images

মতামত

রাষ্ট্র পরিচালনার ২ চ্যালেঞ্জ: অর্থনৈতিক চাপ ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি

২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪৩ এএম

বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালনার প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে যে বিষয়টি সর্বাগ্রে প্রতীয়মান হচ্ছে, তা হলো সরকারের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি। এই সংকট কেবল পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রভাব বিস্তার করছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি খাতে মূল্য সমন্বয়, পরিবহন ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রাস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। ফলে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং স্বাভাবিকভাবেই সরকারের প্রতি আস্থার ওপর একটি সূক্ষ্ম কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব পড়ছে।

এই বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি সুসংহত, বাস্তবভিত্তিক এবং জনগণকেন্দ্রিক নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। আমাদের প্রশাসনিক কার্যক্রমে আরও গতিশীলতা, সমন্বয় এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি, যাতে কোনোভাবেই কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি বা অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করতে না পারে।

এ প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয়গুলো আরও সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন

# বাজার তদারকি জোরদার করে নিত্যপণ্যের মূল্যস্থিতি নিশ্চিত করা এবং অসাধু ব্যবসায়িক চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ।

# নিম্ন ও মধ্যআয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, যাতে প্রকৃত উপকারভোগীরা সরাসরি সহায়তা পান।

# জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করা।

# বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে রফতানি বহুমুখীকরণ, প্রবাসী আয়ের আনুষ্ঠানিক প্রবাহ উৎসাহিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ।

# ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ঋণখেলাপি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

# রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি ও কর ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও ন্যায়সংগত করা।

# উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, সময়ানুবর্তিতা এবং ব্যয়-সাশ্রয় নিশ্চিত করা।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, জনআস্থা পুনর্গঠন ছাড়া কোনো নীতিই দীর্ঘস্থায়ী ফলাফল বয়ে আনতে সক্ষম হবে না। তাই সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপে স্বচ্ছতা, জনগণের সাথে কার্যকর যোগাযোগ এবং গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা অপরিহার্য। অংশগ্রহণমূলক নীতিনির্ধারণই পারে একটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ভিত্তি গড়ে তুলতে।

অপরদিকে, আমাদের দৃষ্টি শুধু অভ্যন্তরীণ বাস্তবতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বৈশ্বিক পরিস্থিতিও বর্তমানে অত্যন্ত সংবেদনশীল। মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি আরও তীব্র হওয়া এবং বৈদেশিক লেনদেনে চাপ সৃষ্টির ঝুঁকি রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে আমাদের আরও সতর্ক ও প্রস্তুত থাকতে হবে-

# সম্ভাব্য বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় আগাম নীতিগত প্রস্তুতি গ্রহণ

# জ্বালানি সরবরাহ ও কৌশলগত মজুদ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা

# আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত নীতিগত সমন্বয় করা

# প্রবাসী আয়ের প্রবাহ এবং বৈদেশিক বাণিজ্য নিরাপদ রাখতে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা

শেষ কথা

এ কথা স্মরণ রাখা জরুরি যে বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কেবল প্রশাসনিক রুটিনে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি গভীর দায়িত্ববোধ, বাস্তবতাবোধ এবং জনমুখী দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বিত প্রয়াস। দায়িত্ববোধ, সততা, পেশাদারিত্ব এবং জনকল্যাণে অটল প্রতিশ্রুতি নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। চ্যালেঞ্জ যতই জটিল হোক, সম্মিলিত প্রচেষ্টা, দক্ষ প্রশাসন এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনার মাধ্যমে আমরা তা মোকাবিলা করতে সক্ষম হব-ইনশাআল্লাহ।