০১ মে ২০২৬, ০২:০৪ পিএম
সদরঘাট। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম স্থান। ভীষণ কোলাহল,মানুষের ভীড়; আর পণ্য ওঠানামায় ব্যস্ততা। এরইমাঝে ফুটপাতে বসে আছেন রুস্তম শেখ। বয়স ৫০। বিমর্ষ চেহারা, কপালে চিন্তার ভাঁজ। দেখেই মনে হবে জীবনের কঠিন বাস্তবতায় বেশ ক্লান্ত, এক পরাজিত সৈনিক। সেদিন আগ বাড়িয়ে কথা বলতে গেলেই রুস্তম শেখ জানান, তিনি রূপনগর বস্তির বাসিন্দা। বিশ বছর আগে মেঘনা নদীর ভয়াল ভাঙ্গনে তার বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। চরম দুর্দিনে বাস্তুচ্যুত হয়ে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমান। একটু মাথা গোঁজার আশায় ঘুরে বেড়িয়েছেন ঢাকার অলিগলিতে। অবশেষে ঠাঁই হলো বস্তিতে। কোথাও কাজ না পেয়ে জীবিকার তাগিদে সদরঘাটে কুলির কাজ শুরু করেন। শূন্য পকেট থেকেই আবার শুরু সংগ্রামের ।
ঢাকার সদরঘাট, কমলাপুরসহ বড় বাস টার্মিনালগুলোতে রুস্তম শেখদের মত শতশত কুলিদের দেখা মেলে।
তারা লড়াই করেন জীবনের সঙ্গে।গ্রীষ্মের খরতাপ,বর্ষার অবিরাম বৃষ্টি কিংবা প্রাকৃতিক বৈরী আবহাওয়াও তাদের থামাতে পারে না। দু'বেলা দু'মুঠো অন্ন যোগানোর জন্য কখনো মাথায় বোঝা বইতে হয়,আবার কখনো ঠেলাগাড়ি বা ভ্যান ঠেলতে হয়। অভাব-অনটনের দরুন সাধ্যের বাইরে বোঝা বয়ে চলতে হয়।কুলিদের একেকটা বোঝা যেন পরিবারের অন্নসংস্থানের প্রতীক।
মে আসে, মে যায়। কুলিদের জীবনের কষ্ট লাঘব হয় না। নতুনত্ব আসে না কুলি শ্রমিকদের জীবনে। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটলেও কুলিদের জীবনমানের অবনতি ঘটেছে। কুলিরা জানে না মে দিবস কী; মে দিবসের তাৎপর্যই বা কী। তারা মে দিবসেও কাজ করে যায়। যেকোনো জাতীয় দিবসে কাজকর্ম বন্ধ রাখলে পেটে ভাত জুটবে না। মে দিবস শ্রমিক-মজুরের ন্যায্য মজুরির কথা বললেও কুলিদের ন্যায্য শ্রম মজুরি দেওয়া হয় না।দেওয়া হয় না এই পেশার যথোপুযুক্ত রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।নেই কোনো সামাজিক নিরাপত্তা। ফলে দিনশেষে বছরঘুরে মে দিবস আসে যায়, কুলিদের জীবন সেই আগের মতোই থেকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ২৬-৪৭ অনুচ্ছেদে দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার স্বীকৃত। অথচ দেশের অধিকাংশ শ্রমজীবী কুলি ও তাদের পরিবার অন্ন,বস্ত্র, চিকিৎসা,শিক্ষা ও বাসস্থানসহ মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত। মে দিবস শ্রমিকের অধিকার আদায় ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের নাম। একটি সাম্য,ন্যায় ও সভ্য রাষ্ট্র গঠনে মে দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম। আর দেশের কুলি শ্রমিকসহ সকল শ্রমিককে বঞ্চিত করে একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা একটি সভ্য রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য।
ঢাকা শহরে সাধারণত সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল,কমলাপুর রেলস্টেশন এবং কারওয়ান বাজারে কুলিদের এমন চিত্র হরহামেশাই দেখা যায়।ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতেও কুলির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ।দেশে হাজার হাজার কুলি আছেন যারা জীবিকার তাগিদে অল্প মজুরিতে এসব জায়গায় কুলির কাজ করেন। আগের তুলনায় এই পেশায় আয় কমেছে। আগে যেখানে একজন কুলি প্রায় গড়ে দৈনিক ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করতো, এখন তা প্রায় অর্ধেকে নেমে ৩০০ থেকে ৪০০ তে এসেছে। মানুষ রেলওয়েতে আগের মত পণ্য পরিবহন করে না।পণ্য পরিবহনের নিরাপত্তা ও পণ্য দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তার কারণে মানুষ রেলওেয়ের বিকল্প হিসেবে সড়কপথে বাস,ট্রাক,কাভার্ড ভ্যান ইত্যাদি মাধ্যমে ব্যবহার করছে।যার ফলে রেলওয়ে কুলিদের রোজগার কমেছে আশংকাজনক হারে। সদরঘাটের লঞ্চঘাটেও তাদের চাহিদা কমে গেছে। কেননা, এখন আর লঞ্চে পণ্য বহন করা হয়না আগের মতো।
