images

মতামত

‘বিদ্রোহী’র ‘আমি’ আমিত্ব নয়: প্রবল শক্তিমত্তাপূর্ণ শান্তিকামী ‘আমি’

২৩ মে ২০২৬, ০৭:১৬ এএম

আমিত্ব ও বীরত্বের বৈশিষ্ট্য একই রকম মনে হলেও অন্তর্গত পার্থক্য বিদ্যমান। অনমনীয়তা, দুঃসাহসিকতা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অবিচলতা ইত্যাদি আমিত্বের মধ্যে যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে বীরত্বের ভেতর। আমিত্ব শেখায় স্বার্থপরতা, সংকীর্ণতা, ঔদ্ধত্য, আত্মঅহংকার। পক্ষান্তরে বীরত্ব শেখায় উদারতা, মানবিকতা, ন্যায়পরায়ণতা, শিষ্ঠাচারিতা, শালীনতা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার ক্ষমতা এবং বীরত্ব স্বাধীনতা অর্জনে সর্বোৎভাবে উদ্বুদ্ধ করে।

আমিত্ব নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ব্যক্তিকে বিদ্রোহী করে এবং নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অন্যের ক্ষতি করতে অনুপ্রাণিত করে। কিন্তু বীরত্ব বিশ্বমানবতার মুক্তির জন্য কাজ করে, দুঃশাসন ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শেখায়। আমিত্ব যেকোনো লক্ষ্য অর্জনে অটুট থেকে ব্যক্তিকে অনুপ্রাণিত করে। তাই আত্মকল্যাণের জন্য এমন ব্যক্তি এক ধরনের বীরে রূপান্তরিত হয়। তবে এমন বীর নিজের স্বার্থের জন্য অন্যের শান্তি অনেক সময় ভঙ্গ করে।

আমিত্ব নিজে অর্থ সম্পদশালী হওয়ার জন্য অন্যের অর্থ-সম্পদ হরণ করতে শেখায় আর বীরত্ব নিজের শান্তির সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বশান্তির চিন্তা করে। নিজের আর্থিক স্বচ্ছলতার সঙ্গে বিশ্বমানবতার সচ্ছ্বলতার চিন্তা করে। নিজের দারিদ্র্য দূরীকরণের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের দারিদ্র্য দূরীকরণে কাজ করে। আমিত্ব সবাইকে হত্যা করে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা শেখায়। কিন্তু বীরত্ব নিজেকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে অন্যকে বাঁচিয়ে রাখতে সহায়তা করে।

আমিত্ব একটি রোগ। বীরত্ব একটি সুস্থতা। তাই ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ব্যবহৃত ‘আমি’ নজরুলের আমিত্ব নয় বরং বীরত্বের নামান্তর। অথচ সাধারণ মানুষের বীরত্ব আমিত্ব শেখায়। তাই সকল বীরত্ব আমিত্ব হলেও সকল আমিত্ব বীরত্ব নয়।

আমিত্ব ও ফ্যাসিজম

আমিত্ব ও ফ্যাসিবাদ-এই দুটি ধারণা আধুনিক রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। আমিত্ব বা আত্মকেন্দ্রিকতা ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে সম্পর্কের সংকট তৈরি করে, যা ফ্যাসিবাদের মতো দমনমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থার উত্থানে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। আমিত্ব বলতে বোঝায় আত্মকেন্দ্রিকতা, যেখানে ব্যক্তি নিজেকে সমাজের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করে। এই মনোভাবের ফলে ব্যক্তি সমাজের বৃহত্তর কল্যাণের চেয়ে নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।

কবি ও রাষ্ট্রকথক ফরহাদ মজহারের মতে, ‘বাংলাদেশে রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণের অভাব ছিলো, যা একটি দলীয় দলিলে পরিণত হয়েছে। এই আত্মকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে।’

nazruফ্যাসিবাদ একটি স্বৈরতান্ত্রিক রাজনৈতিক মতবাদ, যা ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের বিরোধিতা করে। চরম জাতীয়তাবাদ, একদলীয় শাসনব্যবস্থা, বাকস্বাধীনতার দমন, রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্যাতন, প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ- এ সমস্ত হলো ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য। আমিত্ব ও ফ্যাসিবাদ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। যখন ব্যক্তি নিজেকে সমাজের উপরে স্থান দেয়, তখন সে সমাজের নিয়ম-কানুন ও মূল্যবোধকে অবজ্ঞা করে। এই মনোভাব রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পৌঁছালে ফ্যাসিবাদী শাসনের জন্ম হয়।

বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের শেকড় অনেক গভীরে। বলা যায়-দেশ স্বাধীনের সঙ্গে সঙ্গেই। রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন, বাকস্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা, এবং একদলীয় শাসনের প্রবণতা এই উপসর্গগুলোর মধ্যেই পড়ে।

