images

মতামত

বিশ্ব থাইরয়েড দিবস: থাইরয়েড ও পুষ্টির নিবিড় সম্পর্ক

২৫ মে ২০২৬, ০২:৫১ পিএম

প্রতি বছর ২৫ মে বিশ্বব্যাপী বিশ্ব থাইরয়েড দিবস পালিত হয়। থাইরয়েড গ্রন্থির রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এই ক্ষুদ্র কিন্তু শক্তিশালী গ্রন্থিটি আমাদের শরীরের সামগ্রিক সুস্থতায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তা প্রচার করাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। 

২০২৬ সালের থাইরয়েড দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বা থিম হলো ‘থাইরয়েড এবং পুষ্টি ‘। আমাদের খাদ্যাভ্যাস কীভাবে থাইরয়েডের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে এবং থাইরয়েড রোগীরা কীভাবে সঠিক পুষ্টির মাধ্যমে সুস্থ থাকতে পারেন, তা নিয়ে আজকের আলোচনা।

থাইরয়েড কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

আমাদের গলার নিচের অংশে শ্বাসনালীর সামনে অবস্থিত প্রজাপতি আকৃতির একটি ছোট গ্রন্থি হলো থাইরয়েড। দেখতে ছোট হলেও এর কাজ বিশাল। এটি প্রধানত দুটি হরমোন নিঃসরণ করে: থাইরক্সিন এবং ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন। এই হরমোনগুলো শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া, হৃদস্পন্দন, শরীরের তাপমাত্রা এবং শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করে। যখন এই গ্রন্থিটি প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন তৈরি করে, তাকে হাইপোথাইরয়েডিজম বলা হয়। আর যখন বেশি হরমোন তৈরি করে, তখন তাকে হাইপারথাইরয়েডিজম বলা হয়।

থাইরয়েড স্বাস্থ্যে পুষ্টির ভূমিকা

থাইরয়েড গ্রন্থিকে একটি ইঞ্জিনের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, যার সঠিক জ্বালানি হলো পুষ্টি। কিছু নির্দিষ্ট খনিজ এবং ভিটামিন ছাড়া থাইরয়েড হরমোন তৈরি করা অসম্ভব।

১. আয়োডিন: প্রধান কাঁচামাল

থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য আয়োডিন অপরিহার্য। আমাদের শরীর নিজে আয়োডিন তৈরি করতে পারে না, তাই এটি খাবার থেকে নিতে হয়। আয়োডিনের অভাবে গলগণ্ড রোগ এবং হাইপোথাইরয়েডিজম হতে পারে। তবে অতিরিক্ত আয়োডিন আবার হাইপারথাইরয়েডিজমের ঝুঁকি বাড়ায়।

উৎস: আয়োডিনযুক্ত লবণ, সামুদ্রিক মাছ, দুগ্ধজাত পণ্য এবং ডিম।

২. সেলেনিয়াম: হরমোনের সক্রিয়কারী

সেলেনিয়াম FT4 হরমোনকে সক্রিয় FT3-তে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করে। এটি থাইরয়েড গ্রন্থিকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করে।

উৎস: ব্রাজিল নাট, টুনা মাছ, মুরগির মাংস এবং সূর্যমুখীর বীজ।

৩. জিঙ্ক

জিঙ্ক থাইরয়েড হরমোন সংশ্লেষণ এবং নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জিঙ্কের অভাবে থাইরয়েডের কার্যকারিতা ধীর হয়ে যেতে পারে।

উৎস: গরুর মাংস, কুমড়ার বীজ, ছোলা এবং ডাল।

৪. আয়রন এবং ভিটামিন ডি

আয়রনের অভাব হলে থাইরয়েড এনজাইমের কার্যকারিতা ব্যাহত হয়। অন্যদিকে, গবেষণায় দেখা গেছে যে থাইরয়েড রোগীদের মধ্যে ভিটামিন ডি-এর অভাব প্রকট থাকে।

থাইরয়েড রোগীদের জন্য খাদ্যাভ্যাস: কী খাবেন আর কী এড়িয়ে চলবেন?
থাইরয়েড রোগীদের ক্ষেত্রে পুষ্টির ভারসাম্য রক্ষা করা একটি চ্যালেঞ্জ। অনেকের মনে ভ্রান্ত ধারণা থাকে যে থাইরয়েড হলে নির্দিষ্ট কিছু সবজি একদমই খাওয়া যাবে না।

সতর্কতা: গয়ট্রোজেনিক খাবার

বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকলি এবং সয়াবিন জাতীয় খাবারে গয়ট্রোজেন থাকে, যা আয়োডিন শোষণে বাধা দিতে পারে। তবে এর মানে এই নয় যে এগুলো পুরোপুরি বর্জন করতে হবে। রান্নার ফলে এসব খাবারের গয়ট্রোজেনিক প্রভাব অনেকটাই কমে যায়। তাই থাইরয়েড রোগীরা পরিমিত পরিমাণে রান্না করা ফুলকপি বা বাঁধাকপি খেতে পারেন।

আঁশযুক্ত খাবার ও পানি

হাইপোথাইরয়েড রোগীদের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা খুব সাধারণ। তাই প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। এটি বিপাক প্রক্রিয়াকে সচল রাখতে সাহায্য করে।

চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জন

থাইরয়েড ভারসাম্যহীনতা রক্তে শর্করার মাত্রায় প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত চিনি এবং রিফাইন করা কার্বোহাইড্রেট (যেমন সাদা ময়দা) ক্লান্তি বাড়ায় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে বাধা দেয়।

পুষ্টির সঙ্গে জীবনযাত্রার সমন্বয়

শুধু ভালো খাবার খেলেই হবে না, শরীর যাতে সেই পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে।

মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা কর্টিসল হরমোন বাড়িয়ে দেয়, যা থাইরয়েডের কাজে ব্যাঘাত ঘটায়।
পর্যাপ্ত ঘুম: হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম প্রয়োজন।

নিয়মিত ব্যায়াম: বিশেষ করে হাইপোথাইরয়েডিজমের রোগীদের অলসতা ও মেদ কমাতে হাঁটা বা ইয়োগা অত্যন্ত কার্যকর।

শেষ কথা

২০২৬ সালের বিশ্ব থাইরয়েড দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—সঠিক পুষ্টি গ্রহণ করা এবং থাইরয়েডের উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। মনে রাখবেন, একটি সুস্থ থাইরয়েড মানেই একটি প্রাণবন্ত এবং কর্মক্ষম জীবন। আপনার থালা সাজান প্রয়োজনীয় খনিজ ও ভিটামিন দিয়ে, আর শরীরকে রাখুন রোগমুক্ত।

লেখক: ডা. শাহজাদা সেলিম, সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডক্রাইনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)।