images

মতামত

বাংলাদেশে হালাল গোশত রফতানির বিপুল সম্ভাবনা

ঢাকা মেইল ডেস্ক

২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩৫ পিএম

বিশ্বে ২০১৫ সালে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ১৮০ কোটি; যা ২০৩০ সালে ৩০০ কোটিতে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সারা বিশ্বে মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধি, তাদের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার কারণে হালাল গোশতের বাজার সম্প্রসারণ হচ্ছে দ্রুত গতিতে। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের ক্ষমতা অর্জন এবং তাদের লাইফস্টাইলে ব্যাপক পরিবর্তনও এ বাজার বৃদ্ধির একটি পরোক্ষসূচক হিসাবে কাজ করছে।

হালাল খাদ্যের বাজার ২০১৫ সালে ৬৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ২০১৮ সালে ১.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে প্রসারিত হয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এটি চার ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। মুসলিম ভ্রমণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির অর্থ হলো, ভ্রমণের সময় তাদের ব্যয় বৃদ্ধি।

মাস্টারকার্ড এবং ক্রিসেন্ট রেটিংয়ের ২০২৫ সালের তথ্য অনুসারে, বিশ্ব ভ্রমণের ক্ষেত্রে মুসলিম ভ্রমণকারীরাই সবচেয়ে বড় গ্রাহক। ২০২৫ সালে মুসলিম ভ্রমণ বাজারের মূল্য ছিল ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

হালাল মাংস ও মাংসজাত পণ্যের বিপণন চ্যানেল: 
পোলট্রি, গোশত এবং মিঠাপানির মাছের মতো খাদ্যপণ্যের উৎপাদকদের অবশ্যই সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করতে হবে, ব্যবহৃত খাদ্য পুরোপুরি হালাল উপাদান দিয়ে গঠিত। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ সামান্যতম নন-হালাল উপাদানের মিশ্রণও যে কোনো হালাল পণ্যকে বাতিল করে দিতে পারে। যে কোনো প্রাণীর উৎপাদন থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত পুরোপুরি হালাল নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করে নির্দিষ্ট বাজার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিক্রয় নিশ্চিত করতে হয়। তবে রপ্তানির জন্য উৎপাদিত গোশতের হালাল প্রত্যয়নপত্রসহ দেশীয় ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কৌশলগত চুক্তি থাকতে হবে। বাংলাদেশ সরকার এ অংশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

halal

বাংলাদেশের মাংস উৎপাদন প্রক্রিয়া ও বিপণন পদ্ধতি: 
বাংলাদেশের সব কসাইখানায় প্রধানত ট্র্যাডিশনাল পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। যে পর্যায়ে মাংসকে বিভিন্ন অংশে কাটার জন্য মানুষের সম্পৃক্ততা দরকার পড়ে। সব কসাইখানায়, ব্রয়লার মুরগি ট্র্যাডিশনাল পদ্ধতি ব্যবহার করে জবাই ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়। পাখি ঝোলানো, জবাই, নাড়িভুঁড়ি বের করা, গ্রেডিং, পোর্শনিং এবং প্যাকেজিং হাতেই করা হয়। অন্যদিকে, আধুনিক পদ্ধতিতে ওজন করা, অচেতন করা, গরম পানিতে ডুবানো, কাটা এবং ঠান্ডা করার প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা হয়। অন্যান্য ধরনের মুরগি এবং হাঁস-মুরগির প্রজাতির ক্ষেত্রে জবাই করার কাজটি পুরোপুরিভাবে হাতেই করা হয়। সব স্থানেই হালাল মানদণ্ড মেনে চলা নিশ্চিত করার জন্য কোম্পানির নিযুক্ত একজন ধর্মীয় নেতা, যিনি ইমাম হিসাবে পরিচিত, তার তত্ত্বাবধানে পশু জবাই করা হয়।

আমাদের দেশে আধুনিক মাধ্যমের তুলনায় ট্র্যাডিশনাল মাধ্যমগুলোই গরুর গোশতের বেশির ভাগ (+৯০ শতাংশ) দখল করে আছে। অন্যদিকে শিল্প পর্যায়ে মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী প্রধান বাজার দখল করে আছে বেঙ্গল মিট এবং পাবনা মিট। বাংলাদেশে আধুনিক ও ট্র্যাডিশনাল মাধ্যম ছাড়াও মৌসুমি এবং আমদানি মাধ্যমও রয়েছে। মৌসুমি মাধ্যমের কৃষি উৎপাদকরা ঈদুল আজহা উৎসবকে লক্ষ্য করে যেখানে গ্রাহকরা কুরবানি করতে জীবন্ত গরু কেনেন। তারা এসব পশু ট্র্যাডিশনাল পদ্ধতিতেই প্রক্রিয়াকরণ করেন। প্রক্রিয়াজাত মাংসের ক্ষেত্রে আমদানি মাধ্যমে উৎপাদনের প্রাথমিক পর্যায়, সংগ্রহ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ বিদেশে সম্পন্ন হয় এবং বাংলাদেশে শুধু পাইকারি ও খুচরা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রক্রিয়াজাত আমদানিকৃত মাংস প্রধানত অস্ট্রেলিয়া এবং ভারত থেকে আসে এবং ৯০ শতাংশেরও বেশি আমদানিকৃত জীবন্ত পশু আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের মাধ্যমে ভারত থেকে আসে।

বাংলাদেশ যেভাবে সুযোগ কাজে লাগাতে পারে: 
বাংলাদেশে গরু, ছাগল ও ভেড়ার উৎপাদন গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কুরবানির ঈদের সময় আমরা এসব পশুর প্রাপ্যতায় প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি-যা বড় ইতিবাচক দিক। তবে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন স্লটার হাউজের অভাব, হাইজিন ও কোল্ডচেইন ব্যবস্থার দুর্বলতা, আন্তর্জাতিক হালাল সার্টিফিকেশন কাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং সর্বোপরি রপ্তানি-উপযোগী প্রসেসিং ও প্যাকেজিং ঘাটতি এ সম্ভাবনাকে দমিয়ে রেখেছে। অথচ সৌদি আরব, ইউএই, কাতার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং ইউরোপ-আমেরিকার মুসলিম কমিউনিটি হতে পারে হালাল গোশত রপ্তানির সম্ভাব্য বাজার এবং বৈদেশিক অর্থের নতুন ক্ষেত্র। কাজটি করার জন্য এখনই বর্তমান সরকারকে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার-প্রথমত, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) আন্তর্জাতিক মানের স্লটার হাউজ (কসাইখানা) ও প্রসেসিং জোন (প্রক্রিয়াকরণ এলাকা) গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্পের এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনের মতো ‘মিট প্রসেসিং জোন’ তৈরি করা সময়ের দাবি। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে একটি কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হালাল সার্টিফিকেশন সংস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার ‘জাকিম’ (JAKIM) হতে পারে আদর্শ মডেল। তৃতীয়ত, গোশত রপ্তানির জন্য কোল্ডস্টোরেজ, রেফ্রিজারেটেড পরিবহণ এবং দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। চতুর্থত, ‘Farm to Fork’ ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করতে হবে। কোন খামার থেকে পশু এসেছে, কীভাবে পালন করা হয়েছে-এসব তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করলে আন্তর্জাতিক বাজারে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। পঞ্চমত, ভেটেরিনারি ডাক্তার, মিট স্পেশালিস্ট এবং দক্ষ কসাই (halal slaughterman) তৈরি করতে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা জরুরি।

halal-2

দেশের কৃষিভিত্তিক ৮টি বিশ্ববিদ্যালয় একত্রিত হয়ে ঢাকায় ‘Meat Innovation Hub’ নামে অত্যাধুনিক একটি ইনস্টিটিউট চালু করা সময়ের দাবি। যেখানে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি গবেষক, ভিজিটিং প্রফেসর, তরুণ গবেষক, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ও আন্তর্জাতিক ফেলোদের বড় একটি দল কাজ করবে। সবশেষে, সরকারকে রপ্তানি প্রণোদনা, সহজ ঋণ সুবিধা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি অবলম্বন করতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় আধুনিকতায় আনতে।

হালাল গোশত রপ্তানি বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি অর্থনৈতিক সুযোগ নয়, বরং একটি কৌশলগত সম্ভাবনা। সঠিক পরিকল্পনা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলতে পারলে বাংলাদেশ অচিরেই বৈশ্বিক হালাল বাজারে একটি শক্তিশালী অবস্থান করতে পারে।

লেখক: প্রফেসর অব মিট সায়েন্স, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ​।​

এআর​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​