অনেক সময় দেশে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কুলিদের দিনের পর দিন কাজ না পেয়ে বেকার সময় কাটাতে হয়। অধিকাংশ কুলি অর্থের অভাবে পরিবারের সন্তানদের সুচিকিৎসা দিতে পারেন না। আবার দিতে পারেন না লেখাপড়ার অধিকার। ফলে অল্প বয়সেই অনেক কুলির ছেলেই শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়ে,যা বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী দন্ডনীয় অপরাধ।পরিবারের আর্থিক চরম দৈন্যতার কারণে অনেক কুলির ছেলে আবার কুলিগীরি করে।কালের বিবর্তনে অনেক কুলিই পেশা বদলের চিন্তা করছেন।তবে,অভিজ্ঞতার অভাব এবং বয়সের ভার ইত্যাদি কারণে অনেকেই চাইলেও অন্য পেশায় যেতে পারেন না।ফলে এই পেশাকেই ভাগ্যের নির্ধারণ হিসেবে মেনে নিতে হয়।কুলিদের জীবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে সন্ধ্যায় বাসায় পেরেন ব্যথাতুর শরীর নিয়ে। অতিরিক্ত পণ্য বোঝাইয়ের ফলে অনেকেই শারীরিকভাবে নানান সমস্যায় ভোগেন। অল্প বয়সেই শরীর ভেঙে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হন।অত্যাধিক শারীরিক পরিশ্রমের ফলে অল্প বয়সেই শরীর কুঁজো হয়ে যায় এবং তা অকালবৃদ্ধে রূপ নেয়। অধিকাংশ সময়ই অর্থের অভাবে এসব রোগের সুচিকিৎসা হয় না।চিকিৎসার অভাবে অনেকের অকালে মৃত্যু হয়।
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে কুলিদের পেশাকে অত্যন্ত নিম্নশ্রেণীর পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও খাটো করে দেখা হয়। তাদের কর্মক্ষেত্রে দেখলেই বুঝা যায় তাদের অবস্থান সমাজের কুলিরা তাদের কর্মক্ষেত্রে নানানভাবে লাঞ্ছিত হন। কখনো কখনো ক্ষমতাবানরা অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করে থাকেন।আবার কখনো টাকা কমবেশি নিয়ে তর্কাতর্কি করে কুলিদের অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করা হয়। মাঝেমধ্যে ক্ষমতার দাপটে গায়ে হাত তোলার প্রবণতাও আছে অনেকের।
মে দিবসের শিক্ষা বাস্তবায়নে সকল শ্রমিকের প্রতি বঞ্চনার বিরুদ্ধে দাড়িয়ে এবং শ্রমিকের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এ দেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে কথা বলতে হবে। মে দিবসকে অর্থবহ করতে হলে কেবল শ্রদ্ধা জ্ঞাপনই যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন যুগোপযোগী উদ্যোগ ও পরিকল্পিত আইনের সঠিক বাস্তবায়ন।আইনের দৃষ্টিতে কুলিদের প্রতি যেকোনো ধরনের শারীরিক লাঞ্ছনা এবং বিদ্বেষমূলক আচরণকে অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করতে হবে।আন্তর্জাতিক শ্রমনীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ সরকারকে কুলি শ্রমিকদের জন্য নূন্যতম মজুরী নির্ধারণ করতে হবে। এছাড়াও নিশ্চিত করতে হবে তাদের স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা।
লেখক: আমজাদ সোহেল
প্রভাষক, জয়পুরা ছাইদুর রহমান মিরান শাহ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রামগঞ্জ, লক্ষীপুর।