২২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২১ পিএম
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখা থেকে শুরু করে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখা—সব ক্ষেত্রেই প্রবাসীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ যাঁদের এই অবদানে অর্থনীতির চাকা সচল থাকে, তাঁদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও কল্যাণমূলক নীতির ঘাটতি এখনো স্পষ্ট।
প্রবাসে কর্মরত অধিকাংশ শ্রমিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় বিদেশে কাটান। পরিবার থেকে দূরে থেকে কঠোর পরিশ্রম করে তাঁরা দেশের জন্য অর্থ পাঠান। কিন্তু দেশে ফিরে তাঁদের জন্য কোনো টেকসই সামাজিক বা আর্থিক সুরক্ষা কাঠামো থাকে না। ফলে জীবনের শেষভাগে অনিশ্চয়তা অনেকের জন্য অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতায় কিছু নীতিগত সংস্কার সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
প্রথমত, প্রবাসীদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পেনশন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। বর্তমানে সরকার রেমিট্যান্সের ওপর ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা প্রদান করছে। এই প্রণোদনার একটি অংশ সংরক্ষণ করে এবং সরকারের অতিরিক্ত অবদান যুক্ত করে একটি পেনশন তহবিল গঠন করা সম্ভব। এতে প্রবাসীরা তাঁদের প্রেরিত অর্থের পরিমাণ ও প্রবাসজীবনের সময়কাল অনুযায়ী ভবিষ্যতে একটি নির্দিষ্ট আর্থিক নিরাপত্তা পেতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন—এটি কোনোভাবেই প্রবাসীদের মূল অর্থ থেকে কর্তন করে নয়, বরং প্রণোদনাভিত্তিক কাঠামোর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক লেনদেন পদ্ধতি উৎসাহিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, প্রবাসীদের জন্য আবাসন সুবিধা সহজ করা প্রয়োজন। “ভাড়ার টাকায় মালিকানা” মডেলে সরকারি প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া গেলে প্রবাসীরা মাসিক কিস্তির মাধ্যমে ধীরে ধীরে সম্পত্তির মালিক হতে পারবেন। এই সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে শর্ত হিসেবে নিয়মিত বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রেরণ এবং একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে অর্থ পাঠানোর ধারাবাহিকতা রাখা যেতে পারে। এতে একদিকে যেমন প্রবাসীরা উপকৃত হবেন, অন্যদিকে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহও বৃদ্ধি পাবে।
তৃতীয়ত, প্রতিটি শ্রমবাজারে সরকারিভাবে (G2G) চুক্তির আওতায় একটি কার্যকর সমস্যা-সমাধান ইউনিট গঠন করা জরুরি। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক প্রবাসীই প্রয়োজনীয় সেবা পেতে দূতাবাসের ওপর আস্থা রাখতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং আচরণগত সমস্যাও দেখা যায়। একটি স্বতন্ত্র, জবাবদিহিমূলক এবং দ্রুত কার্যকর ইউনিট গঠন করা গেলে প্রবাসীদের সমস্যার দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং সেবার মানও উন্নত হবে।
চতুর্থত, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রমের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা প্রয়োজন। শুধুমাত্র গ্রেডিং পদ্ধতি চালু করলে তা অনেক সময় বাস্তবায়নে দুর্বল হয়ে পড়ে। এর পরিবর্তে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় এনে স্বয়ংক্রিয় মনিটরিং, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং নিয়মিত পারফরম্যান্স মূল্যায়ন চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি, প্রতিটি এজেন্সিকে তাদের মাধ্যমে প্রেরিত কর্মীদের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দেখভালের দায়িত্ব নিতে বাধ্য করা উচিত এবং তা কার্যকরভাবে তদারকি করতে হবে।
প্রবাসীরা কেবল রেমিট্যান্স প্রেরক নন; তাঁরা দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তাঁদের জন্য টেকসই, স্বচ্ছ ও কল্যাণমুখী নীতিমালা প্রণয়ন করা গেলে শুধু তাঁদের জীবনমানই উন্নত হবে না, বরং দেশের অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে। এখন সময় এসেছে—প্রবাসীদের উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে মূল্যায়ন করার এবং সেই অনুযায়ী নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের।
লেখক: রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত প্রবাসী, সিঙ্গাপুর
এমআর