতিক বন্ধু বা শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ব্যাংককে ব্যাংক হিসেবেই দেখতে হবে—একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে, যার সফলতা বা ব্যর্থতার মাপকাঠি হবে পেশাদারিত্ব, সুশাসন ও জনগণের আস্থা।
ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে চলমান বিতর্কের মধ্যেও এই মৌলিক সত্যটি স্মরণ রাখা জরুরি: আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা নষ্ট হলে শুধু একটি ব্যাংক নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো অর্থনীতি। তাই ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হোক রাজনৈতিক অবস্থান থেকে নয়, বরং আর্থিক স্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে।
লেখক: ইসলামি অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার, সমাজ চিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী