৩০ মে ২০২৬, ১১:১১ এএম
প্রতি বছর ৩০ মে গভীর শ্রদ্ধা ও বেদনার সঙ্গে স্মরণ করা হয় বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে। ১৯৮১ সালের এই দিনে চট্টগ্রামে এক নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তিনি। তার মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাবিধুর অধ্যায়।
জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকীতে দেশের মানুষ তার কর্মময় জীবন, রাষ্ট্রগঠনে অবদান এবং নেতৃত্বের নানা দিক স্মরণ করে। একই সঙ্গে ফিরে আসে সেই শোকাবহ দিনের স্মৃতি, যা শুধু বাংলাদেশকেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনকেও নাড়া দেয়।
তার মৃত্যুর পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও বিশিষ্ট নেতারা তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের কাছে শোকবার্তা পাঠান। এসব শোকবার্তায় জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা এবং বাংলাদেশের প্রতি তার অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তুলে ধরা হয়।
বিশ্বনেতাদের সেই শোকবার্তাগুলোতে প্রতিফলিত হয়েছে তারা জিয়াউর রহমানকে কীভাবে মূল্যায়ন করতেন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার অবস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বর্তমান প্রজন্মের জন্য সেই মূল্যায়নের কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হলো।
জাতিসংঘ মহাসচিব ডক্টর কুর্ট ওয়াল্ড হেইম, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিগ্যান, সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভ, চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্টাডি কমিটির চেয়ারম্যান ইয়ে জিয়াং ইইং ও প্রধানমন্ত্রী ঝাও জিয়ং ইয়াং, ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথ ও প্রধানমন্ত্রী মিসেস মার্গারেট থ্যাচার, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী, জাপানের সম্রাট হিরোহিতো, সৌদি আরবের বাদশাহ খালেদ, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুহার্তোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ও আন্তর্জাতিক দুনিয়ার নেতারা শোকবাণীতে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট এবং বিশ্বের একজন বিশিষ্ট নেতা হিসেবে শহীদ জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ও অবদানের কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। শোকবাণীর ভাষা স্বতন্ত্র ও ভিন্নধর্মী হলেও তাদের বক্তব্যে মূলত প্রেসিডেন্ট জিয়ার ভূমিকা ও অবদানের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দিকগুলোই প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায়, জাতীয় উন্নয়নে, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় এবং সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়ে তোলার সংগ্রামে প্রেসিডেন্ট জিয়ার অবদান স্মরণ করার পাশাপাশি বিশ্ব নেতারা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার ভূমিকা এবং অবদানের কথাও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার এই ভূমিকা ও অবদান দেশ-বিদেশে সুবিদিত ও স্বীকৃত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের অগ্রনায়ক প্রেসিডেন্ট জিয়া নিবেদিত ছিলেন স্বদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ রক্ষায়। দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও কর্মীপুরুষ জিয়া স্বদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে যেমন অক্লান্তভাবে চেষ্টা করেছেন, তেমনি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সদা তৎপর ছিলেন বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বের সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন ও কল্যাণের লক্ষ্যে।
চীনের প্রধানমন্ত্রী তার শোকবাণীতে বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তার জীবদ্দশায় ক্লান্তিহীনভাবে জাতীয় স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এবং জাতীয় অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতির জন্য কাজ করে গেছেন।
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও বিশ্বের জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট জিয়ার ঐকান্তিক আগ্রহ ও প্রচেষ্টার উল্লেখ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান শোকবাণীতে উল্লেখ করেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য গভীর আগ্রহ, আইনের শাসনের প্রতি নিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক বিষয় সম্পর্কে প্রজ্ঞার জন্য প্রেসিডেন্ট জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
আরও পড়ুন: একটি জাতির জন্ম
বস্তুত প্রেসিডেন্ট জিয়ার নেতৃত্ব এবং অসাধারণ গুণাবলি যেমন তাকে দেশে-বিদেশে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে; তেমনি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মর্যাদাও বাড়িয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে বাংলাদেশের গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভে, জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন ও ইসলামী সম্মেলনে বাংলাদেশ ও প্রেসিডেন্ট জিয়ার নেতৃত্বের ভূমিকা পালনে রয়েছে এর প্রকৃষ্ট পরিচয়। সমগ্র বিশ্বের বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি এবং বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের সংগ্রামে তিনি ছিলেন অতুলনীয়।
ইসলামী সম্মেলনের ভাইস চেয়ারম্যান ও ইসলামী শান্তি মিশনের অন্যতম নেতা হিসেবে ইরান-ইরাক যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টায় ও মুসলিম বিশ্বের সমস্যা সমাধানে প্রেসিডেন্ট জিয়া যে অবদান রেখে গেছেন, তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধিতে তার অবদান সম্পর্কে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মিসেস মার্গারেট থ্যাচার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমানের কাছে পাঠানো শোকবাণীতে বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডে আমি মর্মাহত; তার নেতৃত্ব ও দৃষ্টান্তে আপনাদের দেশ অগ্রগতি সাধন এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা অর্জন করছিল।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সুজুকি এবং আরো অনেকের শোকবাণীতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধিতে প্রেসিডেন্ট জিয়া যে অবদান রেখে গেছেন, তার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামী সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট জিয়ার ভূমিকার দিকটি প্রশংসার সাথে উল্লিখিত হয়েছে কাতারের তৎকালীন আমির শেখ খলিফা বিন হামাদ আল আনি, ইসলামী সম্মেলনের মহাসচিব হাবিব চাত্তি এবং মুসলিম বিশ্বের আরো অনেক নেতার শোকবাণীতে। জনাব চাত্তি বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক মৃত্যুতে ইসলামিক বিশ্ব একজন অত্যন্ত সুযোগ্য সন্তানকে হারাল। তিনি প্রেসিডেন্ট জিয়াকে একজন অনন্য সাধারণ নেতা বলে বর্ণনা করেন।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি হওয়া ছাড়াও বিশ্বের যে ক্ষতি হয়েছে তা বিভিন্ন দেশের এবং বিশ্ব নেতাদের শোকবাণী থেকে স্পষ্ট।
বিশ্ব নেতারা শোকবাণীতে গভীর বিশ্বাস ও আস্থাও প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশ এই শোক ও সঙ্কট কাটিয়ে উঠে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণ এবং জাতীয় উন্নয়নে দৃঢ়চিত্তে সঙ্কল্পবদ্ধভাবে এগিয়ে যাবে, বাংলাদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে সব প্রতিকূলতা ও সঙ্কটের মোকাবিলা করবে।
প্রেসিডেন্ট রিগ্যান তার শোকবাণীতে উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিককালের অগ্রগতি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য মর্মান্তিক ঘটনা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মানুষ দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন বলে তার বিশ্বাস। চীনের প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের বিশ্বাস, বাংলাদেশের জনসাধারণ শোককে শান্তিতে পরিণত করে মরহুম জিয়ার নির্দেশিত পথে কাজ করে যাবে এবং স্বাধীন ও সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে কঠোর পরিশ্রম করবেন।
বাংলাদেশের মানুষ কষ্টার্জিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কৃতসংকল্প এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পতাকা সমুন্নত রেখে, দেশ গঠন ও জাতীয় উন্নয়নে সচেষ্ট। এ দেশের মানুষ স্বাধীনচেতা এবং গণতান্ত্রিক আদর্শ, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী। গণতন্ত্র রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক আদর্শ, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ সুপ্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামেও তারা অবিচল।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাহাদতবার্ষিকীতে শোকাহত জাতি তার অবদানের এবং স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সাথে সাথে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অব্যাহত রাখার, গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ সুপ্রতিষ্ঠিত করার এবং দেশ গঠন, জনগণের ভাগ্যোন্নয়ন ও সুখী সমৃদ্ধশালী ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রচেষ্টা জোরদার করারও শপথ নিয়েছে এবং নিচ্ছে। তার আদর্শ, স্বপ্ন ও লক্ষ্যের বাস্তবায়নই হবে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন।
বাংলাদেশ সংবাদ বিশ্লেষণ
ঐক্যবদ্ধ জাতি যে আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সবচেয়ে বড় শক্তি তা ১৯৮১ সালে ৩০ মে তার দুঃখজনক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আবার প্রমাণিত হয়। আমাদের সব সময় জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সযত্নে রক্ষা করতে হবে।
লেখক: প্রধান তথ্য কর্মকর্তা
সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব
এআরএম