ঢাকা মেইল ডেস্ক
১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:০০ পিএম
বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে ভর্তুকি, কৃষি ঋণ এবং উৎপাদন সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। তবে এসব সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা, সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন এবং মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার চালু করেছে ‘কৃষক কার্ড (Krishak Card)’, যা একটি ডিজিটাল কৃষক শনাক্তকরণ ও সেবা ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ হিসেবে কৃষি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের সূচনা করছে।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি জাতীয় কৃষক ডাটাবেজ গড়ে তোলা হচ্ছে, যার ভিত্তিতে সার ও বীজ ভর্তুকি, কৃষি ঋণ, সেচ সহায়তা, কৃষি বিমা এবং পরামর্শ সেবা সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু এলাকায় সীমিত আকারে কার্যক্রম শুরু হলেও ভবিষ্যতে এটি ধাপে ধাপে সারাদেশে বিস্তৃত করার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি কিছু শ্রেণির কৃষকের জন্য বার্ষিক নগদ প্রণোদনা ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে, যা সময়ের সাথে আরও সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনায় রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কৃষি সহায়তায় ভিন্ন ভিন্ন মডেল অনুসরণ করছে। ভারতে PM-KISAN কর্মসূচির মাধ্যমে বছরে ৬,০০০ রুপি সরাসরি কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রদান করা হয় এবং Kisan Credit Card (KCC) ব্যবস্থার মাধ্যমে সহজ শর্তে কৃষি ঋণ প্রদান করা হয়, যা বৃহৎ পরিসরে কৃষকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করেছে। চীনে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত কৃষি ভর্তুকি ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূমি ও পরিবারভিত্তিক নিবন্ধনের ভিত্তিতে উৎপাদন সহায়তা, যান্ত্রিকীকরণ এবং উপকরণ ভর্তুকি প্রদান করা হয়, যার ফলে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত হলেও প্রশাসনিক কাঠামো তুলনামূলকভাবে কঠোর।
যুক্তরাষ্ট্রে কৃষি সহায়তা ব্যবস্থা মূলত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ফসল বীমা এবং দুর্যোগ ক্ষতিপূরণ কেন্দ্রিক, যেখানে USDA-এর মাধ্যমে কৃষক নিবন্ধন ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের Common Agricultural Policy (CAP) কৃষকদের প্রতি হেক্টর জমির ভিত্তিতে গড়ে বছরে ২০০–৩০০ ইউরো পর্যন্ত সরাসরি সহায়তা প্রদান করে, পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কৃষি ও টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা হয়। এই বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা দেখায় যে কৃষি সহায়তা এখন কেবল ভর্তুকি নয়, বরং একটি সমন্বিত নীতি কাঠামোর অংশ।
বিশ্বের উন্নত কৃষি ব্যবস্থার মধ্যে জাপানের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে কৃষি নীতি কেবল উৎপাদন পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয় বরং উৎপাদন-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা, বাজার স্থিতিশীলতা এবং গুণগত মান নিয়ন্ত্রণের ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। জাপানে শক্তিশালী কৃষি সমবায় ব্যবস্থা (JA – Japan Agricultural Cooperatives) রয়েছে, যা কৃষকের উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিপণন কার্যক্রম সমন্বয় করে একটি শক্তিশালী ভ্যালু চেইন তৈরি করেছে। এর ফলে কৃষক সরাসরি বাজার ঝুঁকির পরিবর্তে সংগঠিত ব্যবস্থার মাধ্যমে ন্যায্য মূল্য পেতে সক্ষম হন।
এছাড়া জাপানে উৎপাদন-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নীতির অংশ হিসেবে উন্নত কোল্ড চেইন, গ্রেডিং সিস্টেম এবং গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়, যার ফলে ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় মূল্য স্থিতিশীলতা নীতির মাধ্যমে প্রধান খাদ্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা হয়, যা কৃষকের আয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কৃষক কার্ড উদ্যোগটি সময়োপযোগী হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে সঠিক কৃষক শনাক্তকরণ, হালনাগাদ ডাটাবেজ, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের অন্তর্ভুক্তি এবং স্থানীয় পর্যায়ে ডিজিটাল সক্ষমতার ওপর। ভবিষ্যতে যদি এই ব্যবস্থাকে শুধুমাত্র ভর্তুকি বিতরণের মাধ্যম না রেখে একটি সমন্বিত কৃষি ভ্যালু চেইন প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করা যায়, তাহলে এটি কৃষি খাতে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।
বিশ্ব অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে দেখায় যে আধুনিক কৃষি উন্নয়ন কেবল উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয় নয়, বরং উৎপাদন-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা, বাজার সংযোগ এবং তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণের ওপর নির্ভরশীল। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ যদি কৃষক কার্ড ব্যবস্থার সঙ্গে বৈশ্বিক উত্তম অনুশীলনগুলো—বিশেষ করে জাপানের উৎপাদন-পরবর্তী ও বাজার ব্যবস্থাপনা মডেল—সমন্বিত করতে পারে, তবে এটি একটি টেকসই ও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হবে।
লেখক: অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টি টেকনোলজি, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট