images

মতামত

আরাফাতের নিম গাছ ও জিয়াউর রহমান

৩১ মে ২০২৬, ১০:০৯ এএম

সম্ভবত: সময়টা ছিল ১৯৭৭ সালে জুলাই মাস। ইতিহাসে সুনির্দিষ্ট তারিখের উল্লেখ পাওয়া না গেলেও সেটা ছিল বাংলাদেশের শ্রম বাজার সৃষ্টির ঐতিহাসিক টার্নিং পয়েন্ট। এই টার্নিং পয়েন্টের নেতা ছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। গত বছর জানুয়ারিতে ওমরা পালনকালে আরাফাত ময়দানের নিমগাছগুলো আমাকে স্মরণ করিয়ে দিল সেই ঐতিহাসিক সময়ের কথা।

তখন সৌদি আরবের বাদশা ছিলেন খালিদ বিন আব্দুল আজিজ। তারই আমন্ত্রণে সে সময় বাংলাদেশের তরুণ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গিয়েছিলেন সৌদি আরব সফরে। তখন জিয়াউর রহমানের বয়স ছিল মাত্র ৪০ বছর। আর সে সফরেই রচিত হয় দুদেশের মধ্যে সম্পর্কের নয়া দিগন্ত। সদ্য স্বাধীন হওয়া পাঁচ বছর বয়সী একটি রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে জিয়াউর রহমানের প্রথম সৌদি আরব সফরের ঘটনা নানা কারণে ইতিহাসে অম্লান হয়ে আছে।

প্রথমত: ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ো হওয়ার পর পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিলেও সৌদি আরব স্বীকৃতি দেয় অনেক পরে। পাকিস্তানের সঙ্গে অত্যন্ত ভালো সুসম্পর্ক থাকার কারণে দেশটি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া থেকে বিরত ছিল।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর বাংলাদেশ সৌদি আরবের স্বীকৃতি লাভ করে। ঠিক পরের দিন ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট সেই স্বীকৃতি এসেছিল। ঠিক সেই থেকে শুরু হয় দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায়। তাই জিয়াউর রহমান ছিলেন প্রথম বাংলাদেশি কোন রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি সরকারিভাবে সর্বপ্রথম ওই দেশটি সফর করেন।

দ্বিতীয়তঃ সেই সফরে জিয়া রহমান সৌদি বাদশার জন্য উপঢৌকন হিসাবে নিয়ে গিয়েছিলেন কতকগুলো নিম গাছের চারা। সাধারণত সৌদি বাদশারা অনেক দামি দামি উপঢৌকন পেয়ে থাকেন। কিন্তু এবার ঘটল অন্যরকম দৃশ্য। তিনি পেলেন কিছু নিম গাছের চারা। জিয়াউর রহমানের সফরসঙ্গীদের মধ্যে অনেকে বাদশার প্রতিক্রিয়া কেমন হয় সেটা বোঝার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সৌদি বাদশা খালিদ বিন আব্দুল আজিজ সবাইকে অবাক করে দিয়ে খুবই সানন্দে সেই উপহার গ্রহণ করেছিলেন। কারণ তিনি মরুভূমিতে নিম গাছের উপকারিতা সম্পর্কে আগেই অবহিত ছিল।

এখানে উল্লেখ করতে হয় যে, মরুভূমির পরিবেশ রক্ষা ও ভূমিক্ষয় রোধে নিম গাছের ভূমিকা অপরিসীম। এটির শিকড় মাটির অতি গভীরে প্রবেশ করে মাটিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। যার ফলে ঝড়ে বালু রাশি অন্যত্রে উড়ে গিয়ে ক্ষয় সৃষ্টি করে না। এছাড়া নিম গাছ অত্যাধিক পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড ছেড়ে বিশুদ্ধ অক্সিজেন তৈরি করে। সুতরাং মরুভূমিতে এর উপকারিতা অনেক অনেক বেশি। সেটা বাদশা জানতেন বলেই, নিমের চারা উপহার পেয়ে তিনি খুবই খুশি হয়েছিলেন।

দ্বিতীয়তঃ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা সময়, সৌদি বাদশা নিম গাছের চারা পেয়ে তার সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশে বিশাল অর্থনৈতিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান ছিলেন অন্য ধাতের মানুষ। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষ গরিব হতে পারে; কিন্তু তারা পরিশ্রমী। সুতরাং আমাদের আর্থিক সাহায্যের প্রয়োজন নেই। বরং সৌদি আরবের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আমাদের জনগণ সহায়তা করতে পারে। আপনি বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি আমদানি করে সহায়তা করতে পারেন। এই প্রস্তাবকে সৌদি বাদশা তাৎক্ষণিকভাবেই গ্রহণ করেন। আর সেই থেকে শুরু হয়ে যায় বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে জনশক্তি রফতানির কার্যক্রম। আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের যে বিশাল অবদান আমরা দেখতে পাচ্ছি তার সূচনা করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সৌদি আরব থেকে।

পরবর্তীতে মরুভূমিতে নিম গাছের উপকারিতা সম্পর্কে সৌদি শাসকরা উপলব্ধি করেন এবং বাংলাদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ নিমচারা নিয়ে যান। জিয়াউর রহমানের লাগানো নিম গাছগুলো ছখন মহিরুহ হয়ে উঠেছে। সে গাছগুলো এখন জিয়া-ট্রি হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। সৌদি আরবের অধিবাসীরা এটাকে বলে ‘জিয়া সাজারা’। আর ননিম গাছের চারা কিভাবে দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্কের কঠিন ভিত্তি তৈরি করতে পারে তা বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যকার সম্পর্ক দেখলে তা বোঝা যায়। বিশেষ করে সৌদি শাসকরা পরবর্তীকালে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে জিয়াউর রহমানের অবদানকে আরো গৌরবান্বিত করেছিলেন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক