images

মতামত

পানির ন্যায্য হিস্যার জন্য আর কত অপেক্ষা?

ঢাকা মেইল ডেস্ক

১৬ মে ২০২৬, ০৫:৪৭ পিএম

আজ ১৬ মে, শনিবার। ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস। বাংলাদেশের নদী, কৃষি ও জনজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক প্রতিবাদের আজ সুবর্ণজয়ন্তী। ঠিক ৫০ বছর আগে, ১৯৭৬ সালের এই দিনে পানির ন্যায্য হিস্যা এবং নদীর নাব্যতা রক্ষার দাবিতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ।

রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা ময়দান থেকে লাখো মানুষের অংশগ্রহণে সেই লংমার্চ যাত্রা শুরু হয় ফারাক্কা বাঁধ অভিমুখে। দীর্ঘ পদযাত্রা শেষে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট হাই স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয় বিশাল জনসভা, যেখানে জোরালো কণ্ঠে পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি তুলে ধরেন মজলুম জননেতা। সেই থেকেই ১৬ মে দিনটি ‘ফারাক্কা দিবস’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

ভারতের হুগলী নদীতে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা এবং কলকাতা বন্দর সচল রাখার যুক্তি সামনে এনে ভারত গঙ্গা নদীর ওপর নির্মাণ করে ফারাক্কা বাঁধ। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার উজানে ভারতের ভূখণ্ডে এই বাঁধের অবস্থান।

ফারাক্কা লংমার্চ শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ব্যাপক সাড়া ফেলে। বিশ্ব গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হয় সেই আন্দোলনের খবর। এর মধ্য দিয়ে ভাসানী নিজেকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন আফ্রো-এশিয়ার নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে।

সে সময় পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ায় বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ধীরে ধীরে মরুকরণের দিকে এগোতে শুরু করে। অর্ধশতক পেরিয়ে গেলেও সেই সংকট পুরোপুরি কাটেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা আরও প্রকট হয়েছে।

ফারাক্কা সমস্যার সূত্রপাত মূলত পঞ্চাশের দশকের গোড়ায়। গঙ্গা নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের ভারতীয় উদ্যোগের খবর পেয়ে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তীব্র প্রতিবাদ জানায়। জবাবে ১৯৫২ সালে ভারত জানায়, বিষয়টি অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। পরে ১৯৬০ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করলেও ১৯৬১-৬২ সালেই ভারত গোপনে নির্মাণকাজ শুরু করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগেই, ১৯৭০ সালে ফিডার খাল ছাড়া প্রায় পুরো বাঁধ নির্মাণ শেষ করে ফেলে তারা।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারত সরকার ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক সম্মতি ছাড়া তা সম্ভব হচ্ছিল না। পরে পরীক্ষামূলক ব্যবহারের কথা বলে ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত মাত্র ৪১ দিনের জন্য বাঁধ চালুর অনুমতি নেয় ভারত। কিন্তু সেই ‘সাময়িক’ চালুই শেষ পর্যন্ত স্থায়ী রূপ নেয়।

পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও বাস্তবে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ প্রত্যাশিত পানি পায়নি—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের ঠিক কত আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। কারণ এই ক্ষতি কেবল অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; কৃষি, নদী, পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ, নৌপথ, ভূগর্ভস্থ পানি, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এর বহুমাত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়েছে।

Farakka2

সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের ৬ কোটির বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নদী শুকিয়ে যাওয়া, সেচ সংকট, মাছের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি—এসবই এর প্রধান প্রভাব হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার ক্ষয়ক্ষতির ভিত্তিতে কিছু গবেষণা ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে।

ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মা, মহানন্দাসহ দেশের বহু বড় নদী আজ নাব্যতা হারিয়ে পরিণত হয়েছে বিস্তীর্ণ বালুচরে। একসময় প্রবহমান এসব নদীর অনেকগুলোই এখন মৃতপ্রায়। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মাসহ চারটি প্রধান নদী আজ অস্তিত্ব সংকটে।

ফারাক্কা লংমার্চের ৫০ বছর পূর্তিতে তাই নতুন করে উচ্চারিত হচ্ছে পুরোনো প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি এখনও তার ন্যায্য পানির হিস্যা পেয়েছে, নাকি অর্ধশতক পরও চলমান রয়েছে সেই অসম লড়াই?

লেখক: শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী কলেজ