আমিত্ব ও ফ্যাসিবাদ সমাজের জন্য হুমকিস্বরূপ। ব্যক্তির আত্মকেন্দ্রিকতা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পৌঁছালে ফ্যাসিবাদী শাসনের জন্ম হয়। বাংলাদেশে এই প্রবণতা প্রতিরোধ করতে হলে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, এবং বাকস্বাধীনতার চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। সাংস্কৃতিক জাগরণ ও বুদ্ধিজীবীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এই প্রক্রিয়ায় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। কাজী নজরুল এসব বিষয় অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন বলেই ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখে ফ্যাসিবাদের মূলে শব্দকুঠার হেনেছিলেন।

আমিত্ব ও রোম্যান্টিসিজম

রোম্যান্টিসিজমের সকল বৈশিষ্ট্য ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ‘আমি’-এর মাঝে অনুপস্থিত। তবে আমি-এর মাঝে প্রবল কল্পনাশক্তি, বীরত্বব্যঞ্জক শব্দ চয়ন, সুস্থির ব্যক্তিত্বের বিকাশ বিদ্যমান। ‘আমি’ পদটি মাঝে মাঝে প্রেমিক হিসেবেও প্রতিভাত হয়েছে। সেই সকল আঙ্গিকে কিছু কিছু ক্ষেত্র রোম্যান্টিসিজমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কল্পনা শক্তি

রোম্যান্টিসিজমের অনত্যম বৈশিষ্ট্য হলো কল্পনা শক্তি। শক্তিশালী কবিমাত্রই অসীম কল্পনা শক্তির অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কাজী নজরুলও এর ব্যতিক্রম নন। নজরুল তার  কবিতা ও গানে পিবি শেলী কিম্বা বায়রন কারও চেয়ে কল্পনা শক্তির কম পরিচয় দেননি। বিদ্রোহী কবিতায় তিনি ১৫৮ বার আমি শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেকে কখনও পরশুরাম, কালফনি, টর্পেডো, মাইন, শঙ্ক, নটরাজ, সাইক্লোন। ধূর্জ্জটি, হাম্বীর, যজ্ঞ, পুরোহিত, কৃষ্ণ, সন্ন্যাসী, ব্যোমকেশ, বেদুঈন, চেঙ্গিস, পিণাক, ধর্মরাজ, ডমরু ত্রিশুল, বাসুকি, উল্কা, ধূমকেতু, বলরাম, ভৃগু প্রভৃতি হিসেবে নিজেকে কল্পনা করেছেন। কল্পনায় তিনি একটি শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছেন। তিনি একটি সৌহার্দপূর্ণ অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন দেশের সোনালী স্বপ্নে বিভোর ছিলেন।

স্বতঃস্ফূর্ত, আবেগী ও দূরদর্শী আমি

বিদ্রোহী কবিতায় ব্যবহৃত ‘আমি’ স্বতঃস্ফূর্ত, আবেগী ও দূরদর্শী। নজরুল তার সাহিত্য সাধনার সকল পরিকল্পনার সারাংশ হিসেবে এই ‘আমি’ ব্যবহার করেছেন। তিনি ‘আমি’কে প্রতিবাদী, মানবতাবাদী ও সমাজ সংস্কারক হিসেবে যেমন দেখিয়েছেন তেমনি আবার প্রেমিক, দরদী ও ভালোবাসার মূর্ত প্রতীক হিসেবেও ব্যবহার করেছেন।  ‘আমি’ শব্দটির মাধ্যমে ব্রিটিশদের কলোনিয়াল শাসন ও শোষণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যেমন ঘোরতর প্রতিবাদী তেমনি নিজের দেশের নেতাদেরও সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। সমগ্র ভারতের স্বাধীনতার জন্য তিনি কারাবরণ করে ভবিষ্যতের সত্য উপাস্যক নেতাদের উদাহরণ হয়েছেন। নিজে একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখেছেন তেমনি জাতিকে কবিতা ও গানের মাধ্যমে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। একটি কবিতা ‘বিদ্রোহী’তে তাই স্বতঃস্ফূর্তরূপে ১৫৮ বার ‘আমি’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এই ‘আমি’ যেমন স্বঃস্ফূর্ত তেমনি অসীম আবেগ ও দূরদর্শিতার পরিচায়ক।

শেক্সপিয়ারের শেষ লেখা ছিলো ‘টেমপেস্ট’। ‘টেমপেস্ট’কে বলা হয় শেক্সপিয়ারের সাহিত্য সমগ্রের সারাংশ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও শেষ জীবনে লিখে গেছেন ‘শেষের কবিতা’। এটিকেও বলে তার সাহিত্য ভাণ্ডারের সারাংশ। সবাই সারাংশ লিখেছেন শেষে। আর নজরুলের সাহিত্য জীবন শেষ হবে যখন, তখন তার এমন কিছু লেখার সক্ষমতা থাকবে না বলেই হয়তো তিনি ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ‘আমি’ কে বিভিন্নভাবে চিত্রিত করে গেছেন; যা তার সাহিত্য ভাণ্ডারের সারাংশ বলা যেতেই পারে।

লেখক: কবি, গীতিকার ও নজরুল গবেষক